ডায়াবেটিস থাকলে কি কলা খাওয়া যাবে, জানুন আসল তথ্য

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই প্রথমে যে খাবারগুলোর দিকে সন্দেহের চোখে তাকান, কলা তার মধ্যে অন্যতম। কলা মিষ্টি, এতে কার্বোহাইড্রেট আছে, তাই রক্তে শর্করা বাড়তে পারে, এমন ধারণা প্রচলিত। কেউ কেউ আবার মনে করেন, ডায়াবেটিস হলে কলা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
আসলে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ডায়াবেটিস থাকলেও কলা খাওয়া যেতে পারে। তবে কলার পাকার মাত্রা এবং খাওয়ার পরিমাণ রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দিনের মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং কলাটি অন্য কী খাবারের সঙ্গে খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিসে কলা কি নিষিদ্ধ?
না। ডায়াবেটিস আছে বলে ফল একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনও ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় পুরো ফল রাখার কথা বলে। ফল থেকে ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার পাওয়া যায়। তবে ফলে প্রাকৃতিকভাবে থাকা কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
ডায়াবেটিস ইউকের তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় কলায় প্রায় ৩০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকতে পারে। তাই বড় আকারের একটি কলা একসঙ্গে খাওয়ার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট বা মাঝারি আকারের কলা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
কলা যত পাকে, ততই কি সমস্যা?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
কলা পাকতে থাকলে এর শর্করার ধরন ও পরিমাণের সঙ্গে সঙ্গে হজমের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়। ডায়াবেটিস ইউকের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাঝারি পর্যায়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ অপরিণত বা কম পাকা কলার তুলনায় অতিরিক্ত পাকা কলা রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক দ্রুত বাড়াতে পারে।
তবে শুধু জিআই দেখেই খাবার বিচার করা ঠিক নয়। কোনো খাবারের কতটা খাওয়া হচ্ছে, সেটিও রক্তে শর্করার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। গ্লাইসেমিক লোডের ধারণাটিও এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একই খাবারের বড় পরিমাণ খেলে মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ বেশি হবে এবং রক্তে শর্করার ওপর প্রভাবও বাড়তে পারে।
কাঁচা বা কম পাকা কলা কি ভালো?
কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। এটি সাধারণ স্টার্চের মতো দ্রুত হজম হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ডায়াবেটিসে শুধু কাঁচা কলাই খেতে হবে।
কারও জন্য কোন ধরনের কলা এবং কতটা উপযুক্ত, তা তার মোট খাদ্যতালিকা, ওষুধ, শারীরিক সক্রিয়তা ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করতে পারে।
তাই পাকা কলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
কলার পরিমাণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু কোন খাবার খাওয়া হচ্ছে তা নয়, কতটা খাওয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ছোট একটি কলা খেলেন। অন্য একজন একই সময়ে দুটি বড় কলা খেলেন। দুজনেই কলা খেয়েছেন, কিন্তু তাদের কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এক নয়।
ডায়াবেটিস ইউকেও বলছে, ফল একবারে অনেকটা না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে খেলে খাবারের পর রক্তে শর্করার বড় ওঠানামা এড়াতে সুবিধা হতে পারে।

