Advertisement

টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী, কারা বেশি ঝুঁকিতে

এশিয়া পোস্ট নিউজ
টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী, কারা বেশি ঝুঁকিতে
ছবি : সংগৃহীত

ডায়াবেটিস বলতে এত দিন বেশির ভাগ মানুষ টাইপ-১টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কথাই জানতেন। তবে সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন করে আলোচনায় এসেছে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস। এটি একেবারে নতুন কোনো রোগ নয়, বরং বহু বছর ধরে পরিচিত থাকলেও পর্যাপ্ত গবেষণা ও সুনির্দিষ্ট স্বীকৃতির অভাবে আড়ালেই ছিল।

এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এই বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিসকে আলাদা করে চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা অন্য ধরনের ডায়াবেটিস থেকে আলাদা।


টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী?

টাইপ-৫ ডায়াবেটিস হলো এমন এক ধরনের ডায়াবেটিস, যা মূলত দীর্ঘদিনের অপুষ্টির কারণে তৈরি হয়। বিশেষ করে শৈশব, কৈশোর বা তরুণ বয়সে দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পেলে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। ফলে শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না এবং পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে।

আগে এই রোগকে Malnutrition-Related Diabetes Mellitus বা MRDM নামে ডাকা হতো। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF) এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কেন এত দিন এটি আলাদা রোগ হিসেবে ধরা হয়নি?

এই রোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৫০-এর দশকেই চিকিৎসকেরা অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এক ধরনের ডায়াবেটিসের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিছু সময়ের জন্য এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে ১৯৯৯ সালে সেই শ্রেণিবিন্যাস বাদ দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগীদের অনেককেই ভুল করে টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছিল না। এ কারণেই নতুন করে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিস সাধারণত দেখা যায় এমন ব্যক্তিদের মধ্যে যারা:

  • শৈশব বা কৈশোরে দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগেছেন
  • শরীর খুব রোগা বা কম ওজনের
  • নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা
  • এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার অঞ্চলে বসবাস করেন

বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই রোগটি শনাক্ত হয় না।

টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে পার্থক্য কী?

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয়, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।

কিন্তু টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের মূল সমস্যা হলো, অপুষ্টির কারণে অগ্ন্যাশয় ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে শরীর প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইনসুলিনই তৈরি করতে পারে না। এটি টাইপ-১-এর মতো অটোইমিউন রোগ নয়, আবার টাইপ-২-এর মতো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সও এর প্রধান কারণ নয়।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেকটাই অন্যান্য ডায়াবেটিসের মতো হতে পারে। যেমন:

  • অতিরিক্ত পিপাসা লাগা
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • দুর্বল লাগা
  • সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া
  • ঝাপসা দেখা

তবে রোগীরা সাধারণত খুব রোগা হন এবং তাদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ইতিহাস থাকে না।

কীভাবে শনাক্ত করা হয়?

এখনও টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য আলাদা কোনো একক পরীক্ষা নেই।

চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর শারীরিক গঠন, অপুষ্টির ইতিহাস, রক্তে শর্করার মাত্রা, শরীরে ইনসুলিন উৎপাদনের সক্ষমতা এবং অন্যান্য ধরনের ডায়াবেটিসের বৈশিষ্ট্য আছে কি না, সেগুলো বিবেচনা করে রোগটি শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।

চিকিৎসা কী?

টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো এক নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে বেশি মাত্রার ইনসুলিন বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ তাদের শরীর তুলনামূলক কম ইনসুলিনেই সাড়া দিতে পারে এবং এতে রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া হয়:

  • পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা
  • অপুষ্টি দূর করা
  • প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প মাত্রায় ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার
  • নিয়মিত রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ
  • চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ

তবে এই রোগের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির কাজ এখনও চলছে এবং এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কেন এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ?

টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে আলাদা রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে চিকিৎসকেরা রোগটি আরও সহজে শনাক্ত করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমবে এবং রোগীদের জন্য উপযোগী চিকিৎসা ও পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশা, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে রোগটি নিয়ে আরও গবেষণা হবে, নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি হবে এবং বিশ্বের যেসব অঞ্চলে অপুষ্টি এখনও বড় সমস্যা, সেখানে আক্রান্ত মানুষ আরও ভালো চিকিৎসা পাবেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা, ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন