logo
Advertisement

শাপলা খেলে কি কমে ডায়াবেটিস, ইউটিআই নিয়েও যা বলছে গবেষণা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
শাপলা খেলে কি কমে ডায়াবেটিস, ইউটিআই নিয়েও যা বলছে গবেষণা
ছবি: দেশ প্রকাশ

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। বর্ষায় পুকুর, বিল কিংবা জলাশয়ের পানিতে ফুটে থাকা এই ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বহুদিন ধরে গ্রামবাংলার খাবার ও লোকজ চিকিৎসার সঙ্গেও এর বিভিন্ন অংশের ব্যবহার জড়িয়ে আছে। শাপলা বা জলশাপলার বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali। এই উদ্ভিদের ফুল, বীজ ও কন্দ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও হয়েছে।

ডায়াবেটিস, প্রদাহ, মূত্রনালির সমস্যা এবং কিছু সংক্রমণের ক্ষেত্রে শাপলার সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। শাপলা খেলে ডায়াবেটিস বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা UTI সেরে যায়, এমন শক্তিশালী মানব-গবেষণার প্রমাণ এখনো নেই। বরং এখন পর্যন্ত পাওয়া বেশির ভাগ প্রমাণ এসেছে ল্যাবরেটরি, কোষ বা প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে।

শাপলার কোন অংশ নিয়ে গবেষণা হয়েছে

শাপলার ফুল, বীজ ও কন্দ বা রাইজোমে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান পাওয়া গেছে। গবেষণায় ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্যানিন, স্যাপোনিন, স্টেরলসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এসব যৌগের কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যক্রম দেখিয়েছে।

বাংলাদেশেও Nymphaea nouchali নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের পুকুর থেকে সংগ্রহ করা শাপলার ফুলের নির্যাস বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা দেখতে পেয়েছিলেন।

এ ধরনের ফলাফল থেকেই শাপলার সম্ভাব্য ঔষধি গুণ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কী পাওয়া গেছে

শাপলা নিয়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কিত গবেষণার ফল তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে এর বীজ ও কন্দের নির্যাস নিয়ে প্রাণী ও কোষের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে।

একটি গবেষণায় Nymphaea nouchali বীজের নির্যাস ইনসুলিনের প্রতি কোষের সংবেদনশীলতা এবং গ্লুকোজ ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বীজের নির্যাস কোষে PPAR-gamma নামের একটি রিসেপ্টরের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে GLUT4 নামের গ্লুকোজ পরিবহনকারী প্রোটিনের প্রকাশ বাড়ে এবং কোষের গ্লুকোজ গ্রহণের ক্ষমতা বাড়তে পারে।

সহজ ভাষায় বললে, গবেষণাটি এমন একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে যেখানে শাপলার কিছু উপাদান শরীরের কোষকে গ্লুকোজ ব্যবহারে আরও কার্যকর হতে সাহায্য করতে পারে।

তবে এটি মানুষের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা প্রমাণ করে না। গবেষণাটি কোষের ওপর পরিচালিত হয়েছিল এবং আগের গবেষণার কিছু অংশ প্রাণীর ওপর করা হয়েছিল।

শাপলার কন্দ নিয়েও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

২০২১ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় সেদ্ধ Nymphaea nouchali কন্দের গুঁড়া নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, এটি ইঁদুরের খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার মাত্রা কমাতে পারে। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে অন্ত্রে আলফা-গ্লুকোসিডেজ এনজাইমের কার্যক্রম কমানো এবং কোষে গ্লুকোজ গ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি উঠে আসে।

একই গবেষণায় কন্দের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমও দেখা যায়। এমনকি উচ্চ রক্তশর্করার সঙ্গে সম্পর্কিত হিমোগ্লোবিন ও ইনসুলিনের গ্লাইকেশন কমানোর সম্ভাবনাও পরীক্ষায় পাওয়া যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, এই ফলাফল ইঁদুরের গবেষণা থেকে পাওয়া। মানুষের শরীরে একই ফল হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

UTI-এর ক্ষেত্রে কেন শাপলার কথা বলা হয়

শাপলার লোকজ ব্যবহারের সঙ্গে মূত্রনালির বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে Nymphaea প্রজাতির বিভিন্ন অংশ মূত্রসংক্রান্ত সমস্যায় ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে পাওয়া Nymphaea nouchali নিয়েও গবেষণায় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যক্রমের প্রমাণ মিলেছে। শাপলার ফুলের নির্যাস নিয়ে করা একটি গবেষণায় বিভিন্ন মানব-রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে এর কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছিল। ফলাফলে কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে নির্যাসটি বাধা দিতে পারে বলে দেখা যায়।

