logo

থাইরয়েড ক্যানসারের ঝুঁকি কীভাবে বুঝবেন? সতর্ক হবে যেভাবে

থাইরয়েড ক্যানসারের ঝুঁকি কীভাবে বুঝবেন? সতর্ক হবে যেভাবে
ছবি: কোয়ালিসিওর ডাইগনোসিস

শরীরের কোথাও ব্যথা নেই, গলায়ও কোনো অস্বস্তি নেই, স্বাভাবিকভাবেই চলছে জীবন। তবু শরীরে বাসা বাঁধতে পারে থাইরয়েড ক্যানসার। কারণ, এই ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও রোগটি যে শরীরে বাসা বাঁধছে তা বুঝতে পারেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র এমডি অ্যান্ডারসনের তথ্য অনুযায়ী, থাইরয়েড ক্যানসারের কিছু ধরন ধীরে ধীরে বাড়ে। আবার এর অনেক লক্ষণই অন্য সাধারণ রোগের লক্ষণের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাই গলায় কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করা ঠিক নয়।

তবে গলায় কোনো গাঁট বা ফোলা দেখা দিলেই যে ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। অনেক সময় নিরীহ কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

থাইরয়েড ক্যানসার কী?

থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে, স্বরযন্ত্রের নিচে অবস্থিত প্রজাপতির মতো আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি। এটি এমন হরমোন তৈরি করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এই গ্রন্থির কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়ে সেগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করলে থাইরয়েড ক্যানসার হতে পারে। এই ক্যানসারের একাধিক ধরন রয়েছে। এর মধ্যে প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই ধরনের ক্যানসার সাধারণত ধীরে বাড়ে। তবে সব ধরনের থাইরয়েড ক্যানসার একই রকম নয়। কিছু ধরন তুলনামূলক দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কোনো লক্ষণ ছাড়াই কি থাইরয়েড ক্যানসার হতে পারে?

হ্যাঁ, হতে পারে। বিশেষ করে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের শরীরে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষায় গলার অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। আবার অন্য কোনো সমস্যার জন্য আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করাতে গিয়ে থাইরয়েডে গাঁট বা অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি শনাক্ত হতে পারে।

কিছু থাইরয়েড ক্যানসার ধীরে বাড়ার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তেমন সমস্যা তৈরি করে না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না যে তার শরীরে কোনো অসুস্থতা রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, থাইরয়েডে গাঁট পাওয়া মানেই ক্যানসার নয়। থাইরয়েডের অনেক গাঁটই ক্যানসারবিহীন। পরীক্ষা ছাড়া শুধু লক্ষণ দেখে রোগটি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

থাইরয়েড ক্যানসারের যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন

প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ না থাকলেও রোগটি বাড়তে থাকলে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন:

গলার সামনে গাঁট বা ফোলা

থাইরয়েড ক্যানসারের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো গলার সামনের দিকে নতুন কোনো গাঁট দেখা দেওয়া। কখনো গলার এক পাশে বা আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতেও ফোলা দেখা যেতে পারে। গাঁটটি ব্যথাহীনও হতে পারে।

গলায় নতুন গাঁট দেখা দিলে, সেটি বড় হতে থাকলে বা দীর্ঘদিন থেকে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া

কণ্ঠস্বর দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা বা কর্কশ হয়ে থাকলে সেটিকে শুধু সর্দি-কাশির সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। থাইরয়েডের আশপাশের স্নায়ুতে প্রভাব পড়লে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হতে পারে। যদিও এর পেছনে অন্য অনেক কারণও থাকতে পারে।

খাবার গিলতে অসুবিধা

গলার ভেতরে চাপ অনুভব করা, খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া বা কিছু আটকে আছে বলে মনে হওয়া থাইরয়েডের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

শ্বাস নিতে সমস্যা

থাইরয়েডের গাঁট বড় হয়ে শ্বাসনালিতে চাপ সৃষ্টি করলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। হঠাৎ বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

