logo

চোখ থেকে মোবাইল কতটা দূরে রাখবেন, মানুন এই নিয়ম

চোখ থেকে মোবাইল কতটা দূরে রাখবেন, মানুন এই নিয়ম
ছবি: স্ক্রিন টাইম

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অ্যালার্ম বন্ধ করা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, দিনের বড় একটি সময় এখন কেটে যায় মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে। কাজ, পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা যোগাযোগ, সবকিছুতেই স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়েছে।

কিন্তু মোবাইলের পর্দার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার কারণে অনেকের চোখে ক্লান্তি, শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা কিংবা মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ফোনটি চোখের খুব কাছে এনে ব্যবহার করলে চোখের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছেন তা নয়, ফোনটি চোখ থেকে কতটা দূরে রাখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চোখ থেকে মোবাইল কতটা দূরে রাখবেন?

সাধারণভাবে স্মার্টফোনের পর্দা চোখ থেকে অন্তত ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি বা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, ফোনটি এমন দূরত্বে রাখা ভালো যাতে হাত বাড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায় এবং ছোট লেখা পড়ার জন্য ফোনটিকে চোখের কাছে টেনে আনতে না হয়। বিভিন্ন গবেষণাও মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি দূরত্বের কথা উল্লেখ করেছে।

চোখের খুব কাছে ফোন ধরে দীর্ঘ সময় পড়লে চোখের ফোকাসিং ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। আমেরিকান অপটোমেট্রিক অ্যাসোসিয়েশনও বলছে, দীর্ঘ সময় ডিজিটাল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ও দৃষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

মোবাইল বেশি কাছে রাখলে কী সমস্যা হতে পারে?

চোখে ক্লান্তি

দীর্ঘ সময় কাছ থেকে মোবাইলের পর্দা দেখলে চোখকে ক্রমাগত ফোকাস করে থাকতে হয়। এর ফলে চোখে ক্লান্তি, অস্বস্তি এবং মাথাব্যথা হতে পারে।

চোখ শুকিয়ে যেতে পারে

পর্দার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চোখের পাতা কম পড়তে পারে। এতে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া বা চোখে বালু-বালু অনুভূতি হতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অব অপথালমোলজি বলছে, পর্দা দেখার সময় কম পলক ফেলার কারণে চোখের ক্লান্তি ও শুষ্কতার সমস্যা হতে পারে।

ঝাপসা দেখা

দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সাময়িকভাবে দূরের কোনো বস্তু ঝাপসা দেখা বা চোখের ফোকাস বদলাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সাধারণত বিশ্রাম নিলে এ ধরনের অস্বস্তি কমে যায়।

ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা

মোবাইল চোখের খুব কাছে রাখলে অনেকে স্বাভাবিকভাবেই মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় বসে থাকেন। এতে চোখের পাশাপাশি ঘাড়, কাঁধ ও পিঠেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

শুধু দূরত্ব নয়, বিরতিও জরুরি

চোখ ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি হলো নিয়মিত বিরতি নেওয়া। এ ক্ষেত্রে ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন।

অর্থাৎ, প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে প্রায় ২০ ফুট বা ৬ মিটার দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান। এতে চোখের ফোকাসিং ব্যবস্থাকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া যায়। আমেরিকান একাডেমি অব অপথালমোলজি এবং আমেরিকান অপটোমেট্রিক অ্যাসোসিয়েশন উভয়েই এই নিয়মের কথা উল্লেখ করেছে।

ছোট লেখা পড়তে ফোন কাছে আনবেন না

মোবাইলে কোনো লেখা ছোট হলে অনেকেই ফোনটি মুখের আরও কাছে নিয়ে আসেন। এর বদলে লেখার আকার বা ফন্ট বড় করে নিন। এতে ফোনটি চোখের কাছাকাছি না এনেও সহজে পড়া সম্ভব হবে।

পর্দার উজ্জ্বলতা ও ঘরের আলোর মধ্যেও ভারসাম্য রাখা জরুরি। অতিরিক্ত ঝলক বা প্রতিফলন চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। প্রয়োজন হলে পর্দার উজ্জ্বলতা কমিয়ে বা ঘরের আলো সামঞ্জস্য করে নিতে পারেন।

অন্ধকার ঘরে মোবাইল দেখা কি ঠিক?

একেবারে অন্ধকার ঘরে উজ্জ্বল মোবাইলের পর্দার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকা চোখের জন্য আরামদায়ক নয়। তাই রাতে মোবাইল ব্যবহার করলে ঘরে হালকা আলো রাখা এবং পর্দার উজ্জ্বলতা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ভালো।

তবে মোবাইলের নীল আলো সরাসরি চোখ নষ্ট করে বা চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আমেরিকান একাডেমি অব অপথালমোলজি জানিয়েছে, ডিজিটাল পর্দার নীল আলো চোখের রোগ সৃষ্টি করে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে রাতে নীল আলোর সংস্পর্শ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

চোখ ভালো রাখতে আরও কয়েকটি অভ্যাস

মোবাইল বা অন্য ডিজিটাল পর্দা ব্যবহারের সময় কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

  • ফোন চোখ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি দূরে রাখুন।
  • প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান।
  • ইচ্ছা করে নিয়মিত চোখের পাতা ফেলুন।
  • লেখা ছোট হলে ফোন কাছে না এনে ফন্ট বড় করুন।
  • পর্দায় অতিরিক্ত ঝলক বা প্রতিফলন যেন না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • দীর্ঘ সময় একটানা ফোন না দেখে মাঝে বিরতি নিন।
  • চোখ শুকিয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করার অভ্যাস কমান।

শিশুদের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা

শিশুরা মোবাইল বা ট্যাবলেট খুব কাছে এনে দেখছে কি না, অভিভাবকদের সেদিকে নজর রাখা দরকার। ছোট লেখা পড়তে গিয়ে শিশু যদি বারবার পর্দা চোখের কাছে নিয়ে আসে, তাহলে ফন্ট বড় করে দেওয়া এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়ার অভ্যাস করানো ভালো।

শিশুর দৃষ্টিশক্তি নিয়ে কোনো সমস্যা মনে হলে শুধু মোবাইল ব্যবহারের কারণ ধরে না নিয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

মোবাইল ব্যবহারের পর সাময়িক চোখের ক্লান্তি সাধারণত বিশ্রাম নিলে কমে যায়। কিন্তু চোখে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী ঝাপসা দেখা, বারবার মাথাব্যথা, চোখ লাল হয়ে থাকা, আলো সহ্য করতে না পারা বা দৃষ্টির পরিবর্তন নিয়মিত হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

ডিজিটাল পর্দা ব্যবহারের পাশাপাশি চোখের পাওয়ারের সমস্যা, শুষ্ক চোখ বা অন্য কোনো চোখের রোগও এসব উপসর্গের কারণ হতে পারে। তাই সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু মোবাইলের দূরত্ব ঠিক রাখলেই চোখের সব সমস্যা এড়ানো যায় না। ফোন ব্যবহারের সময়, নিয়মিত বিরতি, চোখের পলক ফেলা, পর্যাপ্ত আলো এবং সঠিক দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষা, সবকিছুর দিকেই নজর রাখা দরকার।

সূত্র: টিভি ৯