logo
Advertisement

কাছে থেকেও কী কথা শুনতে কষ্ট হচ্ছে, জেনে নিন কারণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
কাছে থেকেও কী কথা শুনতে কষ্ট  হচ্ছে, জেনে নিন কারণ
ছবি : সংগৃহীত

একসময় পরিবারের আড্ডায় সবাই কী বলছে তা সহজেই শোনা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে যেন কথাগুলো অস্পষ্ট লাগতে শুরু করে। বারবার অন্যকে কথা পুনরায় বলতে বলতে অনেকেই ভাবেন, হয়তো সবাই খুব আস্তে কথা বলছে বা স্পষ্ট করে বলছে না। বাস্তবে সমস্যাটি অন্য কোথাও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার একটি সাধারণ অবস্থা হলো ‘প্রেসবাইকিউসিস’ বা বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস। এটি সাধারণত দুই কানেই প্রভাব ফেলে এবং অনেক বছর ধরে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা না করা শ্রবণশক্তি হ্রাস শুধু শুনতে সমস্যাই তৈরি করে না, এটি মানসিক সক্ষমতা হ্রাস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

প্রেসবাইকিউসিস কী

প্রেসবাইকিউসিস হলো বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি মূলত কানের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন, শ্রবণ স্নায়ু এবং শ্রবণ ব্যবস্থার অন্যান্য অংশে বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে ঘটে।

তবে শুধু বয়সই নয়, দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকা, কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং বংশগত কারণও এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

যেহেতু শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে, তাই অনেকেই শুরুতে বিষয়টি বুঝতে পারেন না। সাধারণত যোগাযোগে সমস্যা স্পষ্ট হওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে।


যেসব লক্ষণ সতর্ক সংকেত হতে পারে

প্রেসবাইকিউসিসের শুরুতে অনেক সময় শব্দ শোনার চেয়ে কথা বোঝার সমস্যা বেশি দেখা দেয়।

কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো-

  • অন্যদের বারবার কথা পুনরায় বলতে বলা
  • ভিড় বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া
  • উচ্চ স্বরের শব্দ কম শোনা
  • মনে হওয়া যে সবাই অস্পষ্টভাবে কথা বলছে
  • টেলিভিশন বা মোবাইলের ভলিউম আগের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেওয়া
  • নারী ও শিশুদের কণ্ঠস্বর শুনতে অসুবিধা হওয়া
  • কানে অবিরাম শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ শোনা

অনেকের ক্ষেত্রে শব্দ শোনা গেলেও কথার অর্থ পরিষ্কারভাবে বুঝতে সমস্যা হয়। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা জনসমাগমস্থলে এই সমস্যা বেশি অনুভূত হতে পারে।

কেন হয় এই সমস্যা?

বয়সজনিত পরিবর্তন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠনগুলো আগের মতো কার্যকর থাকে না। ফলে শব্দ প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা: বছরের পর বছর উচ্চস্বরে গান শোনা, শিল্পকারখানার শব্দ, যানবাহনের আওয়াজ বা কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত শব্দ কানের ক্ষতি করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্‌রোগের মতো কিছু রোগ কানের ভেতরে রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে, যা শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়।

কিছু ওষুধের প্রভাব: নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন বা উচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বংশগত কারণ: পরিবারে যদি বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের ইতিহাস থাকে, তাহলে ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব

শ্রবণশক্তি কমে গেলে শুধু কথোপকথনেই সমস্যা হয় না, এর প্রভাব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।

অনেক মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দেন, কারণ কথা বুঝতে কষ্ট হয় এবং বারবার জিজ্ঞাসা করতে অস্বস্তি লাগে। এর ফলে একাকীত্ব, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • নিয়মিত কথোপকথন শুনতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া
  • কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া
  • কানে দীর্ঘদিন ধরে শব্দ শোনা
  • শ্রবণ সমস্যা কাজ বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করা

একটি শ্রবণ পরীক্ষা সমস্যার কারণ ও মাত্রা নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।

এর চিকিৎসা কি সম্ভব?

বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস সাধারণত পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও বিভিন্ন উপায়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়।

চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে হিয়ারিং এইড ব্যবহার, সহায়ক শ্রবণ যন্ত্র, যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য শারীরিক রোগের সঠিক চিকিৎসা। বর্তমান সময়ের হিয়ারিং এইড আগের তুলনায় অনেক ছোট, উন্নত এবং কার্যকর। এগুলো অনেক মানুষকে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করে।

শ্রবণশক্তি ভালো রাখতে যা করবেন

বয়স বাড়লেও কিছু অভ্যাস শ্রবণশক্তি রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকা এড়িয়ে চলুন এবং প্রয়োজন হলে কানে সুরক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহার করুন। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং ধূমপান পরিহার করুন।

এছাড়া নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষা করান ও লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যদি মনে হয় আগের তুলনায় মানুষের কথা বুঝতে বেশি কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস ধীরে ধীরে বাড়লেও সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যোগাযোগ দক্ষতা, স্বাধীন জীবনযাপন এবং সামগ্রিক জীবনমান ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি