প্রতিদিন চায়ের সঙ্গে এই ৫ খাবার খান, জানুন শরীরে কী হতে পারে
-445081-720x405.webp)
চা ছাড়া অনেকের সকালই শুরু হয় না। আবার বিকেলের নাশতা হোক কিংবা কাজের ফাঁকে একটু বিরতি, এক কাপ চা থাকেই। বাংলাদেশেও চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা বিভিন্ন নাশতা খাওয়ার অভ্যাস বেশ পরিচিত।
তবে চায়ের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেদিকেও একটু নজর দেওয়া দরকার। কারণ চায়ের কিছু উপাদান খাবার থেকে শরীরে পুষ্টি শোষণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে চায়ে থাকা ট্যানিন ও অন্যান্য পলিফেনল খাবার থেকে আয়রন শোষণ কমাতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান করলে নন-হিম আয়রন বা উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শোষণ কমে যায়।
তবে এর মানে এই নয় যে চায়ের সঙ্গে নিচের খাবারগুলো খেলেই শরীরের ক্ষতি হবে। বরং নিয়মিত চা পান করেন এবং বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে খাবারের সময় ও চা খাওয়ার সময়ের ব্যবধান রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার
চায়ের সঙ্গে যে খাবারটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার, সেটি হলো আয়রনসমৃদ্ধ খাবার।
পালং শাক, বিভিন্ন শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবারে নন-হিম আয়রন থাকে। চায়ে থাকা ট্যানিন ও পলিফেনল এই ধরনের আয়রনের শোষণ কমাতে পারে।
বিশেষ করে যাদের শরীরে আগে থেকেই আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান করলে আয়রন শোষণ কমে যায়। তবে খাবারের এক ঘণ্টা পরে চা পান করলে এই বাধার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।
তাই দুপুর বা রাতের খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চা না খেয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা ভালো।
ডাল ও ডালজাতীয় খাবার
বাংলাদেশের খাবারে ডাল খুবই পরিচিত। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা বা অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও আয়রনের ভালো উৎস।
কিন্তু এসব খাবারের আয়রন মূলত নন-হিম আয়রন। তাই খাবারের সঙ্গে চা পান করলে শরীর আয়রনের একটি অংশ কম শোষণ করতে পারে।
এর অর্থ ডালের সঙ্গে চা একেবারেই খাওয়া যাবে না, এমন নয়। বরং নিয়মিত এমন খাবার খেলে চা খাওয়ার সময়টি একটু পিছিয়ে দেওয়া ভালো।
খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, পেয়ারা বা অন্যান্য ফল রাখলে উদ্ভিজ্জ আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় ভিটামিন সিকে আয়রন শোষণ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শাকসবজি
পালং শাকসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজি স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ। এগুলোতে আয়রনসহ নানা পুষ্টি উপাদান থাকে।
তবে শাকসবজির সঙ্গে একই সময়ে চা পান করলে এতে থাকা নন-হিম আয়রনের শোষণ কমতে পারে।
তাই দুপুরের খাবারে শাক বা সবজি থাকলে খাবার শেষ করেই চা পান করার অভ্যাস না করাই ভালো। বিশেষ করে যাদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য এই অভ্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ।
ঝাল ও খুব মশলাদার খাবার
চায়ের সঙ্গে ঝাল বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার খাওয়া আমাদের দেশে বেশ পরিচিত। পেঁয়াজু, সিঙ্গারা, সমুচা, চপ বা অন্যান্য ভাজাপোড়ার সঙ্গে চা অনেকেরই পছন্দ।
বিভিন্ন গবেষণা খুব ঝাল বা তীব্র স্বাদের খাবারকে চায়ের সঙ্গে না খাওয়ার পরামর্শ দেয়। মূল কারণ হিসেবে স্বাদের ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। তীব্র ঝাল বা মশলার স্বাদ চায়ের স্বাভাবিক স্বাদ ও ঘ্রাণকে ঢেকে দিতে পারে।
তবে এটি আয়রন শোষণের মতো শক্তিশালী চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কতা নয়। কারও ক্ষেত্রে ঝাল খাবার ও চা একসঙ্গে খেলে বুকজ্বালা বা পেটের অস্বস্তি বাড়তে পারে, আবার অন্য কারও কোনো সমস্যা নাও হতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, মিষ্টি বা চকোলেট খাওয়ার অভ্যাস অনেকের রয়েছে। মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না।
সমস্যা হতে পারে যখন প্রতিদিন চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। এতে মোট চিনি ও ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে যাদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা রয়েছে, তাদের চায়ের সঙ্গে মিষ্টি খাবার নিয়মিত খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
চায়ের সঙ্গে দুধ মেশালে কি সমস্যা হয়?
দুধ চায়ের খুব পরিচিত একটি উপাদান। তাই দুধ চা পান করলেই ক্ষতি হবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
এছাড়া,দুধ বা ক্রিম চায়ের কিছু পলিফেনলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে এবং এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফল একেবারে একরকম নয় এবং দুধ চা খাওয়াকে সাধারণভাবে ক্ষতিকর বলা যায় না।
তাই দুধ চা পান করেন বলে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। বরং চায়ে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া এবং প্রতিদিন কত কাপ চা পান করছেন, সেদিকেও নজর রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চা খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন?
যাদের আয়রনের ঘাটতি নেই, তাদের জন্য খাবারের সঙ্গে চা পান করলেই যে বড় ধরনের সমস্যা হবে, এমন প্রমাণ নেই। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ট্যানিন গ্রহণের সঙ্গে শরীরের মোট আয়রন অবস্থার সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে একই রকম পাওয়া যায়নি।
তবে আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকলে খাবারের সঙ্গে চা না খাওয়াই ভালো। খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পরে চা পান করলে আয়রন শোষণের ওপর চায়ের বাধাদানকারী প্রভাব কমতে পারে।
বিশেষ করে যাদের রক্তস্বল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার ও চা পানের সময় ঠিক করা যেতে পারে।
চায়ের সঙ্গে কী খেতে পারেন?
চায়ের সঙ্গে হালকা নাশতা খেতে চাইলে অতিরিক্ত চিনি ও তেলে ভাজা খাবারের বদলে তুলনামূলক পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে পারেন। যেমন-
- অল্প চিনি দেওয়া বা চিনি ছাড়া চা
- কম মিষ্টির বিস্কুট
- বাদাম
- পরিমিত পরিমাণে হালকা নাশতা
- ডিম বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
- ফল, তবে চায়ের সঙ্গে নয়, আলাদা সময়ে খাওয়াই ভালো
তবে খাবারের সঙ্গে চা খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একক নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়টি বদলাতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি থাকলে কী করবেন?
যদি শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকে, শুধু চা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আয়রনের ঘাটতির কারণও খুঁজে দেখা দরকার।
খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ উপাদান রাখা, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে চা বা কফি না পান করা সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি আয়রন শোষণ বাড়াতে সাহায্য করে, আর চা ও কফি খাবারের সঙ্গে খেলে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে।
তবে আয়রনের ঘাটতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চায়ের সঙ্গে কিছু খাবার খেলে সবারই ক্ষতি হবে, এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই। তবে চায়ে থাকা ট্যানিন ও পলিফেনল বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তাই ডাল, শাকসবজি বা অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান না করাই ভালো, বিশেষ করে যাদের আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে।
চা খেতে চাইলে খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পরে পান করা যেতে পারে। আর চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি বা প্রতিদিন বেশি তেলে ভাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটিও কমানো ভালো।
অর্থাৎ, চা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কখন চা খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং তার সঙ্গে কী খাচ্ছেন, এই তিনটি বিষয়েই নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
