logo

গর্ভের শিশুর হার্টবিট কত হলে স্বাভাবিক, কম-বেশি হলে কী করবেন

গর্ভের শিশুর হার্টবিট কত হলে স্বাভাবিক, কম-বেশি হলে কী করবেন
ছবি: মায়ে ক্লিনিক

গর্ভাবস্থায় মায়ের মনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো ঘুরতে থাকে, তার একটি হলো গর্ভের শিশুটি ঠিকমতো বেড়ে উঠছে কি না। আলট্রাসনোগ্রাম বা চিকিৎসকের পরীক্ষায় যখন শিশুর হৃদ্‌স্পন্দন শোনা যায়, তখন অনেক মায়ের মনেই স্বস্তি আসে। আবার হার্টবিটের সংখ্যা একটু কম বা বেশি দেখালে দুশ্চিন্তাও শুরু হয়।

আসলে গর্ভের শিশুর হৃদ্‌স্পন্দন বা ফিটাল হার্ট রেট গর্ভাবস্থায় শিশুর সুস্থতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তবে এই হার্টবিটের সংখ্যা সবসময় একই থাকে না। শিশুর নড়াচড়া, গর্ভাবস্থার সময়কাল এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণে এটি কিছুটা বাড়তে বা কমতে পারে। তাই একবারের পরীক্ষায় সামান্য বেশি বা কম হার্টবিট পাওয়া গেলেই সমস্যা হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক হার্টবিট কত?

গর্ভাবস্থার বেশির ভাগ সময়ে ভ্রূণের বেসলাইন হৃদ্‌স্পন্দন সাধারণত প্রতি মিনিটে ১১০ থেকে ১৬০ বার থাকে। চিকিৎসকেরা এই হার্টবিটের পাশাপাশি এর ওঠানামা ও শিশুর নড়াচড়ার সঙ্গে হার্টবিটের পরিবর্তনও দেখেন।

অর্থাৎ, পরীক্ষায় ১১০ থেকে ১৬০ বিট প্রতি মিনিটের মধ্যে কোনো সংখ্যা পাওয়া গেলেই সেটি একা শিশুর সম্পূর্ণ সুস্থতার প্রমাণ নয়। একইভাবে এই সীমার বাইরে কোনো একটি রিডিং পাওয়া গেলেই বড় কোনো সমস্যা হয়েছে, এমনটিও বলা যায় না।

চিকিৎসক গর্ভকাল, মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করেন।

গর্ভাবস্থার শুরুতেই কি হার্টবিট পাওয়া যায়?

শিশুর হৃদ্‌যন্ত্র গর্ভাবস্থার একেবারে শুরু থেকেই তৈরি হতে থাকে। গর্ভকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্রের গঠন আরও বিকশিত হয়।

আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট সময়ে শিশুর হৃদ্‌স্পন্দন দেখতে বা শনাক্ত করতে পারেন। গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহ চলছে, তার ওপর কখন হৃদ্‌স্পন্দন শনাক্ত করা যাবে তা নির্ভর করে।

তাই গর্ভাবস্থার একেবারে প্রথম দিকে পরীক্ষায় হার্টবিট স্পষ্টভাবে না পাওয়া গেলেই খারাপ কিছু হয়েছে ধরে নেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর আবার পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।

শিশুর হার্টবিট কখন বেশি হতে পারে?

শিশু নড়াচড়া করলে তার হৃদ্‌স্পন্দন সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এটি অনেক সময় স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের (American College of Obstetricians and Gynecologists/ACOG) তথ্য অনুযায়ী, ভ্রূণের নড়াচড়ার সঙ্গে হৃদ্‌স্পন্দন সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়া বা অ্যাকসেলারেশন অনেক ক্ষেত্রে আশ্বস্ত হওয়ার মতো লক্ষণ হতে পারে।

তাই পরীক্ষার সময় শিশুটি সক্রিয় থাকলে হার্টবিট কিছুটা পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে।

হার্টবিট কম হলে কি সবসময় বিপদ?

