ফ্যাটি লিভার কমাতে ঘরোয়া কিছু কার্যকর উপায়

বর্তমানে ফ্যাটি লিভার একটি খুব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অনেক মানুষই বুঝতে পারেন না যে তাদের লিভারে ধীরে ধীরে চর্বি জমছে। শুরুতে বড় কোনো লক্ষণ না থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি লিভারের প্রদাহ, সিরোসিস এমনকি লিভার ফেইলিওরের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD। এটি সাধারণত স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভালো খবর হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১. ধীরে ধীরে ওজন কমান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভার কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি হলো ওজন নিয়ন্ত্রণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমালেও লিভারের চর্বি কমতে শুরু করতে পারে। আর ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমাতে পারলে লিভারের প্রদাহ ও ক্ষতির ঝুঁকিও কমতে পারে।
তবে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত ডায়েট বা দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা ঠিক নয়। এতে উল্টো লিভারের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
২. মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট অনুসরণ করুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিটেরেনিয়ান খাদ্যাভ্যাস ফ্যাটি লিভারের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে।
এই খাদ্যাভ্যাসে সাধারণত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছ ও শস্যজাত খাবার।
যেসব খাবার বেশি খেতে পারেন - আপেল, কমলা, কলা, তরমুজ, শসা, গাজর, ব্রকলি, পালং শাক, মসুর ডাল, ছোলা, বাদাম ও অ্যাভোকাডো।
যেসব খাবার কমাতে হবে
- অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার
- প্রক্রিয়াজাত খাবার
- কোমল পানীয়
- অতিরিক্ত মিষ্টি
- ভাজাপোড়া খাবার
৩. নিয়মিত কফি পান উপকারী হতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণ কফি লিভারের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কাপ ব্ল্যাক কফি লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে অতিরিক্ত কফি পান করলে অস্থিরতা বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কফির পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
৪. প্রতিদিন শরীরচর্চা করুন
ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে অলস জীবনযাপনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা ভালো। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা উপকারী হতে পারে।
সহজ কিছু অভ্যাস
- লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার
- নিয়মিত হাঁটা
- হালকা দৌড়
- সাইকেল চালানো
- ঘরের কাজ করা
৫. অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত চিনি লিভারে চর্বি জমার অন্যতম কারণ।
বিশেষ করে যেসব খাবারে বেশি চিনি থাকে, যেমন - কোমল পানীয়, কেক, বিস্কুট, আইসক্রিম, ক্যান্ডি, চকোলেট, প্যাকেটজাত জুস ও ফ্লেভারযুক্ত দই।
এসব খাবার যত কম খাওয়া যায় তত ভালো।
৬. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ফ্যাটি লিভার থাকলে শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট কমানো জরুরি।
এজন্য লাল মাংস, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দুধজাত খাবার, ফাস্টফুড ও ডিপ ফ্রাই খাবার কম খেতে হবে।
৭. ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার খান
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড লিভারের চর্বি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সামুদ্রিক মাছ, তিসি বীজ, আখরোট ও চিয়া সিডের মতো খাবারে ওমেগা-৩ আছে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্টও নেওয়া যেতে পারে।
৮. অ্যালকোহল ও লিভারের জন্য ক্ষতিকর জিনিস এড়িয়ে চলুন
যাদের ফ্যাটি লিভার আছে, তাদের জন্য অ্যালকোহল অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।
এছাড়া কিছু ওষুধ, ভেষজ উপাদান বা সাপ্লিমেন্টও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
৯. ভিটামিন ই সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ই লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ই সবার জন্য নিরাপদ নয়। তাই এটি নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
১০. কিছু ভেষজ উপাদান উপকারী হতে পারে
কিছু প্রাকৃতিক উপাদান লিভারের জন্য উপকারী হতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
যেমন - হলুদ, আদা, রসুন ও গ্রিন টি
তবে এসবকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চিত ওষুধ নেই। তাই জীবনযাত্রা পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতন হলে লিভারের ক্ষতি থামানো এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উল্টো পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: হেল্থলাইন




