শুধু বয়স্কদের নয় কম বয়সেও হতে পারে বাতের সমস্যা

আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা বলতে অনেকেই বয়স্ক মানুষের হাড় ও জোড়ার ব্যথাকেই বোঝেন। তবে এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক না। বয়স ৪০ হওয়ার আগেও বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস দেখা দিতে পারে যে কারো ক্ষেত্রে। হাতের আঙুলে ব্যথা, কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটু শক্ত হয়ে থাকা বা কখনো জোড়ায় ফোলা বা অস্বস্তির মাধ্যমে এর প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
কর্মব্যস্ততা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কারণে অনেকেই এসব লক্ষণকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু ব্যথা বারবার ফিরে এলে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা চলাফেরার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থ্রাইটিস একক কোনো রোগ না। এটি বিভিন্ন ধরনের রোগের একটি সমষ্টিগত নাম, যেগুলোর ফলে জোড়ায় ব্যথা, প্রদাহ, ফোলা ও শক্তভাব দেখা দিতে পারে। কিছু ধরনের আর্থ্রাইটিস বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগ তরুণ বা অল্প বয়সেও হতে পারে।
অল্প বয়সেই কেন আর্থ্রাইটিস হতে পারে
প্রথমেই বুঝতে হবে, আর্থ্রাইটিসের ধরন অনুযায়ী এর কারণ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো আলাদা। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে জোড়ার তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে। অন্যদিকে, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে নিজের জোড়ার টিস্যুতে আক্রমণ করে।
এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, আগে পাওয়া জোড়ার আঘাত, অতিরিক্ত ওজন এবং কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জটিলতা আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে। আবার কিছু আর্থ্রাইটিসের ধরন তরুণ বয়সেই শুরু হয়।
তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা ব্যায়াম না করার কারণে প্রত্যেকের আর্থ্রাইটিস হবে, এমন নয়। জীবনযাপনের অভ্যাস জোড়ার স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু সব ধরনের আর্থ্রাইটিসের একমাত্র কারণ এগুলো নয়।
আর্থ্রাইটিসের ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ
জোড়ায় বারবার ব্যথা হওয়া: আর্থ্রাইটিসের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো জোড়ায় ব্যথা। হাঁটু, কবজি, হাতের আঙুল, গোড়ালি কিংবা কোমরের জোড়ায় ব্যথা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা চলাফেরার সময় বাড়ে, আবার কারও ক্ষেত্রে বিশ্রামের সময়ও অস্বস্তি থাকে।
তরুণ বয়সে ব্যথা হলে অনেকেই অতিরিক্ত হাঁটাচলা, ব্যায়াম বা কাজের চাপকে দায়ী করেন। এসব কারণেও ব্যথা হতে পারে। তবে ব্যথা বারবার ফিরে এলে, দীর্ঘদিন থাকলে বা দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সকালে ঘুম থেকে উঠে জোড়া শক্ত লাগা: ঘুম থেকে ওঠার পর হাতের আঙুল, কবজি, হাঁটু বা পায়ের জোড়া শক্ত মনে হওয়া আর্থ্রাইটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। কিছুক্ষণ নড়াচড়া করার পর শক্তভাব কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে সকালে জোড়ার শক্তভাব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগে সকালে ৩০ মিনিটের বেশি জোড়া শক্ত থাকার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
তবে শুধু সকালে জোড়া শক্ত লাগলেই আর্থ্রাইটিস হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুমের ভঙ্গি এবং অন্যান্য রোগের কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে।
জোড়া ফুলে যাওয়া বা গরম অনুভব হওয়া: হাতের আঙুল, কবজি, হাঁটু কিংবা অন্য কোনো জোড়া ফুলে গেলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। কখনো আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, স্পর্শ করলে ব্যথা বা গরম অনুভূতিও হতে পারে।
জোড়ার ভেতরে প্রদাহ তৈরি হলে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে একাধিক জোড়ায় একই ধরনের ফোলা ও ব্যথা হলে প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিসের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।
তবে আঘাত, সংক্রমণ এবং অন্যান্য সমস্যার কারণেও জোড়া ফুলে যেতে পারে। কোনো জোড়া হঠাৎ খুব ব্যথাযুক্ত, লাল বা গরম হয়ে গেলে, বিশেষ করে জ্বর থাকলে, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এটি শুধু আর্থ্রাইটিস নয়, জোড়ার সংক্রমণেরও লক্ষণ হতে পারে।
