logo

একই টুথব্রাশ কতদিন ব্যবহার করবেন, কত দিন পর বদলানো উচিত জানুন

একই টুথব্রাশ কতদিন ব্যবহার করবেন, কত দিন পর বদলানো উচিত জানুন
ছবি: হেল্থলাইন

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু দাঁত পরিষ্কার করার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আরেকটি বিষয়, টুথব্রাশ কতদিন পর বদলানো উচিত?

অনেকেই একটি টুথব্রাশ ছয় মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত ব্যবহার করেন। ব্রিসল বা আঁশগুলো পুরোপুরি ছড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত নতুন ব্রাশ কেনার প্রয়োজন মনে করেন না। অথচ দাঁতের যত্ন ঠিক রাখতে নিয়মিত টুথব্রাশ বদলানোও জরুরি।

সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে পুরোনো টুথব্রাশ থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার আগে একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পুরোনো টুথব্রাশে জীবাণু থাকতে পারে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে ব্রিসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কিন্তু টুথব্রাশ ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কতদিন পর টুথব্রাশ বদলানো উচিত?

আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস পর টুথব্রাশ বদলানো উচিত। ব্রিসল তার আগেই বেঁকে গেলে, ছড়িয়ে গেলে বা ক্ষয়ে গেলে আরও আগে বদলাতে হবে।

কারণ সময়ের সঙ্গে টুথব্রাশের ব্রিসল নষ্ট হয়ে যায়। তখন আগের মতো কার্যকরভাবে দাঁতের ওপর জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করতে পারে না।

শিশুদের ক্ষেত্রে আরও দ্রুত ব্রাশ বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে তারা যদি ব্রাশের ওপর বেশি চাপ দেয় বা ব্রিসল দ্রুত ছড়িয়ে যায়।

পুরোনো টুথব্রাশে কি জীবাণু জমে?

হ্যাঁ, ব্যবহৃত টুথব্রাশে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। ব্রাশ ব্যবহারের পর এতে লালা, খাবারের ক্ষুদ্র অংশ ও টুথপেস্টের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে। ভেজা অবস্থায় ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে রাখলে জীবাণু বৃদ্ধির সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

তবে এখানে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, টুথব্রাশে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেও এসব জীবাণু যে সাধারণভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, তার প্রমাণ নেই।

তাই মূল বিষয় হলো টুথব্রাশ পরিষ্কার রাখা, শুকিয়ে রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর বদলে ফেলা।

পুরোনো টুথব্রাশ কি ক্যানসারের কারণ?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুরোনো টুথব্রাশ, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ক্যানসারের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু পুরোনো টুথব্রাশ ব্যবহার সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে, এমন নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাই শুধু টুথব্রাশ পুরোনো হয়ে গেছে বলে ক্যানসারের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং টুথব্রাশ নিয়মিত বদলানোর মূল কারণ হলো এর কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং ভালো মৌখিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু এই বিষয়কে সরাসরি পুরোনো টুথব্রাশ থেকে ক্যানসারের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা এখনই যথেষ্ট প্রমাণভিত্তিক নয়।

ব্রিসল ছড়িয়ে গেলে কেন ব্রাশ বদলাবেন?

অনেকেই মনে করেন ব্রিসল যতক্ষণ না পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ ব্রাশ ব্যবহার করা যায়। আসলে ব্রিসল ছড়িয়ে পড়া বা বেঁকে যাওয়া টুথব্রাশ বদলানোর গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

নষ্ট ব্রিসল দাঁতের সব জায়গায় ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে দাঁতের ফাঁক ও মাড়ির কাছাকাছি অংশে প্লাক থেকে যেতে পারে।

এ ছাড়া অতিরিক্ত শক্ত ব্রিসল বা বেশি চাপ দিয়ে দাঁত মাজলে মাড়িতে আঘাত লাগতে পারে। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহার এবং খুব বেশি চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

টুথব্রাশ কীভাবে পরিষ্কার রাখবেন?

টুথব্রাশ পরিষ্কার রাখার জন্য খুব জটিল কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই।

প্রতিবার দাঁত মাজার পর পরিষ্কার পানিতে ব্রাশ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর সেটিকে সোজা করে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ব্রাশটি শুকিয়ে যেতে পারে।

ভেজা টুথব্রাশ দীর্ঘ সময় বন্ধ পাত্রে রাখা ঠিক নয়। এতে জীবাণু বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে টুথব্রাশ ভাগাভাগি করা উচিত নয়। এতে লালা ও জীবাণু এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।

টুথব্রাশ ঢেকে রাখা কি ভালো?

অনেকে ব্রাশের মাথায় সবসময় ঢাকনা দিয়ে রাখেন। কিন্তু ব্রাশ ব্যবহারের পর সেটি ভেজা অবস্থায় বন্ধ পাত্রে রাখলে বরং জীবাণু বৃদ্ধির সুযোগ বাড়তে পারে।

তাই ব্রাশ ধুয়ে নিয়ে সোজা করে খোলা বাতাসে শুকাতে দেওয়া ভালো। ভ্রমণের সময় অবশ্য পরিষ্কার ব্রাশ কভার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাড়িতে সবসময় ভেজা ব্রাশ বন্ধ পাত্রে আটকে রাখা ঠিক নয়।

টয়লেটের পাশে টুথব্রাশ রাখবেন?

বাথরুমে টুথব্রাশ রাখাই স্বাভাবিক। তবে সম্ভব হলে টয়লেটের একেবারে পাশে না রাখাই ভালো।

ব্রাশটি সোজা করে এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখানে সহজে বাতাস চলাচল করে এবং অন্য কোনো ব্রাশের সঙ্গে ব্রিসল লেগে থাকে না।

টয়লেট ফ্লাশ করার সময় আশপাশে ক্ষুদ্র জলকণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই টুথব্রাশকে পরিষ্কার ও শুকনো রাখার দিকে নজর দেওয়া ভালো।

অসুস্থ হওয়ার পর কি টুথব্রাশ বদলাবেন?

সাধারণ সর্দি-জ্বর হওয়ার পর প্রত্যেকবার টুথব্রাশ বদলানো বাধ্যতামূলক নয়। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থতার সময় কিছু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ব্রাশে থাকতে পারে। তবে একই ব্যক্তির পুনরায় সংক্রমণের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত টুথব্রাশকে সাধারণভাবে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয় না।

তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম, অথবা যাদের ঠোঁটে বারবার ঠান্ডাজনিত ফোসকা বা কোল্ড সোর হয়, তাদের ক্ষেত্রে নতুন ব্রাশ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

কী ধরনের টুথব্রাশ ব্যবহার করবেন?

টুথব্রাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নরম ব্রিসল।

আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে দিনে দুইবার, প্রতিবার দুই মিনিট করে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শও দেওয়া হয়।

ম্যানুয়াল ও বৈদ্যুতিক, দুই ধরনের টুথব্রাশই কার্যকর হতে পারে। কোনটি ব্যবহার করবেন, তা ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর নির্ভর করে।

দাঁত মাজার সময় কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?

শুধু সময়মতো ব্রাশ বদলালেই দাঁত ও মাড়ি ভালো থাকবে না। ব্রাশ করার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু সাধারণ ভুল হলো-

  • খুব জোরে দাঁত মাজা
  • শক্ত ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করা
  • খুব অল্প সময় ব্রাশ করা
  • দাঁতের পেছনের অংশ পরিষ্কার না করা
  • ব্রাশ করার পর ব্রাশ না ধুয়ে রাখা
  • অন্যের সঙ্গে টুথব্রাশ ভাগাভাগি করা
  • দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার করা

এসব অভ্যাস এড়িয়ে চললে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেওয়া সহজ হয়।

ক্যানসার নিয়ে ভয় নয়, সচেতনতা জরুরি

পুরোনো টুথব্রাশ নিয়মিত বদলানোর অভ্যাস অবশ্যই ভালো। কিন্তু এর সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

টুথব্রাশের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দাঁত থেকে প্লাক ও খাবারের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করা। তাই ব্রাশটি যেন কার্যকর অবস্থায় থাকে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৩ থেকে ৪ মাস পর ব্রাশ বদলানো, ব্রিসল নষ্ট হলে তার আগেই নতুন ব্রাশ নেওয়া, প্রতিবার ব্যবহারের পর ব্রাশ ধুয়ে শুকিয়ে রাখা এবং কারও সঙ্গে ব্রাশ ভাগাভাগি না করাই ভালো অভ্যাস।

একটি টুথব্রাশ বছরের পর বছর ব্যবহার করা ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে ব্রিসল নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্রাশের পরিষ্কার করার ক্ষমতা কমে যায়। তাই সাধারণভাবে ৩ থেকে ৪ মাস পর টুথব্রাশ বদলানো ভালো।

তবে পুরোনো টুথব্রাশ ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই আতঙ্ক নয়, সঠিক মৌখিক পরিচর্যার অভ্যাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা