logo
Advertisement

ব্যথা হলেই ওষুধ খান, বারবার খেলে যে ঝুঁকি হতে পারে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ব্যথা হলেই ওষুধ খান, বারবার খেলে যে ঝুঁকি হতে পারে
ছবি: ফ্রি পিক

মাথাব্যথা, কোমরব্যথা, দাঁতের ব্যথা কিংবা শরীরের অন্য কোনো জায়গায় ব্যথা হলেই অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে নেন। ব্যথা কমে গেলেই মনে হয় সমস্যা মিটে গেছে। কিন্তু এই অভ্যাস যদি বারবার হতে থাকে, তখন ঔষধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথাও মনে রাখা জরুরি।

বিশেষ করে কিছু ব্যথানাশক ঔষধ নিয়মিত বা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির ওপর চাপ পড়তে পারে। এমনকি কিছু পরিস্থিতিতে হঠাৎ কিডনির কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের ব্যথার ওষুধ কিডনির জন্য সমান ক্ষতিকর। ঝুঁকি নির্ভর করে কোন ওষুধ, কত মাত্রায়, কতদিন এবং কী শারীরিক অবস্থায় তা নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।

কোন ব্যথার ওষুধে কিডনির ঝুঁকি বেশি?

কিডনির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয় NSAID বা নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ নিয়ে। এই শ্রেণির ওষুধের মধ্যে আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেনের মতো বহুল ব্যবহৃত ব্যথানাশক রয়েছে।

ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট (NIDDK) জানিয়েছে, নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। আবার শরীরে পানিশূন্যতা থাকলে বা রক্তচাপ খুব কমে গেলে স্বল্প সময়ের ব্যবহারেও কিছু মানুষের acute kidney injury বা হঠাৎ কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই ব্যথা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে নিয়মিত নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ খাওয়া নিরাপদ অভ্যাস নয়।

কিডনির ওপর কীভাবে প্রভাব পড়ে?

কিডনির অন্যতম কাজ হলো রক্ত পরিশোধন করা এবং শরীরের তরল ও বিভিন্ন রাসায়নিকের ভারসাম্য ঠিক রাখা। কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ বজায় রাখাও এর স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ধরনের ওষুধ শরীরে এমন কিছু রাসায়নিকের উৎপাদন কমায়, যেগুলো কিডনির রক্তনালির প্রসারণ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এর ফলে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত ব্যবহারে এই প্রভাব কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

সব মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এক নয়। কিছু শারীরিক অবস্থায় নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ থেকে কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

ছবি: ডেইুল এক্সপ্রেস
ছবি: ডেইুল এক্সপ্রেস

বিশেষ করে সতর্ক থাকা দরকার যদি-

  • আগে থেকেই কিডনির রোগ থাকে
  • ডায়াবেটিস থাকে
  • উচ্চ রক্তচাপ থাকে
  • শরীরে পানিশূন্যতা থাকে
  • বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে অনেক পানি বেরিয়ে যায়
  • বয়স বেশি হয়
  • হৃদ্‌যন্ত্রের কিছু সমস্যা থাকে
  • একই সঙ্গে এমন কিছু ওষুধ খেতে হয়, যেগুলো কিডনির কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে

ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট বলছে, কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকা ব্যক্তিদের নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

পানিশূন্য অবস্থায় ব্যথার ওষুধ কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

ধরা যাক, কারও প্রচণ্ড বমি বা ডায়রিয়া হয়েছে। ফলে শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেছে। এই অবস্থায় কিডনিতে রক্তপ্রবাহও কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ধরনের ওষুধ যোগ হলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

তাই জ্বর, বমি, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো কারণে শরীরে পানি কমে গেলে নিজের সিদ্ধান্তে বারবার নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ঠিক করা ভালো।

কিডনির সমস্যা শুরু হলে কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলেও শুরুতে সবসময় স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শুধু শরীরে কোনো অস্বস্তি হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে কিডনি ভালো আছে কি না বোঝা যায় না।

তবে কিডনির কার্যকারিতা হঠাৎ কমে গেলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শরীরে পানি জমে পা বা মুখ ফুলে যাওয়া, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ব্যথার ওষুধ খাওয়ার পর এ ধরনের নতুন উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সব ব্যথানাশক কি কিডনির জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণ?

না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ব্যথানাশক ওষুধের বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে এবং তাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এক নয়। উদাহরণ হিসেবে, ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সাধারণ মাত্রায় অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল সাধারণত নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগের তুলনায় কিডনির জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে এর অর্থ প্যারাসিটামল যত খুশি খাওয়া যায়, এমন নয়। অতিরিক্ত মাত্রা লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

তাই ব্যথা হলেই একটি নির্দিষ্ট ঔষধকে সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ বা ক্ষতিকর হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

একই ওষুধে বারবার ব্যথা কমানো কেন ঠিক নয়?

বারবার ব্যথা হলে শুধু ওষুধ খেয়ে ব্যথা চাপা দেওয়ার বদলে ব্যথার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

ধরুন, প্রায়ই মাথাব্যথা হচ্ছে। প্রতিবার ব্যথানাশক খেলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু মাথাব্যথার মূল কারণ থেকে যেতে পারে। একইভাবে বারবার কোমরব্যথা, দাঁতের ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা বা পেটের ব্যথা হলে তার পেছনে আলাদা কোনো রোগ বা সমস্যা থাকতে পারে।

নিয়মিত ব্যথানাশক প্রয়োজন হচ্ছে মানেই চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করার সময় এসেছে।

ব্যথার ওষুধ খেলে কী কী সতর্কতা রাখবেন?

কিছু সাধারণ অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাবেন না: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক খাওয়ার অভ্যাস করবেন না।

একই উপাদানের একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাবেন না: সর্দি, জ্বর ও ব্যথার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কম্বিনেশন ওষুধে একই ধরনের উপাদান থাকতে পারে। ফলে অজান্তেই অতিরিক্ত মাত্রা হয়ে যেতে পারে।

পানিশূন্য অবস্থায় সতর্ক থাকুন: বমি, ডায়রিয়া বা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানি কমে গেলে নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কিডনি রোগ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না: আগে থেকেই কিডনির সমস্যা থাকলে যেকোনো ব্যথানাশক নেওয়ার আগে চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।

ওষুধের লেবেল পড়ুন: প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা ব্যথার ঔষধের ক্ষেত্রেও উপাদান ও মাত্রা দেখে নেওয়া জরুরি।

ব্যথা হলে তাহলে কী করবেন?

ব্যথা হলে প্রথমেই বুঝতে হবে সেটি কেন হচ্ছে। হালকা ও সাময়িক ব্যথার ক্ষেত্রে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান, প্রয়োজন অনুযায়ী ঠান্ডা বা গরম সেঁক এবং অন্যান্য উপযুক্ত ঘরোয়া ব্যবস্থায় উপকার পাওয়া যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে হালকা ব্যায়াম বা নড়াচড়াও ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তবে ব্যথা তীব্র হলে, বারবার হলে, কয়েক দিন ধরে না কমলে বা সঙ্গে জ্বর, ফোলা, দুর্বলতা, প্রস্রাবের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কিডনি ভালো রাখতে সবচেয়ে জরুরি কী?

কিডনি ভালো রাখার জন্য শুধু ব্যথানাশক এড়িয়ে চলাই যথেষ্ট নয়। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ না খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে নিয়মিত নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা দরকার। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটও দৈনিক বা নিয়মিতভাবে ওভার-দ্য-কাউন্টার ব্যথার ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

ব্যথা কমানোর ওষুধ প্রয়োজনের সময় চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তাই ব্যথানাশক মানেই ক্ষতিকর, এমন ধারণাও ঠিক নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন প্রয়োজন ছাড়াই, অতিরিক্ত মাত্রায় বা দীর্ঘদিন নিজের সিদ্ধান্তে এসব ওষুধ খাওয়া হয়।

বিশেষ করে আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেনের মতো নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ নিয়মিত ব্যবহারে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পানিশূন্যতা থাকলে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই ব্যথা বারবার হলে শুধু ওষুধ খেয়ে যাওয়ার বদলে কারণটি খুঁজে বের করুন। আর নিয়মিত কোনো ব্যথানাশক প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই তা ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: টিভি ৯