logo

মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতার অভাবে বাড়তে পারে যে ক্যানসারের ঝুঁকি

মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতার অভাবে বাড়তে পারে যে ক্যানসারের ঝুঁকি
ছবি : সংগৃহীত

নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ঠিকভাবে না মানলে শরীরে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, এসব সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) সংক্রমণ টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে, যা পরবর্তীতে সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। যদিও এই ক্যানসারের প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের সংক্রমণ। তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও রোগটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নারী এখনও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানতে পান না এবং অনেক সময় পরিষ্কার স্যানিটারি পণ্য, নিরাপদ টয়লেট বা সঠিক নির্দেশনার অভাবে ভোগেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় থাকলে বিভিন্ন সংক্রমণ দেখা দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

সার্ভিক্যাল ক্যানসার কেন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, সার্ভিক্যাল ক্যানসারের প্রধান কারণ দীর্ঘস্থায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এটি বিশ্বের নারীদের মধ্যে চতুর্থ সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার।

ভারতীয় উপমহাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে এটি নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার, বিশেষ করে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি। প্রতি বছর ভারতে এক লাখের বেশি নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং ৭৭ হাজারেরও বেশি মৃত্যু ঘটে। টিকা গ্রহণ, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সচেতনতার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মাসিক স্বাস্থ্যবিধি কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বলতে বোঝায় মাসিকের সময় পরিষ্কার ও নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার করা, নিয়মিত স্যানিটারি প্যাড বা কাপ পরিবর্তন করা, ব্যক্তিগত অঙ্গ পরিষ্কার রাখা এবং ব্যবহৃত পণ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা।

অপরিচ্ছন্নতা বা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে মূত্রনালির সংক্রমণ, যোনির সংক্রমণ এবং প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার সংক্রমণ হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস সংক্রমণ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যেতে পারে।

কীভাবে অস্বাস্থ্যকর মাসিক অভ্যাস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে

চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, নারীদের যোনির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। সুস্থ যোনিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে যা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। অস্বাস্থ্যকর পরিচ্ছন্নতা এই ভারসাম্য নষ্ট করে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।

দ্বিতীয়ত, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস সংক্রমণ দূর হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বারবার সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে ভাইরাস দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, সংবেদনশীল টিস্যুতে জ্বালা বা ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ভেজা বা অপরিষ্কার উপকরণ ব্যবহার করলে সার্ভিক্সে জ্বালা তৈরি হয়, যা ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে সহজ করে দিতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পুরোনো কাপড় ব্যবহার করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না মানা নারীদের মধ্যে সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।

কোন কোন অভ্যাস ঝুঁকি বাড়ায়

মাসিকের সময় কিছু ভুল অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোনো বা ঠিকভাবে না ধোয়া কাপড় ব্যবহার করা, দীর্ঘ সময় একই প্যাড ব্যবহার করা, ব্যবহৃত পণ্য সঠিকভাবে না ফেলা, এবং পরিষ্কার পানির অভাব।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বিশেষ করে গ্রামীণ এবং সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় পর্যাপ্ত স্যানিটারি সুবিধা না থাকায় এসব সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাবও নারীদের ঝুঁকি বাড়ায়।

সচেতনতা এবং সুবিধার গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নারী এখনও জানেন না যে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পরিষ্কার স্যানিটারি পণ্য সহজলভ্য করা, নিরাপদ টয়লেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সঠিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, ভালো মাসিক স্বাস্থ্যবিধি শুধু সংক্রমণ কমায় না, বরং সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি নিয়মিত হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস টিকা গ্রহণ এবং স্ক্রিনিং করানোও এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাসই নারীদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।

সূত্র: হেল্থ শটস