তাই কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে বড় কলার বদলে ছোট বা মাঝারি আকারের কলা বেছে নেওয়া এবং নিজের খাবারের পরিকল্পনায় সেটিকে হিসাবের মধ্যে রাখা ভালো।
খালি পেটে কলা খাওয়া কি ঠিক?
ডায়াবেটিসে কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে খালি পেটে খেতেই হবে বা খাওয়া যাবে না, এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই। ব্যক্তিভেদে খাবারের পর রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
তবে কলার মতো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারকে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি বা ফাইবারযুক্ত খাবারের সঙ্গে খেলে সামগ্রিক খাবারের হজম ও কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি ধীর হতে পারে। ডায়াবেটিস ইউকের তথ্যেও বলা হয়েছে, প্রোটিন, চর্বি ও ফাইবার খাবারের গ্লাইসেমিক প্রভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ছোট একটি কলার সঙ্গে চিনি ছাড়া দই বা কিছু বাদাম খাওয়া যেতে পারে। তবে এতে অতিরিক্ত ক্যালরি যোগ হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।
কলা আর কলার জুস এক নয়
পুরো কলা এবং কলার জুসকে একভাবে দেখা ঠিক নয়।
পুরো ফলে ফাইবার থাকে। জুস তৈরি করলে ফলের কাঠামো ভেঙে যায় এবং অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ ফলের কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করা সহজ হয়। এ কারণে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে পুরো ফল সাধারণত জুসের চেয়ে ভালো পছন্দ।
কলা দিয়ে স্মুদি বানানোর ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা দরকার। কলার সঙ্গে মধু, চিনি, আইসক্রিম বা মিষ্টি দই যোগ করলে পানীয়টির মোট চিনি ও ক্যালরি অনেক বেড়ে যেতে পারে।
কলা খেলে নিজের রক্তে শর্করা দেখুন
ডায়াবেটিসে একই খাবার সবার শরীরে একইভাবে কাজ করে না। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ ছোট একটি কলা খাওয়ার পর রক্তে শর্করায় সামান্য পরিবর্তন দেখতে পারেন। আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে একই পরিমাণে বেশি পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করেন, তারা চিকিৎসক বা ডায়াবেটিস শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের সঙ্গে রক্তে শর্করার সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
তবে একটি খাবারের পর একবারের রিডিং দেখে পুরো খাবারটিকে ভালো বা খারাপ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ডায়াবেটিসে ফল বাছাইয়ের সময় কী করবেন?
ডায়াবেটিস থাকলে ফলের ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ নিয়ম মনে রাখা যেতে পারে।
পুরো ফল বেছে নিন: ফলের জুসের বদলে আস্ত ফল খাওয়া ভালো। এতে ফাইবার পাওয়া যায় এবং বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলার সম্ভাবনাও কমে।
পরিমাণ মেনে চলুন: একটি বড় ফল একসঙ্গে খাওয়ার বদলে উপযুক্ত পরিমাণ বেছে নিন। ফলের কার্বোহাইড্রেটও দিনের মোট কার্বোহাইড্রেটের হিসাবের অংশ।

শুধু মিষ্টি স্বাদ দেখে ফল বাদ দেবেন না: পুরো ফলে থাকা প্রাকৃতিক চিনি এবং মিষ্টি পানীয় বা মিষ্টিজাতীয় খাবারে থাকা অতিরিক্ত চিনি এক বিষয় নয়। ডায়াবেটিস ইউকেও পুরো ফলের পরিবর্তে ফ্রি সুগার ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
ফলের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি যোগ করবেন না: কলার ওপর চিনি, মধু বা মিষ্টি সিরাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
দিনের খাবারের হিসাব রাখুন: ভাত, রুটি, আলু, মিষ্টি, পানীয় ও ফল সব মিলিয়েই দিনের মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বিবেচনা করতে হবে।
তাহলে ডায়াবেটিসে কলা খাবেন কীভাবে?
কলা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য নিষিদ্ধ খাবার নয়। বরং সঠিক পরিমাণে পুরো কলা একটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশনাতেও পুরো ফলকে ডায়াবেটিসের খাদ্যাভ্যাসের উপযোগী খাবার হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে একটি বড় ও অতিরিক্ত পাকা কলা একসঙ্গে খাওয়ার বদলে পরিমাণ বুঝে ছোট বা মাঝারি কলা খাওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা থাকলে নিজের খাদ্যতালিকার সঙ্গে মিলিয়ে ফলের পরিমাণ ঠিক করা দরকার।
ডায়াবেটিস থাকলে কলা বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কলার পাকার মাত্রা, পরিমাণ এবং দিনের মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের দিকে নজর রাখতে হবে। শুধু কলা মিষ্টি বলে সেটিকে নিষিদ্ধ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটি প্রাকৃতিক ফল বলে ইচ্ছেমতো খাওয়াও ঠিক নয়। সুষম খাবার, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিজের রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া বোঝাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


