logo
Advertisement

শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থি সম্পর্কে জানুন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থি সম্পর্কে জানুন
ছবি : সংগৃহীত

শরীরের ভেতরে থাকা ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। এটি দেখতে প্রজাপতির মতো এবং ঘাড়ের সামনের দিকে অবস্থান করে। যদিও আকারে ছোট, তবে শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা বিশাল।

থাইরয়েড মূলত একটি হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থি, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ আপনি যে খাবার খান, সেটি শরীর কীভাবে শক্তিতে রূপান্তর করবে—এই পুরো প্রক্রিয়া থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণ করে।

থাইরয়েড কীভাবে কাজ করে

থাইরয়েড শরীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি ও নিঃসরণ করে, যার মধ্যে রয়েছে T3, T4 এবং ক্যালসিটোনিন।

এই হরমোনগুলো শরীরের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন-

  • শরীরের শক্তি ব্যবহার বা মেটাবলিজম
  • হৃদস্পন্দন
  • শ্বাস-প্রশ্বাস
  • হজম প্রক্রিয়া
  • শরীরের তাপমাত্রা
  • মানসিক কার্যক্রম ও মস্তিষ্কের কাজ
  • ত্বক ও হাড়ের স্বাস্থ্য
  • প্রজনন ক্ষমতা

থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য শরীরের আয়োডিন দরকার হয়, যা সাধারণত খাবার ও আয়োডিনযুক্ত লবণ থেকে পাওয়া যায়।

শরীরে থাইরয়েডের গুরুত্ব

থাইরয়েড একা কাজ করে না। এটি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থির সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে।

এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি সংকেত শৃঙ্খলের মতো কাজ করে: মস্তিষ্ক → TSH হরমোন → থাইরয়েড → T3 ও T4 উৎপাদন

এই সমন্বয় শরীরের প্রায় সব অঙ্গের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।

থাইরয়েডের প্রধান সমস্যা

থাইরয়েডের রোগ সাধারণত চারটি প্রধান ধরনের হয়:

  • হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড কম কাজ করা)
  • হাইপারথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড বেশি কাজ করা)
  • গয়টার বা থাইরয়েড ফুলে যাওয়া
  • থাইরয়েড ক্যানসার

নারীদের মধ্যে থাইরয়েড সমস্যা পুরুষদের তুলনায় বেশি দেখা যায়।

হাইপোথাইরয়েডিজম কী

এই অবস্থায় থাইরয়েড পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না। ফলে শরীরের কাজ ধীর হয়ে যায়।

প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • হাশিমোটো রোগ, একটি অটোইমিউন সমস্যা
  • আয়োডিনের ঘাটতি
  • জন্মগত থাইরয়েড সমস্যা
  • থাইরয়েড অপারেশন
  • কিছু ওষুধের প্রভাব

লক্ষণ

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • ওজন বেড়ে যাওয়া
  • ঠান্ডা বেশি লাগা
  • মুখ ও শরীর ফুলে যাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • মন খারাপ বা বিষণ্নতা
  • নারীদের অনিয়মিত মাসিক

হাইপারথাইরয়েডিজম কী

এ অবস্থায় থাইরয়েড অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে, ফলে শরীরের কাজ অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়ে যায়।

প্রধান কারণ-

  • গ্রেভস রোগ
  • থাইরয়েড নডিউল
  • থাইরয়েডে প্রদাহ
  • আয়োডিনের অতিরিক্ত গ্রহণ

লক্ষণ

  • উদ্বেগ ও অস্থিরতা
  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • অতিরিক্ত ঘাম ও গরম লাগা
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
  • ঘুমের সমস্যা
  • দুর্বলতা
  • ঘন ঘন পায়খানা

থাইরয়েডে গয়টার বা ফোলা

থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে তাকে গয়টার বলা হয়। এর কারণ হতে পারে হরমোনের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা, আয়োডিনের অভাব বা কিছু ওষুধ। লক্ষণ হিসেবে ঘাড়ের সামনের অংশে ফোলা, গলায় টান লাগা বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েড ক্যানসার

থাইরয়েড ক্যানসার সাধারণত ধীরে বিকাশ ঘটে এবং শুরুতে তেমন লক্ষণ দেখা যায় না। পরবর্তী সময়ে ঘাড়ে গিঁট বা ফোলা, গলা বসে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা খাবার গিলতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কীভাবে থাইরয়েড সমস্যা শনাক্ত করা হয়?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো রক্তে TSH পরীক্ষা। এটি দেখে বোঝা যায় থাইরয়েড ঠিকভাবে কাজ করছে কি না। এছাড়া প্রয়োজন হলে T3 ও T4 পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, থাইরয়েড স্ক্যান বা থাইরয়েডের চিকিৎসা করার দরকার হতে পারে।

খেয়াল রাখবেন, থাইরয়েড রোগ সাধারণত নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

এর চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ওষুধ (হরমোন বাড়ানো বা কমানো), কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন চিকিৎসা ও থাইরয়েড ক্যানসারের ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা।

থাইরয়েড সমস্যার ঝুঁকি বেশি যাদের-

  • পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস আছে
  • অটোইমিউন রোগ আছে
  • বয়স ৬০ এর বেশি
  • আয়োডিনযুক্ত ওষুধ গ্রহণ করেন

থাইরয়েড সুস্থ রাখার উপায়

থাইরয়েড সুস্থ রাখতে আয়োডিন গুরুত্বপূর্ণ। যা পাওয়া যায় আয়োডিনযুক্ত লবণ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল থেকে। তবে অতিরিক্ত আয়োডিনও ক্ষতিকর হতে পারে, তাই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

থাইরয়েড শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এতে সমস্যা হলে পুরো শরীরেই এর প্রভাব পড়ে। তবে ভালো দিক হলো, অধিকাংশ থাইরয়েড রোগই আধুনিক চিকিৎসায় সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। তাই উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক