ব্লাড ক্যানসার নিয়ে ৭ ভুল ধারণা ভাঙলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

ব্লাড ক্যানসার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়। এই রোগ মানেই মৃত্যু, রোগীর সংস্পর্শে থাকলে অন্যেরও ক্যানসার হবে, অথবা চিকিৎসায় কেবল কেমোথেরাপিই ভরসা, এমন নানা ধারণা সমাজে প্রচলিত। কিন্তু এসবের অনেকগুলোই সঠিক নয়।
আসলে ব্লাড ক্যানসার কোনো একটি রোগের নাম নয়। লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মাল্টিপল মায়েলোমার মতো বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারকে সাধারণভাবে ব্লাড ক্যানসার বলা হয়। এগুলো শরীরের ভিন্ন কোষ বা টিস্যুতে শুরু হতে পারে এবং রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসাও আলাদা হয়।
সম্প্রতি ব্লাড ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে একজন অনকোলজিস্ট প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা তুলে ধরে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জেনে নিন কোন কথাগুলো আসলে মিথ।
ধারণা ১: ব্লাড ক্যানসার মানেই মৃত্যু
ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়লে রোগী আর সুস্থ হতে পারবেন না, এমন ধারণা ঠিক নয়। রোগের ধরন, পর্যায়, কোষের বৈশিষ্ট্য, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে।
লিউকেমিয়ারও একাধিক ধরন রয়েছে। কিছু লিউকেমিয়া দ্রুত বাড়তে পারে, আবার কিছু তুলনামূলক ধীরে অগ্রসর হয়। একইভাবে লিম্ফোমারও বিভিন্ন ধরন রয়েছে এবং চিকিৎসার ফল একেক ধরনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসায় কিছু ব্লাড ক্যানসার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব, আবার কিছু রোগ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
তাই ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়লেই জীবন শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণা রোগী ও পরিবারের মধ্যে অযথা ভয় তৈরি করতে পারে।
ধারণা ২: ব্লাড ক্যানসার ছোঁয়াচে
এটি অন্যতম প্রচলিত ভুল ধারণা। ব্লাড ক্যানসার একজন মানুষের কাছ থেকে অন্য মানুষের শরীরে সাধারণ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না।
একসঙ্গে থাকা, হাত মেলানো, খাবার ভাগ করে খাওয়া বা রোগীর পাশে থাকার কারণে অন্য কারও ব্লাড ক্যানসার হবে না। National Cancer Institute-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে ক্যানসার ছোঁয়াচে রোগ নয়।
তাই ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে আলাদা করে রাখা বা তার কাছাকাছি যেতে ভয় পাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ধারণা ৩: ব্লাড ক্যানসার হলে সবসময় উপসর্গ দেখা যাবে
ব্লাড ক্যানসারের ক্ষেত্রে সব রোগীর একই ধরনের লক্ষণ থাকবে, এমন নয়। রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর উপসর্গ নির্ভর করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বারবার সংক্রমণ, অকারণে জ্বর, রাতের বেলা ঘাম, ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। লিম্ফোমার ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন অংশে লিম্ফ নোড বা গাঁট ফুলে যেতে পারে।
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুরুতে তেমন স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ক্যানসারের অনেক উপসর্গের পেছনে ক্যানসার ছাড়াও সাধারণ অসুস্থতা বা অন্য কারণ থাকতে পারে।
ধারণা ৪: ব্লাড ক্যানসার মানেই শুধু কেমোথেরাপি
ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা বলতে শুধু কেমোথেরাপিকে বোঝানো ঠিক নয়। কোন চিকিৎসা প্রয়োজন হবে, তা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর।
কিছু ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়। তবে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, স্টেম সেল বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা বিবেচনা করা হতে পারে।
অর্থাৎ একই নামে পরিচিত হলেও বিভিন্ন ধরনের ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা এক নয়। চিকিৎসক রোগের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
ধারণা ৫: বেশি চিনি খেলেই ব্লাড ক্যানসার হয়
চিনি খেলেই ব্লাড ক্যানসার হয়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ক্যানসার কোষও শরীরের অন্যান্য কোষের মতো শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। কিন্তু তাই বলে চিনি খেলেই ক্যানসার তৈরি হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, চিনি খাওয়া ক্যানসারকে সরাসরি বাড়িয়ে দেয় বা চিনি বন্ধ করলেই ক্যানসার ছোট হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ নেই। তবে অতিরিক্ত চিনি খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে এবং স্থূলতা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই চিনি পরিমিত খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু ব্লাড ক্যানসারের সরাসরি কারণ হিসেবে শুধু চিনিকে দায়ী করা ঠিক নয়।
ধারণা ৬: পরিবারে কারও ব্লাড ক্যানসার থাকলে আমারও হবেই
পরিবারে কারও ক্যানসার থাকার অর্থ এই নয় যে পরিবারের অন্য সদস্যেরও নিশ্চিতভাবে ক্যানসার হবে।
কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে বংশগত ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে ক্যানসারের ঝুঁকি শুধু পারিবারিক ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে না। জেনেটিক পরিবর্তন, বয়স এবং বিভিন্ন পরিবেশগত বা শারীরিক কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই পরিবারে ব্লাড ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ধারণা ৭: উপসর্গ গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার দরকার নেই
এটিও বিপজ্জনক ধারণা। শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা উচিত নয়।
ভারতের জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট (National Cancer Institute) বলছে, কোনো উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ক্যানসারের ক্ষেত্রে ব্যথা না থাকলেও রোগ থাকতে পারে। তাই শুধু ব্যথা শুরু হওয়ার অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
অবশ্য ক্লান্তি, জ্বর, ওজন কমা বা গাঁটের মতো লক্ষণ দেখা দিলেই ব্লাড ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। এসব উপসর্গের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব।
ব্লাড ক্যানসার নিয়ে ভয় নয়, সচেতনতা জরুরি
ব্লাড ক্যানসার সম্পর্কে ভুল ধারণা রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অযথা ভয় তৈরি করতে পারে। আবার বিপরীতভাবে, কিছু ভুল বিশ্বাসের কারণে কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরিও করতে পারেন।
তাই ব্লাড ক্যানসার সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগের ধরন বোঝা, উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া। কোনো একটি লক্ষণ বা পারিবারিক ইতিহাসের ভিত্তিতে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়।
সচেতনতা মানে ভয় পাওয়া নয়। বরং শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