আরেকটি গবেষণায় শাপলার বীজের নির্যাসও কয়েকটি রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যক্রম দেখিয়েছে। পরীক্ষায় E. coli, Klebsiella pneumoniae, Staphylococcus aureusসহ কয়েকটি জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যক্রম দেখা যায়।

এখান থেকেই শাপলা UTI-এর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে এমন ধারণার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

কিন্তু UTI হলে শুধু শাপলা খাওয়া কি যথেষ্ট?

না। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

UTI সাধারণত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। প্রস্রাবের সময় জ্বালা, বারবার প্রস্রাবের বেগ, তলপেটে অস্বস্তি বা প্রস্রাবের গন্ধ পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ কিডনিতেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

ল্যাবরেটরিতে কোনো উদ্ভিদের নির্যাস ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমিয়েছে মানেই সেই উদ্ভিদ খেলে মানুষের UTI ভালো হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। কারণ গবেষণায় ব্যবহৃত নির্যাসের ঘনত্ব, শরীরে শোষণ, কার্যকর মাত্রা এবং মানুষের শরীরে নিরাপত্তা আলাদা বিষয়।

শাপলার ফুল বা বীজের নির্যাস ব্যাকটেরিয়ার ওপর কাজ করেছে, এমন গবেষণা থাকলেও এটি UTI-এর প্রমাণিত চিকিৎসা নয়।

তাই UTI-এর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে জ্বর, কাঁপুনি, পিঠ বা কোমরের পাশে ব্যথা, বমি কিংবা প্রস্রাবে রক্ত থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

শাপলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণও আলোচনায়

শাপলার বিভিন্ন অংশে থাকা উদ্ভিজ্জ যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

সেদ্ধ শাপলার কন্দ নিয়ে করা গবেষণায় বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরীক্ষায় এটি ফ্রি র‍্যাডিক্যাল কমানোর পাশাপাশি অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কার্যক্রম দেখিয়েছে।

শরীরে অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বিভিন্ন কোষীয় ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় সমস্যার ক্ষেত্রেও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শাপলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য আকর্ষণীয় বিষয়।

তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে মানেই কোনো খাবার রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করবে, এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

শাপলা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা কেন জরুরি

শাপলা বাংলাদেশের পরিচিত জলজ উদ্ভিদ হলেও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা সব শাপলা খাওয়ার জন্য নিরাপদ, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পানি দূষিত হলে উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশেও দূষকের উপস্থিতির ঝুঁকি থাকতে পারে।

এ ছাড়া গবেষণায় ব্যবহৃত নির্যাস এবং সাধারণভাবে রান্না করে খাওয়া শাপলার অংশ এক জিনিস নয়। গবেষণাগারে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্যাস তৈরি করে নির্দিষ্ট মাত্রায় পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ খাবারে সেই একই মাত্রার সক্রিয় উপাদান পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আর কেউ যদি ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তাহলে নিজের মতো করে শাপলার নির্যাস বা কোনো হারবাল পণ্য শুরু করাও ঠিক নয়। রক্তে শর্করা কমানোর সম্ভাবনা থাকলে ওষুধের সঙ্গে মিলিত প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

গবেষণা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু চিকিৎসা হিসেবে প্রমাণিত নয়

শাপলা নিয়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণাগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার। এই জলজ উদ্ভিদে এমন কিছু জৈব সক্রিয় যৌগ রয়েছে, যেগুলো রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম এবং কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

কিন্তু গবেষণার বড় অংশ এখনো কোষ, ল্যাবরেটরি বা প্রাণীর ওপর সীমাবদ্ধ। মানুষের ওপর বড় আকারের, নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া শাপলাকে ডায়াবেটিস বা UTI-এর চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করা যায় না।

অর্থাৎ শাপলা নিয়ে গবেষণার ফলকে সম্ভাবনাময় বলা যায়, কিন্তু এটিকে ওষুধের বিকল্প বলা যায় না।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলার ঔষধি সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণা হলে ভবিষ্যতে হয়তো এর নির্দিষ্ট সক্রিয় উপাদান, কার্যকর মাত্রা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। আপাতত শাপলাকে একটি সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ হিসেবে দেখা এবং প্রমাণিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: নিউজ ১৮