চা পানের কিছু ভুল অভ্যাসে বাড়তে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি
-9a40e8-720x405.webp)
সকাল শুরু হোক এক কাপ চা দিয়ে, কিংবা বিকেলের আড্ডায় চা না থাকলে যেন জমেই না। অনেকের কাছে চা শুধু পানীয় নয়, প্রতিদিনের অভ্যাসের অংশ। কালো চা, দুধ চা, গ্রিন টি বা লিকার চা, পছন্দের ধরন আলাদা হলেও চা খাওয়ার কিছু অভ্যাস স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চা নিজে থেকেই ক্ষতিকর কোনো পানীয় নয়। বরং চায়ে থাকা বিভিন্ন পলিফেনল নিয়ে স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, ভুল সময়ে চা পান, চায়ে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া বা কিছু ওষুধের সঙ্গে বিশেষ ধরনের চা বা চায়ের নির্যাস গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
দিনে বারবার চা খাওয়া
এক কাপ চা দিয়ে শুরু করে অনেকে দিনে কয়েকবার চা পান করেন। এতে শরীরে মোট ক্যাফেইনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইনের কারণে অস্থিরতা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে মোট ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা আলাদা। চা ছাড়াও কফি, কোমল পানীয়, চকোলেট বা কিছু ওষুধ থেকে ক্যাফেইন আসতে পারে।
তাই দিনে কত কাপ চা খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি অন্য ক্যাফেইনযুক্ত খাবার ও পানীয়ও হিসাব করা জরুরি।
ঘুমানোর ঠিক আগে চা পান
রাতে ঘুমানোর আগে চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। চায়ে থাকা ক্যাফেইন শরীরকে সজাগ রাখে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হওয়া বা ঘুমের মান খারাপ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে আলাদা হলেও ঘুমের সমস্যা থাকলে সন্ধ্যার পর চা বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কমিয়ে দেখা যেতে পারে। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও ভালো ঘুমের জন্য রাতে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।
চায়ে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া
চায়ের সঙ্গে এক বা দুই চামচ চিনি অনেকের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দিনে কয়েকবার চা খেলে এই অতিরিক্ত চিনি ধীরে ধীরে মোট ক্যালরির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে দুধ চায়ের সঙ্গে বেশি চিনি এবং বিস্কুট, কেক বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে মোট চিনি ও ক্যালরি আরও বেড়ে যায়। তাই চায়ে ধীরে ধীরে চিনির পরিমাণ কমিয়ে আনা ভালো।
চিনি ছাড়া বা কম চিনি দিয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস করা গেলে নিয়মিত চা পানের ক্ষেত্রে এটি একটি সহজ পরিবর্তন হতে পারে।
খাবারের সঙ্গে চা খাওয়ার অভ্যাস
খাবারের সঙ্গে চা খাওয়ার অভ্যাসও অনেকের রয়েছে। তবে চায়ের কিছু উপাদান খাবার থেকে আয়রন শোষণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া নন-হিম আয়রনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতার সমস্যা রয়েছে, তারা খাবারের সঙ্গে নিয়মিত চা পান করার বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার ও চায়ের সময়ের মধ্যে ব্যবধান রাখার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
খালি পেটে চা পান
খালি পেটে চা খেলেই সবার ক্ষতি হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যাফেইন ও চায়ের অন্যান্য উপাদান পেটে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা অ্যাসিডিটির অনুভূতি বাড়াতে পারে।
যাদের খালি পেটে চা খেলেই অস্বস্তি হয়, তারা নাশতা বা হালকা খাবারের পর চা পান করে দেখতে পারেন। একই সঙ্গে খুব গাঢ় চা খাওয়ার অভ্যাসও কমানো যেতে পারে।
চা খেয়ে পানি খাওয়া ভুল নয়
অনেকে মনে করেন চা পান করলে শরীর পানিশূন্য হয়ে যায়, তাই চা খাওয়ার পর পানি খাওয়া জরুরি। বাস্তবে স্বাভাবিক পরিমাণে চা পান করা শরীরকে মারাত্মকভাবে পানিশূন্য করে দেয়, এমন ধারণা ঠিক নয়।
তবে চা পান করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সাধারণ পানি খাওয়ার অভ্যাস থাকা ভালো। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বা বেশি ঘামের সময় শুধু চায়ের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
গ্রিন টি মানেই যত বেশি, তত ভালো নয়
গ্রিন টি নিয়ে ওজন কমানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতার দাবি প্রচলিত। কিন্তু গ্রিন টি কোনো জাদুকরী পানীয় নয়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (NCCIH)-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন টি ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণার ফলও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।
তাই ওজন কমানোর আশায় দিনে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করার প্রয়োজন নেই। সুষম খাবার, শারীরিক পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্পও গ্রিন টি নয়।
চায়ের নির্যাস বা সাপ্লিমেন্টকে সাধারণ চায়ের সঙ্গে এক করে দেখা
সাধারণভাবে পানীয় হিসেবে গ্রিন টি এবং উচ্চমাত্রার গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট বা সাপ্লিমেন্ট এক জিনিস নয়। গ্রিন টি পানীয় হিসেবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত নিরাপদ বলে NCCIH জানিয়েছে। কিন্তু গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্টের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া এবং বিরল ক্ষেত্রে লিভারের সমস্যার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানা গেছে।
তাই শুধু চা পানের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট বা ক্যাপসুল শুরু করা ঠিক নয়।
ওষুধ খাওয়ার সময় চা পান
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে গ্রিন টি বা গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্টের পারস্পরিক প্রভাব থাকতে পারে। NCCIH-এর তথ্য অনুযায়ী, বেশি মাত্রায় গ্রিন টি বিটা-ব্লকার ওষুধ nadolol-এর রক্তে মাত্রা কমাতে পারে। গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ অ্যাটরভাস্ট্যাটিনের (atorvastatin) সঙ্গেও পারস্পরিক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে এবং একই সঙ্গে গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার কথা ভাবলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তাহলে চা কীভাবে খাবেন?
চা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, যদি চিকিৎসক আলাদা কোনো কারণে তা নিষেধ না করে থাকেন। বরং কয়েকটি সহজ অভ্যাস মেনে চলতে পারেন।
চায়ে অতিরিক্ত চিনি না দেওয়া বা ধীরে ধীরে কমানো
দিনে মোট কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন, সেদিকে খেয়াল রাখা
ঘুমের সমস্যা থাকলে সন্ধ্যা ও রাতে ক্যাফেইনযুক্ত চা কমানো
খালি পেটে চা খেলে অস্বস্তি হলে খাবারের পর পান করা
আয়রনের ঘাটতি থাকলে খাবারের সঙ্গে চা খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
গ্রিন টি সাপ্লিমেন্টকে সাধারণ গ্রিন টির বিকল্প মনে না করা
নিয়মিত ওষুধ খেলে চা বা হারবাল সাপ্লিমেন্টের সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
চা পরিমিতভাবে পান করা বেশির ভাগ মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করে না। আসল বিষয় হলো কতটা চা পান করছেন, কখন পান করছেন এবং তার সঙ্গে কী যোগ করছেন। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, বেশি চিনি, রাতের বেলায় চা পান বা প্রয়োজন ছাড়া গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার মতো অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
সূত্র: এই সময় অনলাইন
-3b3c4b.jpg)