অল্প কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া: সব সময় ক্লান্ত লাগা বা শরীরে শক্তি না পাওয়া সরাসরি আর্থ্রাইটিসের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। তবে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগে জোড়ার ব্যথা ও শক্তভাবের পাশাপাশি ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থাকলে দৈনন্দিন কাজ করার আগ্রহ ও শক্তি কমে যেতে পারে। ঘুমের ব্যাঘাত এবং ব্যথাও ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
অবশ্য রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন কারণেও ক্লান্তি হতে পারে। তাই শুধু ক্লান্তির ভিত্তিতে আর্থ্রাইটিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ক্লান্তির সঙ্গে জোড়ায় ব্যথা, ফোলা বা দীর্ঘস্থায়ী শক্তভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
জোড়ার স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যাওয়া: আগের মতো সহজে হাঁটু ভাঁজ করতে না পারা, সিঁড়ি ওঠানামায় কষ্ট হওয়া, হাতের আঙুল বাঁকাতে সমস্যা কিংবা বোতাম লাগানোর মতো ছোট কাজ করতে অসুবিধা হওয়া জোড়ার সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
আর্থ্রাইটিসের কারণে জোড়ায় ব্যথা, ফোলা ও শক্তভাব তৈরি হলে নড়াচড়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রদাহ জোড়ার ক্ষতিও করতে পারে।
তবে আঘাত, পেশির দুর্বলতা, স্নায়ুর সমস্যা কিংবা অন্য কারণেও নড়াচড়ায় অসুবিধা হতে পারে। তাই সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমাতে যা যা করবেন
সব ধরনের আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস জোড়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং বিশেষ করে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা জোড়ার ওপর কম চাপ পড়ে এমন ব্যায়াম করতে পারেন। ব্যথা বা ফোলা বেড়ে গেলে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অতিরিক্ত ওজন হাঁটু ও শরীরের অন্যান্য ভারবাহী জোড়ার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
একটানা বসে থাকবেন না
দীর্ঘ সময় ডেস্কে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ান, অল্প হাঁটুন এবং শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করুন। এতে পেশি ও জোড়ার অস্বস্তি কমাতে সাহায্য হতে পারে।
আঘাত থেকে সতর্ক থাকুন
খেলাধুলা বা ব্যায়ামের সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন। জোড়ায় আঘাত পেলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।
সুষম খাবার খান
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও প্রয়োজনীয় প্রোটিন রাখুন। কোনো বিশেষ খাবার সব ধরনের আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধ বা নিরাময় করে, এমন দাবি বিশ্বাস করার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করুন।
চিকিৎসকের কাছে কখন যাবেন
জোড়ায় ব্যথা বা শক্তভাব কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা কাজকর্মে সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে সকালে দীর্ঘ সময় জোড়া শক্ত থাকা, একাধিক জোড়া ফুলে যাওয়া বা ব্যথার সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকলে দেরি করা উচিত নয়।
চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা এবং এক্স-রে বা অন্য পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ নির্ণয় করতে পারেন। সব ধরনের আর্থ্রাইটিস একই পরীক্ষায় শনাক্ত হয় না। তাই নিজের লক্ষণ দেখে নিজে রোগ নির্ধারণ বা ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।
কোনো জোড়ায় হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব বা গরম অনুভূতির সঙ্গে জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
আর্থ্রাইটিস শুধু বয়স্ক মানুষের রোগ নয়। কিছু ধরনের আর্থ্রাইটিস ৪০ বছরের আগেই দেখা দিতে পারে। জোড়ায় বারবার ব্যথা, সকালে দীর্ঘ সময় শক্তভাব, ফোলা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি এবং নড়াচড়ায় অসুবিধা হলে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই আর্থ্রাইটিস হয়েছে, এমন নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা রোগের কারণ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, জোড়ার কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
