logo

অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় সাফল্য

অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় সাফল্য
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যান্সারগুলোর একটি। রোগটি সাধারণত দেরিতে শনাক্ত হয় এবং কার্যকর চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার পর রোগটি ধরা পড়ে। বিধায় এই ক্যানসারে বেঁচে থাকা এবং সুস্থ হওয়ার হারও অনেক কম।

তবে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নতুন আশার খবর দিয়েছেন গবেষকেরা। এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, নতুন একটি ওষুধ রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা এ ফলাফলকে ‘গেমচেঞ্জার’ এবং ক্যান্সার চিকিৎসায় গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ অবস্থায় ‘ড্যারাক্সনরাসিব’ নামের নতুন ওষুধকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় এ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রায় ৫০০ রোগীর ওপর পরিচালিত এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সবারই অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ড্যারাক্সনরাসিব গ্রহণকারী রোগীরা গড়ে ১৩ দশমিক ২ মাস বেঁচে ছিলেন। অন্যদিকে প্রচলিত কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের গড় আয়ু ছিল ৬ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৭ মাস।

গবেষকদের মতে, নতুন ওষুধটি শুধু রোগীদের আয়ু বাড়ায়নি, কেমোথেরাপির তুলনায় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলক কম ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা ক্যান্সার সেন্টারের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. রচনা শ্রফ বলেন, ‘এই ফলাফল যুগান্তকারী। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আমরা এমন বেঁচে থাকার হার আগে দেখিনি।’

তিনি জানান, গবেষণার ফলাফল প্রথমবার দেখার পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের রোগীদের চিকিৎসা করার অভিজ্ঞতায় এটি তাঁর দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলোর একটি।

অ্যাসকোর প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জুলি গ্রালোও গবেষণাটিকে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকে একে হোম রান বলছেন, আমি বরং একে গ্র্যান্ড স্ল্যাম বলব।’

কীভাবে কাজ করে নতুন ওষুধ

ড্যারাক্সনরাসিব কাজ করে ক্রাস (Kras) নামের একটি প্রোটিনকে লক্ষ্য করে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছেন, এই প্রোটিন অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমায় আক্রান্ত ৯০ শতাংশের বেশি রোগীর ক্রাস জিনে মিউটেশন থাকে। এর ফলে ক্যান্সার কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

নতুন ওষুধটি ক্রাস প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে ক্যান্সারের বৃদ্ধি থামানোর চেষ্টা করে। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন ধরনের ক্রাস মিউটেশনের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

ডা. রচনা শ্রফ বলেন, ‘অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ক্রাস-কে লক্ষ্য করে চিকিৎসা উদ্ভাবন দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। এই গবেষণা দেখিয়েছে, সেটি শুধু সম্ভবই নয়, কার্যকরও হতে পারে।’

রোগীদের জন্য নতুন আশা

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার অ্যাকশনের প্রধান নির্বাহী পলা হ্যানফোর্ড বলেন, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ এত দিন খুবই সীমিত ছিল। নতুন গবেষণার ফলাফল রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য বাস্তব আশার বার্তা নিয়ে এসেছে।

প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার ইউকের গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের পরিচালক আনা জুয়েলও ফলাফলকে ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, রোগীরা তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে আরও কয়েক মাস মূল্যবান সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ধরনের নতুন ওষুধ দ্রুত রোগীদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা।

গবেষকদের মতে, ক্রাস জিন শুধু অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার নয়, ফুসফুস ও কোলন ক্যান্সারসহ আরও বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গেও জড়িত। তাই ভবিষ্যতে একই ধরনের ওষুধ অন্য ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান