logo

রাতে হঠাৎ বুক ধড়ফড়সহ ঘাম ও শ্বাসকষ্ট, জানুন কী ঘটছে শরীরে

রাতে হঠাৎ বুক ধড়ফড়সহ ঘাম ও শ্বাসকষ্ট, জানুন কী ঘটছে শরীরে
ছবি: কিন্ডার ইন দ্য কি

গভীর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে বড় কোনো বিপদ ঘটতে চলেছে। কখনো আবার মনে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে বা এই বুঝি কিছু একটা হয়ে যাবে।

এমন অভিজ্ঞতা খুবই ভয় পাওয়ার মতো। কিন্তু ঘুমের মধ্যে হঠাৎ এমন তীব্র ভয় ও শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার একটি কারণ হতে পারে নকটার্নাল প্যানিক অ্যাটাক, যাকে সহজভাবে নাইট প্যানিক অ্যাটাক বলা হয়। এটি ঘুমের মধ্যেই শুরু হয়ে মানুষকে জাগিয়ে দিতে পারে। দিনের বেলার প্যানিক অ্যাটাকের মতোই এর সঙ্গে দ্রুত হৃদ্‌স্পন্দন, ঘাম, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা তীব্র আতঙ্ক দেখা দিতে পারে।

নাইট প্যানিক অ্যাটাক কী?

নকটার্নাল প্যানিক অ্যাটাক হলো ঘুমের মধ্যে হঠাৎ তীব্র ভয় বা আতঙ্কের অনুভূতি তৈরি হওয়া, যার সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয় এবং ঘুম ভেঙে যায়।

এটি সাধারণ দুঃস্বপ্নের মতো নয়। দুঃস্বপ্নে সাধারণত কোনো ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে এবং স্বপ্নটির কথা মনে থাকতে পারে। অন্যদিকে প্যানিক অ্যাটাকের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে ওঠার পরই তীব্র ভয়, বুক ধড়ফড়, ঘাম বা শ্বাসকষ্টের মতো শারীরিক অনুভূতি প্রধান হয়ে ওঠে।

আবার এটি নাইট টেরর বা রাতের আতঙ্ক থেকেও আলাদা। নাইট টেররের সময় ব্যক্তি আংশিকভাবে ঘুমের মধ্যেই থাকতে পারেন এবং পরে ঘটনাটি মনে নাও থাকতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

রাতে প্যানিক অ্যাটাক হলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

  • হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় বা আতঙ্ক
  • বুক ধড়ফড় করা বা হৃদ্‌স্পন্দন দ্রুত হয়ে যাওয়া
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
  • খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া
  • ঘাম হওয়া
  • শরীর কাঁপা বা হাত-পা কাঁপতে থাকা
  • বুক ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া
  • মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
  • হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
  • বমি বমি ভাব
  • শরীর গরম বা ঠান্ডা লাগা
  • মনে হওয়া যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন
  • মৃত্যু বা বড় কোনো বিপদ আসন্ন মনে হওয়া

এই উপসর্গগুলো এতটাই তীব্র হতে পারে যে অনেকের মনে হয় তারা হার্ট অ্যাটাক করছেন। প্যানিক অ্যাটাক নিজে সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে একই ধরনের উপসর্গ অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যাতেও হতে পারে। তাই প্রথমবার এমন হলে বা কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।


কেন রাতে প্যানিক অ্যাটাক হয়?

নকটার্নাল প্যানিক অ্যাটাকের সঠিক কারণ সবসময় জানা যায় না। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম এবং কিছু শারীরিক বা ঘুমসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ

দিনভর কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক দুশ্চিন্তা বা কোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে তৈরি মানসিক চাপ রাতে প্যানিকের প্রবণতা বাড়াতে পারে।

উদ্বেগের সমস্যা

যাদের উদ্বেগজনিত সমস্যা বা দিনের বেলাতেও প্যানিক অ্যাটাক হয়, তাদের রাতে প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

ঘুমের সমস্যা

অনিদ্রা বা sleep apnea-এর মতো ঘুমের সমস্যার সঙ্গে রাতের প্যানিক অ্যাটাকের সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া বা হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠার মতো সমস্যা থাকলে বিষয়টি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার।

ক্যাফেইন ও জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস

অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, ধূমপান এবং অনিয়মিত জীবনযাপন কিছু মানুষের উদ্বেগ ও প্যানিকের প্রবণতা বাড়াতে পারে। তাই রাতে অতিরিক্ত চা-কফি পান করার অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে দেখা যেতে পারে।

কিছু শারীরিক সমস্যা

কখনো থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাজমা বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার উপসর্গ প্যানিক অ্যাটাকের মতো মনে হতে পারে। তাই বারবার এমন ঘটনা ঘটলে শুধু মানসিক চাপকে কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

রাতে হঠাৎ প্যানিক অ্যাটাক হলে কী করবেন?

প্রথমে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে ভয় পাওয়ার অনুভূতিটি খুব তীব্র হলেও এটি ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। বসে বা আরামদায়ক অবস্থায় থেকে ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গভীর ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস এবং muscle relaxation-এর মতো পদ্ধতি উপসর্গের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

আলো জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসুন। খুব দ্রুত উঠে হাঁটাহাঁটি না করে শরীরকে স্থির হতে দিন। শ্বাস স্বাভাবিক হলে কয়েক চুমুক পানি পান করতে পারেন।

তবে বুকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ থাকলে শুধু প্যানিক অ্যাটাক ধরে নিয়ে ঘরে বসে থাকা উচিত নয়।

বারবার হলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?

একবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পর আবার রাতে একই ঘটনা ঘটবে, এই ভয় থেকেও ঘুমের সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে একটি চক্র তৈরি হতে পারে, যেখানে ঘুম নিয়ে ভয় বাড়ে এবং ঘুমের মান আরও খারাপ হয়।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।

  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
  • সন্ধ্যার পর চা-কফি ও অন্যান্য ক্যাফেইন কমান
  • নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন
  • ঘুমের আগে মোবাইল বা অন্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমান
  • নিয়মিত খাবার খান
  • মানসিক চাপ কমাতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন বা রিল্যাক্সেশন চেষ্টা করতে পারেন
  • বারবার হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

চিকিৎসা কি সম্ভব?

হ্যাঁ। বারবার প্যানিক অ্যাটাক হলে এর চিকিৎসা রয়েছে। Cognitive Behavioral Therapy বা CBT প্যানিক অ্যাটাকের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে আতঙ্কের চিন্তা ও শারীরিক উপসর্গের প্রতি প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখানো হয়।

প্রয়োজনে চিকিৎসক ওষুধও দিতে পারেন। কোন ওষুধ প্রয়োজন, কতদিন নিতে হবে এবং আদৌ ওষুধের প্রয়োজন আছে কি না, তা ব্যক্তির উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে প্যানিকের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?

রাতে ঘুম ভেঙে বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট হলে সেটিকে সবসময় প্যানিক অ্যাটাক ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। বিশেষ করে প্রথমবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো, কারণ হার্টের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

বুকে তীব্র বা নতুন ধরনের ব্যথা, শ্বাস নিতে গুরুতর কষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো জরুরি উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

একইভাবে, রাতের আতঙ্ক বারবার হলে, ঘুম নষ্ট করলে বা দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গেলেও কারণটা বোঝা জরুরি

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ ভয় পেয়ে জেগে ওঠা খুব অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু প্রতিবার এর অর্থ এই নয় যে শরীরে বড় কোনো বিপদ ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি নকটার্নাল প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে, যা চিকিৎসাযোগ্য।

তবে একই উপসর্গ অন্য শারীরিক সমস্যাতেও দেখা দিতে পারে। তাই বারবার এমন হলে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ক্যাফেইন কমানো এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সূত্র: নিউজ ১৮