চোখের সামনে হঠাৎ কালো পর্দা বা ছায়া দেখছেন, জানুন কী ঘটছে

চোখের সামনে হঠাৎ কালো ছায়া নেমে আসছে, যেন কেউ এক পাশ থেকে ধীরে ধীরে একটি পর্দা টেনে দিচ্ছে। অনেকেই এমন অস্বাভাবিক দৃষ্টির পরিবর্তনকে চোখের ক্লান্তি, বেশি সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফল কিংবা ঘুমের অভাব বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ এমন ছায়া দেখা সবসময় সাধারণ সমস্যা নয়।
বিশেষ করে চোখের সামনে কালো পর্দা বা ছায়ার মতো কিছু দেখা গেলে এর সঙ্গে যদি হঠাৎ অনেকগুলো কালো দাগ বা ভাসমান বিন্দু, আলোর ঝলকানি কিংবা দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে বিষয়টি জরুরি। কারণ এসব লক্ষণ রেটিনায় সমস্যা, বিশেষ করে রেটিনা আলাদা হয়ে যাওয়ার বা রেটিনাল ডিটাচমেন্টের সতর্কসংকেত হতে পারে।
রেটিনা কী?
চোখের একেবারে পেছনে থাকা আলো সংবেদনশীল পাতলা স্তরকে রেটিনা বলা হয়। আমরা কোনো বস্তু দেখলে আলো চোখের ভেতর দিয়ে রেটিনায় পৌঁছায়। রেটিনা সেই আলোর সংকেত তৈরি করে মস্তিষ্কে পাঠায়। এরপর মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে ছবিতে পরিণত করে।
রেটিনা স্বাভাবিক জায়গা থেকে সরে গেলে বা আলাদা হয়ে গেলে আক্রান্ত অংশ ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। দ্রুত চিকিৎসা না হলে দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
চোখের সামনে কালো পর্দা দেখার অর্থ কী?
চোখের দৃষ্টির কোনো অংশে হঠাৎ কালো ছায়া বা পর্দার মতো অন্ধকার দেখা রেটিনা আলাদা হয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অফ অফথালমোলজির (American Academy of Ophthalmology) EyeWiki-তে রেটিনা আলাদা হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দৃষ্টিক্ষেত্রের একাংশে পর্দা বা ছায়ার মতো অন্ধকার দেখা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। NHS-ও হঠাৎ কালো পর্দা বা ছায়া দেখা, আলোর ঝলকানি এবং নতুন করে ভাসমান কালো দাগ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
তবে এমন লক্ষণ দেখা মানেই রেটিনা আলাদা হয়ে গেছে, এমন নয়। বাড়িতে বসে কারণ নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। চোখের চিকিৎসক পরীক্ষা করেই বিষয়টি নির্ণয় করতে পারবেন।
সঙ্গে আরও যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে
রেটিনার সমস্যার ক্ষেত্রে কালো পর্দা বা ছায়ার পাশাপাশি আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
হঠাৎ অনেক কালো দাগ দেখা
চোখের সামনে ছোট ছোট কালো বিন্দু, দাগ, রেখা বা মাকড়সার জালের মতো কিছু ভাসতে দেখা যায়। এগুলোকে ফ্লোটার বলা হয়।
অনেকের দীর্ঘদিন ধরে অল্প কিছু ফ্লোটার থাকতে পারে এবং তা গুরুতর নাও হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে নতুন অনেক ফ্লোটার দেখা দিলে বা আগের তুলনায় দ্রুত বেড়ে গেলে সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
আলোর ঝলকানি দেখা
চোখ বন্ধ করলেও বা অন্ধকার জায়গায় হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা যেতে পারে। রেটিনার ওপর টান তৈরি হলে এমন আলোর ঝলকানি হতে পারে।
বিশেষ করে নতুন করে ফ্লোটারের সঙ্গে আলোর ঝলকানি দেখা গেলে চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি।
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তনও সতর্কতার লক্ষণ হতে পারে। রেটিনা আলাদা হওয়ার ক্ষেত্রে দৃষ্টির পরিবর্তন ধীরে ধীরে বা হঠাৎ হতে পারে।
পাশের দৃষ্টি কমে যাওয়া
কেউ কেউ সরাসরি সামনে থাকা জিনিস দেখতে পেলেও পাশের দৃষ্টিক্ষেত্রে অন্ধকার বা ছায়া অনুভব করতে পারেন। রেটিনার কোনো অংশ আলাদা হয়ে গেলে এমন পরিবর্তন হতে পারে।
রেটিনা আলাদা হয়ে যায় কেন?
রেটিনা আলাদা হয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে চোখের ভেতরের জেলির মতো পদার্থে স্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে। এই পরিবর্তনের কারণে কখনো রেটিনায় টান পড়ে এবং ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ছাড়া যাদের চোখের পাওয়ার অনেক বেশি, আগে ছানি অস্ত্রোপচার হয়েছে, চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে বা পরিবারে রেটিনা আলাদা হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে ঝুঁকির কারণ না থাকলেও রেটিনায় সমস্যা হতে পারে। তাই হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন হলে শুধু নিজের বয়স বা আগের চোখের সমস্যার ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
চোখের ক্লান্তি আর রেটিনার সমস্যার পার্থক্য
দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের পর চোখ শুকিয়ে যাওয়া, জ্বালা করা, ভারী লাগা বা সাময়িক ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে। বিশ্রাম নিলে অনেক সময় এসব সমস্যা কমে যায়।
কিন্তু হঠাৎ চোখের সামনে কালো পর্দা বা ছায়া নেমে আসা, নতুন করে প্রচুর ফ্লোটার দেখা, আলোর ঝলকানি বা দৃষ্টিক্ষেত্রের কোনো অংশ অন্ধকার হয়ে যাওয়া সাধারণ চোখের ক্লান্তির লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এসব লক্ষণ রেটিনার গুরুতর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
কখন দ্রুত চোখের চিকিৎসা নিতে হবে?
নিচের যেকোনো লক্ষণ হঠাৎ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা জরুরি চোখের চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত-
- চোখের সামনে কালো পর্দা বা ছায়া দেখা
- হঠাৎ অনেক ফ্লোটার বা কালো দাগ দেখা
- হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা
- দৃষ্টিশক্তি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া
- পাশের দৃষ্টিতে অন্ধকার বা ছায়া দেখা
- দৃষ্টির কোনো অংশ হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া
জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা বা The National Health Service (NHS)-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব লক্ষণ দ্রুত পরীক্ষা করা প্রয়োজন, কারণ রেটিনা আলাদা হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসা না করলে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকতে পারে।
অপেক্ষা করে দেখবেন না
চোখের অনেক সমস্যা সাময়িক হতে পারে। তাই কেউ কেউ ভাবতে পারেন, আজ একটু বিশ্রাম নিলে হয়তো কাল ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু রেটিনার সমস্যার ক্ষেত্রে এমন অপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভারতীয় চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. অখিলেশ যাদব হঠাৎ চোখের সামনে পর্দার মতো ছায়া দেখা গেলে একই দিনে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেটিনাল টিয়ার, রেটিনাল ডিটাচমেন্ট বা অন্য কোনো সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বাড়িতে বসে নির্ভরযোগ্যভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চোখের চিকিৎসক সাধারণত চোখের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনে চোখের মণি বড় করার জন্য বিশেষ ধরনের ড্রপ ব্যবহার করে রেটিনা পরীক্ষা করা হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে চোখের ছবি, আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরীক্ষা দরকার হবে, তা রোগীর লক্ষণ ও চিকিৎসকের পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে।
রেটিনা আলাদা হলে কি চিকিৎসা সম্ভব?
হ্যাঁ, রেটিনার সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসাযোগ্য। রেটিনায় শুধু ছিঁড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে লেজার বা অন্য পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হতে পারে। রেটিনা আলাদা হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসার ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে সমস্যাটি কত দ্রুত শনাক্ত হয়েছে এবং রেটিনার কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে তার ওপর। তাই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কালো ছায়া দেখলে নিজে থেকে চোখের ড্রপ ব্যবহার করবেন?
নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা চোখের ড্রপ ব্যবহার করে অপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ কালো পর্দা বা ছায়া দেখা গেলে এর প্রকৃত কারণ পরীক্ষা ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে শুধু চোখের ক্লান্তি মনে করে চিকিৎসা দেরি করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে রেটিনা পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।
চোখের সামনে হঠাৎ কালো পর্দা বা ছায়া দেখা একটি অস্বাভাবিক দৃষ্টির পরিবর্তন। এর সঙ্গে নতুন করে অনেক ফ্লোটার, আলোর ঝলকানি, ঝাপসা দেখা বা পাশের দৃষ্টি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ এসব লক্ষণ রেটিনা আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যার সতর্কসংকেত হতে পারে।
তবে এমন লক্ষণ দেখলেই নিশ্চিতভাবে রেটিনা আলাদা হয়ে গেছে, এমন বলা যায় না। দ্রুত চোখ পরীক্ষা করানোই মূল কথা। চোখের দৃষ্টির ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন হলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
