বারবার ঘাড় ফোটাচ্ছেন, এই অভ্যাস কতটা নিরাপদ

ঘাড়ে একটু টান লাগলেই অনেকে ডান দিকে ঘোরান, বাঁ দিকে ঝোঁকান, তারপর আসে সেই পরিচিত ‘মট’ করে শব্দ। শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন ঘাড়টা একটু হালকা লাগে। দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, মোবাইল দেখা কিংবা একটানা কাজের পর এই অভ্যাস অনেকেরই অজান্তে দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে যায়।
মাঝেমধ্যে স্বাভাবিক নড়াচড়ার সময় ঘাড়ে শব্দ হওয়া সাধারণত বড় কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু ঘাড়ে বারবার জোর দিয়ে চাপ দিয়ে শব্দ বের করার অভ্যাস একেবারেই অন্য বিষয়। অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ও জোর করে ঘাড় ফাটানোর অভ্যাসে ঘাড়ের পেশি, লিগামেন্ট ও অস্থিসন্ধিতে বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
তাহলে ঘাড় ফাটালে শব্দ হয় কেন? আর কখন এই অভ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার?
ঘাড় ফাটানোর সময় আসলে কী হয়?
ঘাড়ের অস্থিসন্ধির ভেতরে একটি তরল থাকে, যা অস্থিসন্ধিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। ঘাড়ের অস্থিসন্ধি নড়াচড়া করার সময় ভেতরের চাপের পরিবর্তন হলে ওই তরলে থাকা গ্যাস থেকে ছোট বুদবুদের সৃষ্টি বা দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। সেখান থেকেই মট বা পট করে শব্দ শোনা যেতে পারে।
তাই ঘাড়ে শব্দ হলেই হাড় ভেঙে যাচ্ছে বা অস্থিসন্ধি ক্ষয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ঘাড়ের অস্থিসন্ধিতে চাপের পরিবর্তন, লিগামেন্ট বা টেনডনের নড়াচড়া থেকেও এমন শব্দ হতে পারে। মাঝে মাঝে স্বাভাবিকভাবে শব্দ হলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
শব্দ হওয়ার পর স্বস্তি লাগে কেন?
অনেকেই ঘাড় ফাটানোর পর সাময়িকভাবে আরাম অনুভব করেন। এর কারণ হতে পারে অস্থিসন্ধি ও আশপাশের টিস্যুতে সাময়িক টান কমে যাওয়া এবং নড়াচড়ার অনুভূতিতে পরিবর্তন আসা।
দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকলে ঘাড়ের পেশিতে শক্তভাব তৈরি হতে পারে। তখন ঘাড় নড়াচড়া করালে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু এই স্বস্তি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে ঘাড় ফাটানোই সমস্যার সমাধান। বরং বারবার ঘাড় ফাটানোর প্রয়োজন হলে কেন ঘাড়ে এত টান বা অস্বস্তি হচ্ছে, সেটি খুঁজে দেখা বেশি জরুরি।
কখন ঘাড় ফাটানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
মূল সমস্যা শব্দে নয়, কীভাবে এবং কত ঘনঘন ঘাড় ফাটানো হচ্ছে, সেখানে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের চিকিৎসকদের মতে, খুব ঘনঘন বা অতিরিক্ত জোরে ঘাড় ফাটালে সময়ের সঙ্গে অস্থিসন্ধির স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে। পেশিতে টান লাগা বা স্নায়ুতে চাপ পড়ার মতো সমস্যাও হতে পারে।
টিভি ৯ বাংলার প্রতিবেদনে অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর লেফটেন্যান্ট কর্নেল রূপেশ প্রসাদও জানিয়েছেন, স্বাভাবিক নড়াচড়ার সময় কখনো ঘাড়ে শব্দ হলে এবং এর সঙ্গে ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ না থাকলে সাধারণত ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু অভ্যাসবশত বারবার জোর করে ঘাড় মুচড়ে শব্দ বের করা উচিত নয়। এতে ঘাড়ের পেশি, লিগামেন্ট ও অস্থিসন্ধিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
ঘাড়ের পেশিতে টান লাগতে পারে
ঘাড়ের চারপাশে থাকা পেশি মাথাকে স্থির রাখতে এবং ঘাড়ের নড়াচড়ায় সাহায্য করে। হঠাৎ করে ঘাড়কে স্বাভাবিক সীমার বাইরে ঘোরালে এসব পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
বিশেষ করে কেউ যদি নিজের হাত দিয়ে ঘাড় টেনে বা ঝাঁকুনি দিয়ে নিয়মিত শব্দ বের করার চেষ্টা করেন, তাহলে পেশিতে টান লাগা, ব্যথা বা শক্তভাব তৈরি হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও ভুলভাবে বা অতিরিক্ত জোরে ঘাড় ফাটালে পেশিতে টান লাগার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
লিগামেন্টের ওপরও চাপ পড়ে
লিগামেন্ট হলো এমন শক্ত টিস্যু, যা অস্থিকে অস্থির সঙ্গে যুক্ত রাখতে সাহায্য করে। ঘাড়ের অস্থিসন্ধিকে স্থিতিশীল রাখতেও এগুলোর ভূমিকা আছে।
বারবার অতিরিক্ত নড়াচড়া করলে লিগামেন্টে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ঘাড়কে জোর করে বিভিন্ন দিকে মুচড়ানোর অভ্যাস থাকলে অস্থিসন্ধির স্থিতিশীলতা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেন।
তাই ঘাড়ে সামান্য টান হলেই জোর করে শব্দ বের করার অভ্যাস না করাই ভালো।
স্নায়ুতেও চাপ পড়তে পারে
ঘাড়ের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু বের হয়ে যায়। ঘাড়ের অস্থি, ডিস্ক বা আশপাশের টিস্যুতে সমস্যা হলে এসব স্নায়ুতে চাপ পড়তে পারে।
জোর করে ঘাড় নড়াচড়া করার পর যদি হাতের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যায়, ঝিনঝিনি হয়, অবশ লাগে বা দুর্বলতা আসে, তখন বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ঘাড় ফাটালে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
স্ট্রোকের আশঙ্কা কি সত্যি?
ঘাড় ফাটানোর সঙ্গে স্ট্রোকের কথা শুনে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। বিষয়টি একটু সতর্কভাবে বোঝা দরকার।
খুব জোরে বা আকস্মিকভাবে ঘাড় মুচড়ানোর মতো কিছু নড়াচড়ায় অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে ঘাড়ের রক্তনালির দেয়ালে ক্ষত বা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। এটিকে cervical artery dissection বলা হয়। সেখানে রক্ত জমাট তৈরি হয়ে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে স্ট্রোক হতে পারে।
তবে সাধারণভাবে মাঝে মাঝে ঘাড়ে শব্দ হওয়া মানেই স্ট্রোকের ঝুঁকি নয়। এই গুরুতর জটিলতা বিরল এবং সাধারণ ঘাড় ফাটানোর সঙ্গে এর সরাসরি কারণগত সম্পর্কও সহজভাবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মূল সতর্কতা হলো, ঘাড়কে জোর করে বা স্বাভাবিক সীমার বাইরে মুচড়ানো এড়িয়ে চলা।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
ঘাড় ফাটানোর পর নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত-
- হঠাৎ তীব্র ঘাড় বা মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া
- হাত বা পায়ের দুর্বলতা বা অবশভাব
- চোখে হঠাৎ দেখতে সমস্যা হওয়া
- হাঁটতে অসুবিধা হওয়া
- হাতের দিকে ঝিনঝিনি বা অবশভাব ছড়িয়ে পড়া
বিশেষ করে ঘাড়ে জোরালো নড়াচড়ার পর হঠাৎ স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বারবার ঘাড় ফাটানোর ইচ্ছা কেন হয়?
ঘাড় ফাটানোর অভ্যাসের পেছনে অনেক সময় মূল সমস্যা থাকে ঘাড়ে অস্বস্তি বা শক্তভাব।
দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, মোবাইলের দিকে নিচু হয়ে তাকানো, ভুল ভঙ্গিতে বসা এবং মানসিক চাপের কারণে ঘাড়ের পেশিতে টান তৈরি হতে পারে। তখন ঘাড় নড়াচড়া করিয়ে বা ফাটিয়ে সাময়িক আরাম পাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে।
অর্থাৎ বারবার ঘাড় ফাটানোর অভ্যাসকে শুধু একটি বদভ্যাস হিসেবে না দেখে, ঘাড়ে কেন বারবার অস্বস্তি হচ্ছে সেটিও খেয়াল করা উচিত।
কী করলে ঘাড়ের অস্বস্তি কমতে পারে?
ঘাড় ফাটানোর বদলে কিছু সহজ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
একটানা বসে থাকবেন না। কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘ সময় কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন এবং শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করুন।
সোজা হয়ে বসুন। কম্পিউটারের পর্দা এমন উচ্চতায় রাখুন যাতে দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে কাজ করতে না হয়।
মোবাইল ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকুন। দীর্ঘ সময় নিচের দিকে তাকিয়ে ফোন ব্যবহার করলে ঘাড়ে বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
হালকা স্ট্রেচিং করুন। ঘাড়ে ব্যথা না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা নড়াচড়া ও স্ট্রেচিং করা যেতে পারে।
ঘাড় জোর করে মুচড়াবেন না। হাত দিয়ে ঘাড় টেনে বা ঝাঁকুনি দিয়ে শব্দ বের করার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকও ঘাড়ের অস্বস্তি কমাতে নিয়মিত উপযুক্ত স্ট্রেচিং, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং সঠিক বসার ভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্যথা থাকলে শুধু ঘাড় ফাটিয়ে যাবেন না
ঘাড়ে নিয়মিত ব্যথা হলে বারবার ফাটিয়ে সাময়িক আরাম নেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
ঘাড়ের ব্যথার পেছনে পেশিতে টান, ভুল বসার অভ্যাস, ডিস্কের সমস্যা, স্নায়ুতে চাপসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণটি শনাক্ত করা দরকার।
বিশেষ করে ব্যথার সঙ্গে হাত অবশ হওয়া, দুর্বলতা, ঝিনঝিনি, মাথা ঘোরা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। টিভি ৯ বাংলার প্রতিবেদনে এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাহলে ঘাড়ে শব্দ হলেই কি ভয় পাবেন?
না। ঘাড়ে মাঝে মাঝে নিজে থেকেই শব্দ হওয়া এবং জোর করে বারবার ঘাড় ফাটানো এক বিষয় নয়।
স্বাভাবিক নড়াচড়ার সময় কখনো ঘাড়ে মট করে শব্দ হলো, কিন্তু কোনো ব্যথা, অবশভাব, দুর্বলতা বা অন্য সমস্যা নেই, তাহলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
কিন্তু ঘাড় ফাটানোর জন্য যদি বারবার হাত দিয়ে টানতে হয়, জোর করে মুচড়াতে হয় বা দিনে বারবার শব্দ বের করার প্রয়োজন হয়, তাহলে অভ্যাসটি কমানো ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বস্তি পাওয়ার জন্য ঘাড়কে জোর করে মুচড়ে শব্দ বের করা নয়, বরং ঘাড়ে কেন বারবার টান তৈরি হচ্ছে সেই কারণটি ঠিক করা।
দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করলে বিরতি নিন, বসার ভঙ্গি ঠিক রাখুন, মোবাইল ব্যবহারের সময় ঘাড়ের ওপর চাপ কমান এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত ব্যায়াম করুন। আর ব্যথা বা স্নায়বিক কোনো উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে ঘাড় মুচড়ে সমস্যাটি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, টিভি ৯ বাংলা



