হরমোনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন বদলানো কি শুধুই ট্রেন্ড

অনেক নারীই এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান যেখানে মাসের কিছু দিনে শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগে, আবার কিছু দিনে নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত মনে হয়। কখনো হঠাৎ মুড খারাপ হয়ে যায়, আবার কোনো কোনো সময় কাজ করার আগ্রহও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে অনেকে ভাবতেন, এগুলো হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, এর পেছনে কাজ করে শরীরের হরমোনের পরিবর্তন।
এই ধারণা থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে সাইকেল সিঙ্কিং।
সাইকেল সিঙ্কিং মূলত এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে নারীরা তাদের মাসিক চক্রের বিভিন্ন ধাপ অনুযায়ী খাবার, ব্যায়াম এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনেন। এর লক্ষ্য হলো শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, যাতে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে।
নারীদের মাসিক চক্র সাধারণত চারটি ধাপে ভাগ করা হয়। মাসিক, ফলিকুলার ফেজ, ওভুলেশন এবং লুটিয়াল ফেজ। প্রতিটি ধাপে শরীরে হরমোনের মাত্রা বদলায়। আর সেই পরিবর্তন প্রভাব ফেলে শক্তি, মুড, ক্ষুধা, ব্যায়াম করার ক্ষমতা এমনকি খাবার হজমের ওপরও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ধরনের ডায়েট বা একই রকম ব্যায়াম পুরো মাসজুড়ে সবার জন্য সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। কারণ, শরীর প্রতিটি ধাপে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
তবে গবেষকেরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই বিষয়ে এখন পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সব দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। তাই কোনো পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মাসিকের সময় সাধারণত শরীর একটু দুর্বল লাগে। এই সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে বলা হয়। যেমন শাকসবজি, ডাল, লেন্টিল বা শস্যজাত খাবার। এ সময় গরম ও সহজপাচ্য খাবার শরীরকে আরাম দিতে পারে।
এই সময় ভারী ব্যায়ামের বদলে হালকা হাঁটা বা ইয়োগা নারীদের শরীরের জন্য ভালো হতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্রাম আর শরীরকে সময় দেওয়া।
মাসিক শেষ হওয়ার পর শুরু হয় ফলিকুলার ফেজ। এই সময় অনেকের শরীরে ধীরে ধীরে শক্তি বাড়তে থাকে। মনও তুলনামূলক ভালো থাকে। তাই এই সময়ে তাজা ফল, শাকসবজি আর লিন প্রোটিন খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও তখন একটু বেশি সক্রিয় হওয়া যায়। হালকা কার্ডিও বা স্ট্রেন্থ ট্রেনিং এই সময়ে শরীর ভালোভাবে নিতে পারে।
এরপর আসে ওভুলেশন ফেজ।
এই সময়কে অনেকে শরীরের সবচেয়ে এনার্জেটিক সময় বলেন। শরীরের সহনশক্তি আর আত্মবিশ্বাস তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। তাই এই সময়ে হাই ইনটেনসিটি ওয়ার্কআউট বা গ্রুপ ফিটনেস কার্যক্রম ভালো লাগতে পারে।
খাবারের মধ্যে ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ এই সময় শরীর ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা জরুরি।
তারপর আসে লুটিয়াল ফেজ।
এই সময়ে ধীরে ধীরে শরীর আবার ক্লান্ত অনুভব করতে পারে। অনেকের মুড সুইং, ফোলাভাব বা খাবারের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখা দেয়। তাই জটিল শর্করা এবং ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার উপকারী হতে পারে।

ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও শরীরকে একটু শান্ত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাইলেটস, স্ট্রেচিং বা কম চাপের ব্যায়াম এই সময় ভালো কাজ করতে পারে।
সাইকেল সিঙ্কিং অনুসরণ করলে কী উপকার পাওয়া যেতে পারে, তা নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, এতে শরীরের শক্তি ভালো থাকে, ক্লান্তি কমে, মুড সুইং নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ব্যায়ামের ফলও ভালো পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, এটি ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে বলছেন, এটি কোনো ম্যাজিক সমাধান নয়।
প্রতিটি নারীর শরীর আলাদা। হরমোনের পরিবর্তনও সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও মাসভেদে পরিবর্তন হতে পারে। তাই কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে নিজের শরীরকে বোঝা জরুরি।
ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট ডা. মনীষা আরোরা বলেন, সাইকেল সিঙ্কিং নারীদের নিজেদের শরীরের পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করতে পারে। সঠিকভাবে খাবার ও ব্যায়াম ঠিক করতে পারলে এটি শক্তি, মুড ও সামগ্রিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
কারণ, সুস্থ থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত যত্ন, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন আর নিজের শরীরের কথা মন দিয়ে শোনা।
সূত্র: এনডিটিভি