গলার সামনের দিকে ব্যথা

গলার সামনের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, যা কখনো কানের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, থাইরয়েড ক্যানসারের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ। তবে গলার ব্যথা হলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন ভাবার কারণ নেই।

দীর্ঘস্থায়ী কাশি

সর্দি-কাশি ছাড়াই দীর্ঘদিন কাশি থাকলে কিংবা কাশির সঙ্গে গলায় অস্বস্তি বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

মনে রাখবেন, এসব লক্ষণের বেশির ভাগই অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তবে গলায় নতুন গাঁট, দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বা গিলতে অসুবিধা হলে পরীক্ষা করানো জরুরি।

থাইরয়েড ক্যানসার শনাক্ত করতে কী পরীক্ষা করা হয়?

থাইরয়েড ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং পারিবারিক রোগের ইতিহাস জানতে চাইতে পারেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক গলার সামনের অংশ পরীক্ষা করে গাঁট বা ফোলা আছে কি না দেখেন।

আলট্রাসনোগ্রাম: থাইরয়েডের গাঁটের আকার, গঠন এবং বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। গাঁটটি কতটা সন্দেহজনক, তা নির্ধারণেও এটি সহায়তা করে।

বায়োপসি: গাঁটের বৈশিষ্ট্য দেখে ক্যানসারের সন্দেহ হলে সূক্ষ্ম সূঁচের সাহায্যে কোষ বা টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে। পরে পরীক্ষাগারে নমুনাটি পরীক্ষা করে ক্যানসার আছে কি না নির্ধারণ করা হয়।

সিটি স্ক্যান বা অন্য ইমেজিং পরীক্ষা: নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রোগের বিস্তার বা আশপাশের অংশের অবস্থা বুঝতে এসব পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

শুধু থাইরয়েড হরমোনের রক্ত পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেই থাইরয়েড ক্যানসার নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য উপসর্গ ও অন্যান্য পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।


থাইরয়েড ক্যানসার কি সব সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে?

না। থাইরয়েড ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী এর বৃদ্ধির গতি ও ঝুঁকি আলাদা হতে পারে। প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যানসার সাধারণত ধীরে বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। অন্যদিকে অ্যানাপ্লাস্টিক থাইরয়েড ক্যানসারের মতো কিছু বিরল ধরন দ্রুত বাড়তে পারে এবং বেশি আক্রমণাত্মক হতে পারে।

কোন ধরনের ক্যানসার হয়েছে, সেটি কতটা ছড়িয়েছে, রোগীর বয়স ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য কেমন, এসব বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। তাই থাইরয়েড ক্যানসার শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে নিজে থেকে চিকিৎসা বন্ধ রাখা বা চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া নিরাপদ নয়।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন-

  • গলার সামনে নতুন গাঁট বা ফোলা দেখা দিলে।
  • গলার গাঁট ক্রমে বড় হতে থাকলে।
  • কণ্ঠস্বর তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ভাঙা থাকলে।
  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা গলার ব্যথা না কমলে।
  • খাবার গিলতে অসুবিধা হলে।

পরিবারের কারও থাইরয়েড ক্যানসার থাকলে এবং নিজের গলায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে।

শ্বাস নিতে তীব্র অসুবিধা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। অন্যদিকে, কোনো লক্ষণ না থাকলেই সবার থাইরয়েড ক্যানসারের পরীক্ষা করানো প্রয়োজন, এমন নয়। সাধারণ ঝুঁকির মানুষের জন্য নিয়মিত থাইরয়েড ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করা হয় না। তবে ব্যক্তিগত ঝুঁকি বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।

থাইরয়েড ক্যানসার অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। আবার গলার গাঁট, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন কিংবা গিলতে অসুবিধার মতো লক্ষণ দেখা দিলেও তার পেছনে ক্যানসার ছাড়া অন্য কারণ থাকতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

সূত্র : দ্য ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস