Advertisement

‘পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না’-কেন এমন হয়, কখন হতে পারে বিপদের লক্ষণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
‘পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না’-কেন এমন হয়, কখন হতে পারে বিপদের লক্ষণ
ছবি : সংগৃহীত

কাউকে দেখে নামটা মনে আছে, মানুষটিকেও চেনা, এমনকি তার সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল সেটাও মনে আছে। কিন্তু মুখে নামটা আসছে না। কখনো কোনো পরিচিত জায়গা, বই, সিনেমা বা সাধারণ একটি শব্দ বলতে গিয়ে এমন হয়। মনে হয় শব্দটি যেন জিভের ডগায় এসে আটকে আছে। কয়েক সেকেন্ড বা কিছুক্ষণ পর আবার হঠাৎ করেই শব্দটি মনে পড়ে যায়।

Advertisement

এই অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Tip-of-the-Tongue phenomenon বা টিপ-অফ-দ্য-টাং। অর্থাৎ, মস্তিষ্কে তথ্যটি থাকার পরও সাময়িকভাবে সেটি মুখে আনা সম্ভব হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতি ও ভাষা প্রক্রিয়ার একটি অংশ এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এর প্রবণতা কিছুটা বাড়তে পারে।

টিপ-অফ-দ্য-টাং আসলে কী

আমরা যখন কোনো কথা বলি, তখন মস্তিষ্ককে শুধু তথ্য মনে রাখলেই হয় না। সেই তথ্যের সঙ্গে যুক্ত সঠিক শব্দটিও খুঁজে বের করতে হয়। ধরুন, কোনো পরিচিত ব্যক্তির নাম মনে করার চেষ্টা করছেন। তাঁর চেহারা, পেশা বা কোথায় দেখা হয়েছিল সবই মনে আছে, কিন্তু নামটি কিছুতেই মনে পড়ছে না।

এ সময় মস্তিষ্কে ওই তথ্য খোঁজার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কিন্তু শব্দটির সম্পূর্ণ রূপ সাময়িকভাবে পাওয়া যায় না। অনেক সময় শব্দটির প্রথম অক্ষর, কতগুলো শব্দাংশ আছে বা কাছাকাছি কোনো শব্দ মনে পড়তে পারে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই কাঙ্ক্ষিত শব্দটি মনে চলে আসে।

গবেষণায় টিপ-অফ-দ্য-টাং অবস্থাকে এমন একটি সাময়িক স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মানুষ জানে যে তথ্যটি তার জানা, কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটি বের করে আনতে পারছে না।

কেন এমন হয়

এর একটি নির্দিষ্ট কারণ সব সময় থাকে না। মস্তিষ্কের স্মৃতি থেকে কোনো শব্দ খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ায় সাময়িক বাধা তৈরি হলেই এমন হতে পারে।

মানসিক চাপ: অতিরিক্ত চিন্তা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ মনোযোগ ও তথ্য মনে করার ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে পরিচিত কোনো নাম বা শব্দ মনে করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, শেখা এবং স্মৃতি থেকে তথ্য পুনরুদ্ধারের ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই কয়েক দিন ধরে ঘুম ঠিকমতো না হলে এ ধরনের অভিজ্ঞতা কিছুটা বেশি হতে পারে।

বয়স বাড়া: বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের তথ্য খুঁজে বের করার গতি কিছুটা ধীর হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে পরিচিত মানুষের নাম বা কম ব্যবহৃত শব্দ মনে করতে বয়স্কদের বেশি সময় লাগতে পারে। গবেষণাতেও বয়সের সঙ্গে টিপ-অফ-দ্য-টাং ঘটনার প্রবণতা বাড়ার কথা পাওয়া গেছে।

কোনো শব্দ কম ব্যবহার করা: কোনো শব্দ বা নাম দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সেটি মনে থেকে গেলেও প্রয়োজনের সময় দ্রুত মুখে আনা কঠিন হতে পারে। গবেষণায় শব্দ কত ঘন ঘন এবং কত সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঙ্গে টিপ-অফ-দ্য-টাং ঘটনার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।


মাঝে মধ্যে হলে কি স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে?

সাধারণত না। মাঝে মধ্যে কোনো পরিচিত শব্দ বা নাম মনে না পড়া একাই স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার প্রমাণ নয়। বরং এটি স্বাভাবিক স্মৃতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

একটি শব্দ মনে পড়তে দেরি হচ্ছে মানেই যে সেই তথ্য মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে, তা নয়। অনেক সময় তথ্যটি মস্তিষ্কে থাকে, কিন্তু সেই মুহূর্তে তার সঙ্গে যুক্ত শব্দটি খুঁজে পেতে সময় লাগে।

এ কারণেই কিছুক্ষণ পর কোনো চেষ্টা ছাড়াই হঠাৎ শব্দটি মনে পড়ে যেতে পারে।

তবে কখন সতর্ক হতে হবে

সমস্যা যদি খুব ঘন ঘন হতে থাকে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা যদি দৈনন্দিন কথাবার্তায় বাধা তৈরি করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

এর সঙ্গে যদি স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার অন্য পরিবর্তনও দেখা দেয়, তাহলেও অবহেলা করা ঠিক নয়। যেমন-

  • বারবার পরিচিত মানুষ বা জায়গার নাম ভুলে যাওয়া
  • সাধারণ কথাবার্তা চালিয়ে যেতে সমস্যা হওয়া
  • নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে ক্রমাগত অসুবিধা হওয়া
  • পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা
  • একই কথা বারবার বলা বা একই প্রশ্ন করা
  • দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হওয়া
  • আচরণ বা চিন্তাভাবনায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া

এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। কারণ শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যার পেছনে শুধু স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া নয়, অন্য কিছু শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে।


কোন কোন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে

বারবার শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, উদ্বেগ বা অবসাদ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসসহ কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু একটি উপসর্গ দেখে কোনো রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক অন্যান্য উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করবেন।

হঠাৎ কথা আটকে গেলে সতর্ক হোন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং এর সঙ্গে অন্য কিছু উপসর্গ থাকে, তাহলে অপেক্ষা করা উচিত নয়।

যেমন হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া, মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের একপাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, হঠাৎ বিভ্রান্তি কিংবা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা হলে এগুলো স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শব্দটি মনে না পড়লে কী করবেন

কোনো শব্দ মনে না পড়লে বারবার জোর করে সেটি মনে করার চেষ্টা না করাই ভালো। কিছুক্ষণ থামুন। অন্যভাবে কথাটি বোঝানোর চেষ্টা করুন। অনেক সময় বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চাপ না দিলে শব্দটি নিজে থেকেই মনে পড়ে যায়।

যেমন কারও নাম মনে না পড়লে তাঁর নামের বদলে পরিচয় বা প্রসঙ্গ দিয়ে কথা চালিয়ে যাওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করলে নামটি মনে পড়ে যেতে পারে।

মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কিছু শেখার অভ্যাসও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

কোনো পরিচিত শব্দ বা নাম হঠাৎ মনে না পড়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবেই অনেকের এমন হয়। কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট পর শব্দটি আবার মনে পড়ে গেলে সাধারণত তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ থাকে না।

তবে এই সমস্যা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে বা স্মৃতি, কথা বলা, চিন্তা করা কিংবা চলাফেরায় অন্য পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দেয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আর হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা খুঁজে না পাওয়ার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ ভুলে যাওয়া ভেবে বসে থাকা উচিত নয়। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: এই সময় অনলাইন