logo

দিনে কতবার বাথরুমে যাওয়া স্বাভাবিক

দিনে কতবার বাথরুমে যাওয়া স্বাভাবিক
ছবি: ডেইলি রেকর্ড

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়খানা হওয়াই কি স্বাভাবিক? নাকি দিনে দুবার বা তিনবার হওয়া অস্বাভাবিক? আবার কারও যদি এক দিন পরপর পায়খানা হয়, তাহলে কি ধরে নিতে হবে তার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে?

মলত্যাগের অভ্যাস নিয়ে এমন প্রশ্ন অনেকেরই থাকে। তবে চিকিৎসকদের মতে, পায়খানা হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো একটি সংখ্যা সবার জন্য স্বাভাবিক নয়। একজন মানুষের জন্য যা স্বাভাবিক, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন হতে পারে। বরং কতবার পায়খানা হচ্ছে তার চেয়ে মলের ধরন, সহজে বের হচ্ছে কি না, ব্যথা হচ্ছে কি না এবং অভ্যাসে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দিনে কতবার পায়খানা হওয়া স্বাভাবিক?

সবার মলত্যাগের অভ্যাস এক রকম নয়। কেউ দিনে একাধিকবার পায়খানা করেন, আবার কেউ এক দিন বা দুদিন পরপর করেন। মূল কথা হলো, সেটি যদি ব্যক্তির স্বাভাবিক অভ্যাসের মধ্যে থাকে এবং অন্য কোনো অস্বস্তিকর লক্ষণ না থাকে, তাহলে শুধু সংখ্যার কারণে চিন্তার প্রয়োজন নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসও বলছে, মানুষের মলত্যাগের ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু সপ্তাহে কতবার পায়খানা হচ্ছে, তা দিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য নির্ধারণ করা হয় না। মল শক্ত বা শুকনো হওয়া, পায়খানা করতে কষ্ট হওয়া এবং পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি বলে মনে হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

স্বাস্থ্যকর পায়খানা কেমন?

স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর মল সাধারণত নরম, গঠিত এবং সহজে বের হয়। পায়খানা করার সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয় না এবং ব্যথাও থাকার কথা নয়।

পায়খানা করার পর পেট পরিষ্কার হয়েছে বলে মনে হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সকালে পায়খানা হচ্ছে বলেই যে সবকিছু ঠিক আছে, তা নয়। যদি প্রতিবারই অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়, অতিরিক্ত চাপ দিতে হয় বা ব্যথা হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।


নিজের স্বাভাবিক অভ্যাসের হঠাৎ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ

মলত্যাগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার। আপনার স্বাভাবিক অভ্যাস হঠাৎ বদলে গেছে কি না।

যেমন, আগে প্রতিদিন একবার পায়খানা হতো, কিন্তু হঠাৎ কয়েক দিন ধরে খুব কম হচ্ছে। আবার কারও সাধারণত দিনে একবার পায়খানা হলেও হঠাৎ দিনে কয়েকবার পাতলা পায়খানা শুরু হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, ভ্রমণ, বয়স, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, মানসিক চাপ কিংবা কিছু ওষুধের কারণে সাময়িকভাবে এমন পরিবর্তন হতে পারে। তবে পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সপ্তাহে তিনবারের কম হলেই কি কোষ্ঠকাঠিন্য?

সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগ কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু এটিই একমাত্র মানদণ্ড নয়।

কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে আরও দেখা হয় মল শক্ত, শুকনো বা দলাদলা কি না, পায়খানা করতে ব্যথা বা বেশি চাপ দিতে হচ্ছে কি না এবং পায়খানা করার পরও কিছুটা মল থেকে গেছে বলে মনে হচ্ছে কি না।

অর্থাৎ, কারও দিনে একবার পায়খানা হলেও যদি প্রতিবার খুব কষ্ট হয়, মল শক্ত হয় এবং পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি থাকে, তাহলে তার কোষ্ঠকাঠিন্য থাকতে পারে।

পাতলা পায়খানাও নজরে রাখুন

শুধু পায়খানা কম হওয়াই সমস্যা নয়। হঠাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বার পাতলা বা পানির মতো পায়খানা হওয়াও নজরে রাখার মতো বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসের তথ্য অনুযায়ী, দিনে তিনবার বা তার বেশি পাতলা পায়খানা হওয়া, অথবা কারও স্বাভাবিক অভ্যাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়া, ডায়রিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

পায়খানায় রক্ত দেখলে অবহেলা করবেন না

পায়খানার সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। পাইলস বা মলদ্বারে ফাটলের মতো তুলনামূলক সাধারণ কারণেও রক্তপাত হতে পারে। আবার পরিপাকতন্ত্রের অন্য কোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলেও এমনটা দেখা যেতে পারে।

বিশেষ করে বারবার রক্ত দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কালো বা খুব গাঢ় রঙের পায়খানাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

পেটব্যথা ও পেট ফাঁপার সঙ্গে পরিবর্তন হলে সতর্ক হন

মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে যদি দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, অতিরিক্ত পেট ফাঁপা, বারবার চাপ দিয়ে পায়খানা করার প্রয়োজন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা পরিবর্তন থাকে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

বিশেষ করে এসব লক্ষণ নতুন করে শুরু হলে এবং স্বাভাবিক অভ্যাসে ফিরে না এলে শুধু খাবার পরিবর্তন করে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করাই ভালো।

আঁশযুক্ত খাবার ও পানি উপকারী

মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতে খাবারের ভূমিকা রয়েছে। শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য এবং ডালজাতীয় খাবারে খাদ্যআঁশ থাকে। পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ বা উপশমে খাদ্যআঁশ বাড়ানো, পর্যাপ্ত তরল পান করা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস।

নিজের অভ্যাসটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

পায়খানা দিনে একবার হচ্ছে কি না, সেটিকে স্বাস্থ্যকর পেটের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং মল নরম ও গঠিত কি না, সহজে বের হচ্ছে কি না, ব্যথা বা অতিরিক্ত চাপ দিতে হচ্ছে কি না এবং পায়খানা করার পর স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে কি না, এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের স্বাভাবিক অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন থাকা। সেই অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন এলে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • পায়খানায় বারবার রক্ত দেখা
  • কালো বা খুব গাঢ় রঙের পায়খানা
  • দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র পেটব্যথা
  • কয়েক সপ্তাহ ধরে মলত্যাগের অভ্যাস বদলে থাকা
  • পায়খানা করতে নিয়মিত অতিরিক্ত চাপ দিতে হওয়া
  • দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকা
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • বমি বা জ্বরের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকা

দিনে কতবার পায়খানা হচ্ছে, শুধু এই সংখ্যা দেখে অন্ত্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কারও দিনে একাধিকবার হতে পারে, আবার কারও এক দিন বা দুদিন পরপর হতে পারে। যদি মল স্বাভাবিক থাকে, সহজে বের হয় এবং কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি না থাকে, তাহলে শুধু সংখ্যার কারণে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে নিজের স্বাভাবিক মলত্যাগের অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন, রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে সেটি অবহেলা করা উচিত নয়।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া