logo
Advertisement

সাইনাসের ব্যথা ও নাক বন্ধ, ওষুধ ছাড়াই আরাম মিলবে যেভাবে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সাইনাসের ব্যথা ও নাক বন্ধ, ওষুধ ছাড়াই আরাম মিলবে যেভাবে
ছবি: মেডিকাল নিউজ টুডে

নাক বন্ধ, মাথাব্যথা, মুখের চারপাশে চাপ বা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা গলায় কফ জমার মতো সমস্যা হলে অনেকেই একে সাধারণ সর্দি বলে এড়িয়ে যান। আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন পরেও সমস্যা না কমলে শুরু হয় সাইনাস নিয়ে দুশ্চিন্তা। আসলে সাইনাসের প্রদাহ বা সাইনুসাইটিস খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। ঠান্ডা, ফ্লু, অ্যালার্জি বা নাকের ভেতরের কিছু সমস্যার কারণে এটি হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তীব্র সাইনুসাইটিস নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

তবে উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে, বারবার ফিরে এলে বা হঠাৎ গুরুতর হয়ে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সাইনুসাইটিসের চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।

সাইনুসাইটিস আসলে কী?

আমাদের কপাল, গাল ও চোখের আশপাশের হাড়ের ভেতরে কিছু ফাঁপা জায়গা রয়েছে, যেগুলোকে সাইনাস বলা হয়। এগুলোর ভেতরের আবরণে প্রদাহ হলে সাইনুসাইটিস হতে পারে।

প্রদাহের কারণে সাইনাস থেকে মিউকাস ঠিকমতো বের হতে না পারলে নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং মুখ বা মাথার বিভিন্ন অংশে চাপ ও ব্যথা অনুভূত হতে পারে। সাধারণত সর্দি বা ফ্লুর পর সাইনুসাইটিস দেখা দিতে পারে।

সাইনুসাইটিসের সাধারণ লক্ষণ কী

সাইনুসাইটিস হলে একসঙ্গে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন-

  • নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • নাক দিয়ে পানি বা ঘন মিউকাস পড়া
  • কপাল, গাল বা চোখের চারপাশে ব্যথা ও চাপ
  • মাথাব্যথা
  • গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • গলায় মিউকাস নেমে আসা
  • কাশি
  • মুখে দুর্গন্ধ
  • কখনও দাঁতে ব্যথা
  • কানে চাপ অনুভূত হওয়া
  • জ্বর

সব রোগীর সব উপসর্গ থাকবে এমন নয়। আবার সর্দি বা অ্যালার্জির সঙ্গেও অনেক লক্ষণের মিল থাকতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিজে নিজে নিশ্চিত হওয়া ঠিক নয়।

সাইনাসের ব্যথা কমাতে ঘরেই কী করবেন?

হালকা সাইনুসাইটিসের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘরেই কিছু যত্ন নিয়ে উপসর্গ কমানো যায়।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পর্যাপ্ত তরল পান করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং নাকের মিউকাস কিছুটা পাতলা হতে সাহায্য করতে পারে। ফলে নাক পরিষ্কার রাখা সহজ হয়।

নাকে স্যালাইন ব্যবহার করতে পারেন

নাকের ভেতর পরিষ্কার রাখতে স্যালাইন নাকের স্প্রে বা লবণ পানির দ্রবণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি নাকের জমে থাকা মিউকাস পরিষ্কার করতে এবং নাক বন্ধভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বাড়িতে নাক ধোয়ার জন্য পানি ব্যবহার করলে নিরাপদ পানি ব্যবহার করা জরুরি। ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি বা উপযুক্ত জীবাণুমুক্ত পানি ব্যবহার করা উচিত। নাক পরিষ্কারের জন্য সরাসরি অপরিশোধিত কলের পানি ব্যবহার করা ঠিক নয়।

গরম সেঁক দিতে পারেন

নাক ও কপালের ওপর হালকা গরম সেঁক দিলে সাইনাসের চাপ ও অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে। খুব গরম কিছু সরাসরি ত্বকে লাগানো উচিত নয়।

বিশ্রাম নিন

সর্দি বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের সঙ্গে সাইনুসাইটিস হলে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম ও বিশ্রামের ঘাটতি থাকলে অসুস্থতা থেকে সেরে উঠতে বেশি সময় লাগতে পারে।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন

ধূমপান এবং পরোক্ষ ধূমপান নাক ও শ্বাসনালির সমস্যা বাড়াতে পারে। সাইনাসের সমস্যা থাকলে ধূমপান থেকে দূরে থাকা ভালো।

স্টিম নিলে কি সাইনাস সেরে যায়?

গরম পানির বাষ্প বা উষ্ণ শাওয়ার সাময়িকভাবে নাক বন্ধভাব ও অস্বস্তি কমাতে পারে। তবে স্টিম সাইনুসাইটিসের মূল কারণ দূর করে বা সংক্রমণ সারিয়ে দেয়, এমন দাবি করা ঠিক নয়।

বিশেষ করে ফুটন্ত পানির পাত্রের ওপর মুখ নিয়ে স্টিম নেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে। এতে দুর্ঘটনাজনিত দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

সাইনাস হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে?

না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বেশির ভাগ সাইনাস সংক্রমণ ভাইরাসের কারণে হয়। তাই সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিও বাড়ে।

কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়াল সাইনুসাইটিসের সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। যেমন উপসর্গ ১০ দিনের বেশি সময় ধরে ভালো না হওয়া, শুরুতে কিছুটা ভালো হওয়ার পর আবার হঠাৎ খারাপ হওয়া বা কয়েক দিন ধরে উচ্চ জ্বরের সঙ্গে তীব্র মুখের ব্যথা ও পুঁজের মতো নাকের স্রাব থাকা। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তাই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।

অ্যালার্জি থেকেও কি সাইনাসের সমস্যা বাড়তে পারে?

হ্যাঁ। পরাগরেণু, ধুলাবালি বা অন্য কোনো অ্যালার্জেনের কারণে নাকের ভেতরে প্রদাহ ও নাক বন্ধভাব তৈরি হতে পারে। অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে সেই ট্রিগার এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যালার্জির কারণে সমস্যা হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন বা স্টেরয়েড নাকের স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। কোন ওষুধ কতদিন ব্যবহার করা হবে, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা ভালো।


নাক বন্ধের স্প্রে বেশি দিন ব্যবহার করবেন না

কিছু ডিকনজেস্ট্যান্ট নাকের স্প্রে সাময়িকভাবে নাক খুলতে সাহায্য করে। তবে এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে উল্টো নাক বন্ধভাব বাড়তে পারে। তাই এ ধরনের স্প্রে ব্যবহারের আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

স্যালাইন নাকের স্প্রে বা নাক পরিষ্কারের স্যালাইন দ্রবণ এর থেকে আলাদা এবং সাধারণত নাক পরিষ্কারে ব্যবহৃত হয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

সাইনুসাইটিসের উপসর্গ কয়েক দিন পরেও কমছে না বা বারবার ফিরে আসছে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন-

  • উপসর্গ ১০ দিনের বেশি সময় ধরে ভালো না হলে
  • কিছুটা ভালো হওয়ার পর আবার উপসর্গ বেড়ে গেলে
  • তীব্র মাথাব্যথা বা মুখের ব্যথা হলে
  • কয়েক দিন ধরে জ্বর থাকলে
  • বছরে বারবার সাইনুসাইটিস হলে
  • ব্যথানাশক খেয়েও ব্যথা না কমলে
  • উপসর্গ ক্রমেই বাড়তে থাকলে

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রও (CDC) ১০ দিনের বেশি সময় ধরে উপসর্গ না কমা, উপসর্গ ভালো হওয়ার পর আবার খারাপ হওয়া এবং তীব্র মাথাব্যথা বা মুখের ব্যথার মতো অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেছে।

দীর্ঘদিনের সাইনুসাইটিস হলে কী হতে পারে?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাইনুসাইটিস বারবার হতে পারে বা দীর্ঘদিন ধরে থাকতে পারে। এমন হলে নাকের পলিপ, অ্যালার্জি বা নাকের গঠনের সমস্যার মতো কারণ খুঁজে দেখা হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া সমস্যায় চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী নাকের পরীক্ষা, অন্যান্য পরীক্ষা বা কান, নাক ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলতে পারেন। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধে উপকার না হলে অস্ত্রোপচারও বিবেচনা করা হয়।

কখন জরুরি চিকিৎসা দরকার?

সাইনুসাইটিসের সঙ্গে খুব বেশি অসুস্থ লাগা, দ্রুত বাড়তে থাকা তীব্র ব্যথা বা চোখের চারপাশে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বিশেষ করে চোখের চারপাশে ফোলা, দৃষ্টিতে পরিবর্তন, অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা গুরুতর অসুস্থতার অনুভূতি থাকলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

সাইনাসের সমস্যা অস্বস্তিকর হলেও বেশির ভাগ তীব্র ক্ষেত্রে এটি গুরুতর কিছু নয় এবং সময়ের সঙ্গে ভালো হয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম, স্যালাইন দিয়ে নাক পরিষ্কার রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে ব্যথা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করে অনেকের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তবে দীর্ঘদিনের নাক বন্ধভাব, বারবার সাইনাসের সমস্যা বা তীব্র উপসর্গকে শুধু সাধারণ সর্দি ভেবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

সূত্র: নিউজ ১৮