না। একটি মাত্র কম রিডিং দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে ১১০ বিট প্রতি মিনিটের নিচে বেসলাইন হার্ট রেটকে ধীর হৃদ্‌স্পন্দন বা ব্র্যাডিকার্ডিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা শুধু একটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করেন না। কতক্ষণ ধরে হার্টবিট কম রয়েছে, হার্টবিটের ধরন কেমন এবং অন্য পরীক্ষায় কী পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসও বলছে, অস্বাভাবিক ফিটাল হার্ট রেট প্যাটার্ন দেখা গেলেই যে ভ্রূণের নিশ্চিত সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। কারণ খুঁজে বের করার জন্য আরও পরীক্ষা করা হতে পারে।

হার্টবিট বেশি হলে কী হতে পারে?

সাধারণভাবে ১৬০ বিট প্রতি মিনিটের বেশি বেসলাইন হার্ট রেটকে দ্রুত হৃদ্‌স্পন্দন বা ট্যাকিকার্ডিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮০-এর বেশি হার্ট রেটকে দ্রুত হৃদ্‌স্পন্দনের আরও স্পষ্ট মাত্রা হিসেবে ধরা হতে পারে।

তবে কতক্ষণ ধরে হার্টবিট বেশি রয়েছে এবং কেন বেশি হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর নড়াচড়া বা সাময়িক কিছু কারণে হার্টবিট বাড়তে পারে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক হার্ট রেট থাকলে চিকিৎসকেরা কারণ খুঁজে দেখেন।

তাই শুধু একটি সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে মায়ের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

হার্টবিটের ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু প্রতি মিনিটে কতবার হৃদ্‌স্পন্দন হচ্ছে, সেটিই সব নয়। চিকিৎসকেরা হার্টবিটের ওঠানামা বা ভ্যারিয়েবিলিটিও দেখেন।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের নির্দেশনায় ফিটাল হার্ট রেটের বেসলাইন, ভ্যারিয়েবিলিটি, অ্যাকসেলারেশন ও ডেসেলারেশনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। এসব তথ্য একসঙ্গে দেখে শিশুর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।

বিশেষ করে প্রসবের সময় নিয়মিতভাবে এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কখন চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা করতে পারেন?

যদি ফিটাল হার্ট রেট নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় বা গর্ভাবস্থায় কোনো ঝুঁকি থাকে, চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা করতে পারেন। এর মধ্যে থাকতে পারে-

  • ননস্ট্রেস টেস্ট
  • আলট্রাসনোগ্রাম
  • বায়োফিজিক্যাল প্রোফাইল
  • ডপলার আলট্রাসাউন্ড
  • প্রয়োজনে নিয়মিত ফিটাল হার্ট রেট মনিটরিং

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, ননস্ট্রেস টেস্টে নির্দিষ্ট সময় ধরে শিশুর হৃদ্‌স্পন্দন ও নড়াচড়ার সম্পর্ক দেখা হয়। সাধারণত পরীক্ষাটি অন্তত ২০ মিনিট ধরে করা হয়।

আবার বায়োফিজিক্যাল প্রোফাইলে শুধু হার্টবিট নয়, শিশুর নড়াচড়া, শ্বাস-প্রশ্বাসের নড়াচড়া, পেশির টান এবং গর্ভের পানির পরিমাণও দেখা হয়।

ননস্ট্রেস টেস্টে ফল অস্বাভাবিক হলেই কি বিপদ?

এখানেও আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস বলছে, ননস্ট্রেস টেস্টে রেজাল্ট ননরিঅ্যাকটিভ হলেই শিশুটি অসুস্থ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। শিশু পরীক্ষার সময় ঘুমিয়ে থাকলেও এমন ফল আসতে পারে। প্রয়োজন হলে পরীক্ষাটি আরও কিছুক্ষণ চালানো বা অন্য পরীক্ষা করা হতে পারে।

তাই কোনো পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর নিজে নিজে ব্যাখ্যা করার বদলে চিকিৎসকের কাছ থেকে পুরো বিষয়টি বুঝে নেওয়া জরুরি।

গর্ভাবস্থায় বাড়িতে হার্টবিট মাপা কি দরকার?

বর্তমানে ঘরে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফিটাল ডপলার যন্ত্র পাওয়া যায়। কিন্তু নিজে নিজে বারবার শিশুর হার্টবিট মাপা সবসময় প্রয়োজনীয় নয়।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টরসর সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঝুঁকি বা নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ না থাকলে নিয়মিতভাবে বাড়তি ফিটাল হার্ট রেট পরীক্ষা করে মৃত সন্তান প্রসব প্রতিরোধে উপকার পাওয়া যায়, এমন প্রমাণ নেই।

এ ছাড়া বাড়িতে যন্ত্র দিয়ে পাওয়া হার্টবিটের সংখ্যা ভুলভাবে বোঝার সম্ভাবনাও থাকে। তাই কোনো সংখ্যা দেখে নিজে নিজে শিশুর সুস্থতা বা অসুস্থতা নির্ধারণ করা উচিত নয়।

শিশুর নড়াচড়ার দিকে নজর দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গর্ভাবস্থার পরের দিকে শিশুর নড়াচড়া সম্পর্কে মায়ের নিজের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু সাধারণত যে পরিমাণ নড়াচড়া করে, তার তুলনায় হঠাৎ নড়াচড়া অনেক কম মনে হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস বলছে, প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ফিটাল মুভমেন্ট বা কিক কাউন্ট পর্যবেক্ষণ করতে বলতে পারেন।

তবে কতবার নড়াচড়া স্বাভাবিক, তার একটি সংখ্যা সবার জন্য একই নয়। গর্ভকাল এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই ভালো।


কখন দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?

গর্ভাবস্থায় নিচের কোনো পরিবর্তন হলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত-

  • শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়া হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া
  • পরীক্ষায় হার্টবিট অস্বাভাবিক বলে জানানো
  • রক্তপাত হওয়া
  • তীব্র পেটব্যথা
  • পানি ভেঙে যাওয়ার মতো অনুভূতি
  • তীব্র মাথাব্যথা বা দৃষ্টিতে সমস্যা
  • শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক উপসর্গ

কোন পরিস্থিতিতে জরুরি হাসপাতালে যেতে হবে, তা গর্ভাবস্থার সময়কাল ও মায়ের শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই নিজের চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব হার্ট দিবসে ভ্রূণের হৃদ্‌স্বাস্থ্য কেন আলোচনায়?

বিশ্ব হার্ট দিবস সাধারণত হৃদ্‌স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি সুযোগ। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদ্‌রোগ নয়, গর্ভাবস্থায় শিশুর হৃদ্‌যন্ত্রের বিকাশ ও পর্যবেক্ষণ নিয়েও সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর হৃদ্‌যন্ত্র গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই বিকশিত হতে থাকে। নিয়মিত গর্ভকালীন চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় আলট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য পরীক্ষা শিশুর বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

তবে কোনো একটি হার্টবিটের সংখ্যা দিয়ে শিশুর পুরো হৃদ্‌স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না। চিকিৎসকের মূল্যায়নই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক হৃদ্‌স্পন্দন সাধারণত প্রতি মিনিটে ১১০ থেকে ১৬০ বার থাকে। তবে শিশুর নড়াচড়া, গর্ভকাল এবং পরীক্ষার পরিস্থিতির কারণে এই সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করতে পারে।

তাই পরীক্ষায় হার্টবিট একটু বেশি বা কম দেখলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার দীর্ঘ সময় ধরে হার্টবিট অস্বাভাবিক থাকলে বা শিশুর নড়াচড়া কমে গেলে বিষয়টি অবহেলা করাও ঠিক নয়।

গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নির্ধারিত পরীক্ষা করা এবং শিশুর নড়াচড়ার পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: টিভি ৯