অতিরিক্ত পানি পান করা কখন ঝুঁকিপূর্ণ

সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত পানি খাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে আসছি, দিনে অন্তত আট গ্লাস বা দুই লিটার পানি খাওয়া উচিত। কিন্তু বিজ্ঞান কি সত্যিই এই তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, পানির মতো একটি দরকারি উপাদান কি কখনো ক্ষতির কারণ হতে পারে?
দুটি আর্ন্তজাতিক অনলাইন গণমাধ্যমের গবেষণাধর্মী তথ্য বিশ্লেষণ করে পানির সঠিক পরিমাণ ও অতিরিক্ত পানি পানের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দিনে আসলে কতটা পানি খাওয়া প্রয়োজন?
সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণের পানি নির্ধারিত নয়। দিনে আট গ্লাস পানি খাওয়ার ধারণাটি মূলত একটি সাধারণ নির্দেশনামাত্র, যা একেক মানুষের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমরা যে খাবার খাই, যেমন ফলমূল, শাকসবজি, চা বা কফি, সেখান থেকেও আমাদের শরীর অনেকটা পানি পেয়ে থাকে। তাই শুধু তরল পানি মেপেই খেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
আপনার প্রতিদিন কতটা পানি দরকার তা নির্ভর করে কয়েকটি প্রধান বিষয়ের ওপর-
আবহাওয়া ও পরিবেশ: গরম বা আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘাম বেশি বের হয়, ফলে পানির চাহিদাও বাড়ে।
শারীরিক পরিশ্রম: যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা কায়িক পরিশ্রম করেন, তাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি পানি প্রয়োজন।
শারীরিক অবস্থা: গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা বা কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির পানির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
সহজ কথায়, পানির কোনো নির্দিষ্ট মুখস্থ হিসাব নেই। শরীর যখন পানির প্রয়োজনবোধ করবে, তখন তৃষ্ণা মেটাতে পানি খাওয়াই সবচেয়ে স্বাভাবিক নিয়ম।
অতিরিক্ত পানি কি সত্যি মৃত্যুর কারণ হতে পারে?
উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। শুনতে অবাক লাগলেও এটি সত্যি যে খুব অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি খেলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ওয়াটার ইন্টক্সিকেশন (Water Intoxication), ওয়াটার পয়জনিং বা হাইপোনাট্রেমিয়া (Hyponatremia) বলা হয়।
হেলথলাইনের তথ্য অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কিডনি দিনে প্রায় ২০ থেকে ২৮ লিটার পানি শরীর থেকে বের করে দিতে পারে। কিন্তু কিডনির একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিডনি প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১ লিটারের মতো পানি নিষ্কাশন করতে পারে।
আপনি যদি ১ ঘণ্টায় ১ লিটারের বেশি পানি খেয়ে ফেলেন এবং তা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে, তবে কিডনি সেই অতিরিক্ত পানি বের করতে হিমশিম খায়। ফলে রক্তে থাকা সোডিয়ামের মাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে।
ওয়াটার ইন্টক্সিকেশন হলে শরীরে কী ঘটে?
রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব হঠাৎ কমে গেলে রক্তের প্লাজমা পাতলা হয়ে যায়। তখন অতিরিক্ত পানি রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর ভেতর ঢুকে পড়ে এবং কোষগুলোকে ফুলিয়ে তোলে।
মস্তিষ্কের কোষ বা ব্রেইন সেল যখন এভাবে ফুলতে শুরু করে, তখন মাথার খুলির ভেতরে চাপ তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

অতিরিক্ত পানি পানের কিছু সাধারণ লক্ষণ-
- তীব্র মাথাব্যথা এবং মাথা ঘোরা।
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
- পেশিতে টান ধরা, দুর্বলতা বা খিঁচুনি।
- অত্যধিক ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব।
- গুরুতর ক্ষেত্রে রোগী জ্ঞান হারাতে পারেন, এমনকি কোমা বা মৃত্যুও হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
সাধারণত অলসভাবে বসে থাকা অবস্থায় ভুল করে এত বেশি পানি খাওয়া কঠিন। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকি বাড়ে-
অ্যাথলিট ও দৌড়বিদ: ম্যারাথন বা দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর ব্যায়াম করার পর দ্রুত শরীরের ক্লান্তি মেটাতে অনেকে অল্প সময়ে প্রচুর পানি খেয়ে ফেলেন।
অতিরিক্ত গরম ও পরিশ্রম: প্রচণ্ড গরমে কাজ করার সময় শরীর থেকে সোডিয়াম ঘাম হয়ে বেরিয়ে যায়, তখন শুধু অতিরিক্ত পানি খেলে রক্ত আরও পাতলা হয়ে যায়।
শিশুর যত্ন ও মানসিক স্বাস্থ্য: ছোট শিশুদের কিডনি অতটা পরিপক্ব নয়, তাই অল্প অতিরিক্ত পানিও তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এছাড়া কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে মানুষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি খেতে পারেন।
কীভাবে বুঝবেন আপনি সঠিক পরিমাণে পানি খাচ্ছেন?
পানি কম বা বেশি খাওয়া হচ্ছে কি না তা বোঝার জন্য কোনো জটিল পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। দুটো সহজ উপায়ে এটি বুঝতে পারবেন-
তৃষ্ণা অনুধাবন করুন: যখনই তৃষ্ণা পাবে, পানি পান করুন। তৃষ্ণা মিটে গেলে জোর করে অতিরিক্ত পানি খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রস্রাবের রঙ পরীক্ষা করুন: আপনার প্রস্রাবের রঙ যদি হালকা হলুদ হয়, তবে বুঝবেন শরীরে পানির মাত্রা একদম ঠিক আছে। কিন্তু প্রস্রাব যদি একেবারে পানির মতো স্বচ্ছ ও কাঁচের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়, তবে বুঝে নিতে হবে আপনি শরীরের চাহিদার চেয়ে বেশি পানি খাচ্ছেন।
পানি খাওয়া শরীর সুস্থ রাখার জন্য জরুরি, তবে যেকোনো কিছুর অতিমাত্রাই ক্ষতিকর। দিনে জোর করে গ্যালন গ্যালন পানি না খেয়ে নিজের শরীরের ভাষা বুঝুন। তৃষ্ণা পেলে পানি পান করুন এবং প্রচণ্ড গরম বা পরিশ্রমের পর পানির পাশাপাশি স্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট যুক্ত পানীয় গ্রহণ করুন, যাতে শরীরের সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় থাকে।



