ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে দুধ-চা নিয়ে যা জানা জরুরি

সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা, সঙ্গে বিস্কুট বা হালকা নাশতা, অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে দুধ-চা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বেশ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু যাদের ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের এই দুধ-চা নিয়ে কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফ্যাটি লিভার হলেই দুধ-চা একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। আসল বিষয় হলো চায়ে কতটা দুধ, চিনি এবং অতিরিক্ত ক্যালরি যোগ হচ্ছে। ফ্যাটি লিভার বা বর্তমানে যাকে অনেক ক্ষেত্রে মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা MASLD বলা হয়, তার ব্যবস্থাপনায় খাবারের ধরন, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার হলে দুধ-চা নিয়ে এত আলোচনা কেন?
দুধ-চা নিজে থেকেই ফ্যাটি লিভারের কারণ, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। সমস্যা তৈরি হতে পারে চায়ে অতিরিক্ত চিনি, বেশি দুধ বা ক্রিম এবং এর সঙ্গে নিয়মিত উচ্চ ক্যালরির খাবার যোগ হলে।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যালরি, ওজন বেড়ে যাওয়া এবং খাদ্যে বেশি পরিমাণে চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই চায়ের কাপটিকেও পুরো খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
বিশেষ করে চায়ে কয়েক চামচ চিনি দিয়ে দিনে একাধিক কাপ পান করার অভ্যাস থাকলে মোট দৈনিক চিনি ও ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
চায়ে চিনি থাকলেই সমস্যা বাড়ে?
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া দরকার অতিরিক্ত চিনি এবং মিষ্টি পানীয়ের দিকে। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট (NIDDK) জানিয়েছে, ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে সাধারণ চিনি, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজযুক্ত মিষ্টি খাবার ও পানীয় সীমিত করা উচিত। মিষ্টি চা, কোমল পানীয় এবং চিনি দেওয়া ফলের রসও এই তালিকায় পড়ে।
তাই দুধ-চা পান করলে চিনি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা ভালো। সম্ভব হলে চিনি ছাড়া চা খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
একদিনে এক কাপ চায়ে অল্প চিনি খাওয়ার সঙ্গে দিনে তিন বা চার কাপ চায়ে বারবার চিনি যোগ করার পার্থক্যও মনে রাখতে হবে।
দুধ কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
না, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই যে ফ্যাটি লিভার হলেই দুধ সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে।
তবে পুরো দুধ বা অতিরিক্ত ক্রিম ব্যবহার করলে চায়ে অতিরিক্ত ক্যালরি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট যোগ হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিবর্তে তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তাই চা বানানোর সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দুধ বা ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো।
তাহলে ফ্যাটি লিভার থাকলে কীভাবে দুধ-চা খাবেন?
দুধ-চা একেবারে বাদ দিতে না চাইলে কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে পারেন।
চিনি কমান
চায়ে চিনি কমিয়ে দিন। নিয়মিত বেশি চিনি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারেন।
অতিরিক্ত দুধ বা ক্রিম নয়
চায়ে স্বাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ দুধ ব্যবহার করুন। খুব ঘন করে বানানো দুধ-চা প্রতিদিন একাধিকবার পান না করাই ভালো।
চায়ের সঙ্গে মিষ্টি খাবার কমান
চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে মোট ক্যালরি অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
দিনে একাধিক কাপের অভ্যাস কমান
শুধু চায়ের ধরন নয়, কতবার পান করছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বারবার চা খাওয়ার সঙ্গে যদি প্রতিবার চিনি ও নাশতা থাকে, তাহলে দিনের মোট ক্যালরি ও চিনি দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
দুধ-চায়ের বদলে কোন চা ভালো?
ফ্যাটি লিভার থাকলে চা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এতে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি আছে কি না।
চিনি ছাড়া গ্রিন টি বা সাধারণ চা খেতে পারেন। তবে কোনো চা একাই লিভারের চর্বি গলিয়ে দেবে বা ফ্যাটি লিভার সারিয়ে দেবে, এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে করা ঠিক নয়।
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের মূল বিষয় হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন হলে ওজন কমানো। জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং শরীরের ওজন কমানো লিভারে জমা চর্বি, প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু চা বদলালেই ফ্যাটি লিভার কমবে না
অনেকেই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ার পর একটি নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু বাস্তবে একটি খাবার বাদ দেওয়া বা একটি পানীয় যোগ করার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাস বদলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) পরামর্শ অনুযায়ী, ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, কম স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট, বেশি শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য এবং কম সাধারণ চিনি গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।
এর সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অফ লিভার ডিজিজেস (AASLD) বলছে, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরের ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি ও রোগের বিভিন্ন দিকের উন্নতি হতে পারে।
চায়ের সঙ্গে এই ভুলগুলো করবেন না
ফ্যাটি লিভার থাকলে শুধু চায়ের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। চায়ের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটিও দেখতে হবে।
চায়ের সঙ্গে নিয়মিত কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি, মিষ্টি বা ভাজাভুজি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানো দরকার। কারণ এসব খাবার থেকে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং ক্যালরি শরীরে ঢুকতে পারে।
একইভাবে কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয়ের অভ্যাসও কমানো উচিত। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সাধারণ চিনি ও মিষ্টি পানীয় সীমিত করার পরামর্শ দেয়।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে কী করবেন?
ফ্যাটি লিভারকে শুধু খাবারের সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ওজন, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড, শারীরিক পরিশ্রম এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে নিজের মতো করে কোনো ডিটক্স পানীয়, হারবাল চা বা সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল বা লিভারের পরীক্ষায় অস্বাভাবিকতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার থাকলেই দুধ-চা জীবন থেকে বাদ দিতে হবে, এমন নয়। বরং চায়ে চিনি কতটা, দুধ কতটা, দিনে কয় কাপ পান করছেন এবং চায়ের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেদিকেই বেশি নজর দেওয়া দরকার।
চিনি কমিয়ে, অতিরিক্ত দুধ বা ক্রিম এড়িয়ে এবং চায়ের সঙ্গে মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবারের অভ্যাস কমিয়ে দুধ-চাকে খাদ্যাভ্যাসের তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর অংশ করা যেতে পারে। তবে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের আসল চাবিকাঠি হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ।
সূত্র: টিভি ৯ বাংলা


