logo

পাকস্থলীর ক্যানসারের ৭ লক্ষণ, যেগুলো অবহেলা করবেন না

পাকস্থলীর ক্যানসারের ৭ লক্ষণ, যেগুলো অবহেলা করবেন না
ছবি: মেডিকানা হেল্থ গ্রুপ

পেটের সমস্যা হলে বেশির ভাগ মানুষই প্রথমে সেটিকে গ্যাস বা বদহজম বলে মনে করেন। মাঝে মধ্যে এমনটা হওয়া খুব বেশি অস্বাভাবিকও না। কিন্তু এ ধরনের সমস্যা বারবার হতে থাকলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক না।

পাকস্থলীর ক্যানসার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের শুরুতে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। আবার যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়, সেগুলোও অনেক সাধারণ সমস্যার মতোই মনে হতে পারে। এ কারণেই রোগটি শনাক্ত হতে সময় লাগতে পারে।

কিন্তু কিছু পরিবর্তন নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। চলুন পাকস্থলীর ক্যানসারের এমন ৭টি লক্ষণ জেনে নিই যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়।

দীর্ঘদিনের বদহজম

মাঝে মধ্যে বদহজম হওয়া খুবই সাধারণ। কিন্তু আগে এমন সমস্যা না থাকলেও হঠাৎ নিয়মিত বদহজম শুরু হলে এবং তা সহজে না কমলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বদহজম, বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স রয়েছে। তবে এসব সমস্যা হলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়।

বিশেষ করে সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে বা আগের তুলনায় বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া

আগের তুলনায় খুব অল্প খাবার খেলেই যদি মনে হয় পেট একেবারে ভরে গেছে, সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

পাকস্থলীর ক্যানসারে অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে ক্ষুধা কমে যাওয়া বা অকারণে ওজন কমে গেলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

অবশ্য গ্যাস, বদহজমসহ আরও অনেক কারণেও এমন হতে পারে।

চেষ্টা না করেও ওজন কমে যাওয়া

খাবারের পরিমাণ বা শরীরচর্চার ধরনে কোনো পরিবর্তন না এনেও যদি কয়েক সপ্তাহ বা মাসে অকারণে ওজন কমতে থাকে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পাকস্থলীর ক্যানসারের অন্যতম সম্ভাব্য লক্ষণ হলো অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া। এর সঙ্গে ক্ষুধা কমে যাওয়া বা অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকতে পারে।

অকারণে ওজন কমার পেছনে ক্যানসার ছাড়াও থাইরয়েডের সমস্যা, হজমের সমস্যা, সংক্রমণ বা অন্যান্য শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তাই কারণ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।

বারবার বমি বা বমি বমি ভাব

বারবার বমি বমি ভাব হওয়া বা বমি হওয়াও পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে।

বিশেষ করে খাবারের পর নিয়মিত বমি হলে বা সমস্যা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বমির সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে বিষয়টি আরও জরুরি।

রক্তযুক্ত বমি সব সময় ক্যানসারের কারণে হয় না। পাকস্থলীর আলসারসহ অন্য সমস্যাতেও এমন হতে পারে। কিন্তু রক্ত বমি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

পেটের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি

পেটের ওপরের অংশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি থাকলেও তা অবহেলা করা ঠিক নয়।

পাকস্থলীর ক্যানসারে পেটের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা মৃদু হতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে।

তবে পেটব্যথার অসংখ্য কারণ রয়েছে। তাই শুধু এই একটি লক্ষণ দেখে ক্যানসারের কথা ভাবার কারণ নেই। ব্যথা নতুন হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পায়খানা কালো হয়ে যাওয়া বা রক্ত দেখা

পায়খানা অস্বাভাবিকভাবে কালো, আলকাতরার মতো বা খুব গাঢ় হয়ে গেলে সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাকস্থলী বা পরিপাকতন্ত্রের ওপরের অংশে রক্তক্ষরণ হলে পায়খানা কালো হয়ে যেতে পারে।

তবে সব কালো পায়খানা রক্তক্ষরণের কারণে হয় না। কিছু খাবার বা আয়রনের ওষুধেও পায়খানার রং কালো হতে পারে।

তারপরও নতুন করে কালো পায়খানা হলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা পেটে অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি সব সময় দুর্বল বা ক্লান্ত লাগে, তার কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

পাকস্থলীতে দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া তৈরি হতে পারে। এর ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে ক্লান্তির কারণও অনেক হতে পারে। রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি বা বিভিন্ন রোগের কারণেও এমন হতে পারে।

আরও যে লক্ষণগুলো নজরে রাখবেন

উপরের সাতটি লক্ষণ ছাড়াও ক্ষুধা কমে যাওয়া, গিলতে সমস্যা, পেট ফাঁপা বা পেট ফুলে থাকার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস বা পেটে তরল জমার মতো লক্ষণও দেখা যায়, বিশেষ করে রোগটি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে।

গিলতে সমস্যা হলে সেটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ পাকস্থলীর ওপরের অংশের সমস্যা ছাড়াও খাদ্যনালির বিভিন্ন রোগে এমন হতে পারে।

এসব লক্ষণ মানেই কি পাকস্থলীর ক্যানসার?

না, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বদহজম, পেটব্যথা, বমি বমি ভাব বা পেট ফাঁপার মতো লক্ষণ খুব সাধারণ এবং এগুলোর পেছনে ক্যানসার ছাড়াও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে কোনো উপসর্গ নতুনভাবে শুরু হলে, কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?

রক্ত বমি, পায়খানায় রক্ত বা একেবারে কালো পায়খানা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, গিলতে সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী বমি বা তীব্র ও বাড়তে থাকা পেটব্যথার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, পায়খানা পরীক্ষা এবং আরও কিছু পরীক্ষা করতে পারেন। পাকস্থলীর ক্যানসার সন্দেহ হলে ওপরের পরিপাকতন্ত্রের এন্ডোস্কপি ও বায়োপসি করা হতে পারে।

পাকস্থলীর ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ পেটের সমস্যার মতো হওয়ায় সেগুলো সহজেই উপেক্ষিত হতে পারে। তাই শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে নিজে থেকে শুধু গ্যাস বা অম্বল ধরে নিয়ে বসে থাকা ঠিক নয়।

বিশেষ করে অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের বদহজম, বারবার বমি, পেটের ওপরের অংশে ব্যথা, কালো পায়খানা এবং অস্বাভাবিক দুর্বলতা একসঙ্গে বা দীর্ঘদিন ধরে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মনে রাখবেন, এসব লক্ষণ থাকলেই পাকস্থলীর ক্যানসার হয়েছে এমন নয়। কিন্তু ক্যানসার হয়ে থাকলে দ্রুত শনাক্ত করা চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: সানরাইজ অনকোলজি সেন্টার