logo

সারাক্ষণ এসিতে থাকা কি কিডনিতে পাথরের কারণ হতে পারে

সারাক্ষণ এসিতে থাকা কি কিডনিতে পাথরের কারণ হতে পারে
ছবি: টিভি ৯

গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে আজকাল অনেকেই কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে শোবার ঘর - সবখানেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। দিনের পর দিন টানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় এসিতে কাটানো আমাদের অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এসি আরামদায়ক মনে হলেও, বন্ধ ঘরে কৃত্রিম উপায়ে ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।

তবে, ঠান্ডা পরিবেশে থাকার কারণে আমাদের তৃষ্ণা কম পাওয়া, শরীরের ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এবং কিডনির স্বাভাবিক ছাঁকন প্রক্রিয়ায় এর কী প্রভাব পড়ে? চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে এবং সতর্ক না হলে দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে এটি আমাদের কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

এসিতে থাকলে কিডনিতে পাথর হওয়ার কথা কেন বলা হয়?

এসি ঘরে থাকার সময় অনেকের শরীরে গরমের তুলনায় কম ঘাম হয়। ফলে তৃষ্ণাও তুলনামূলক কম অনুভূত হতে পারে। এর সঙ্গে কাজের ব্যস্ততা যোগ হলে কেউ কেউ কয়েক ঘণ্টা পানি না খেয়েই কাটিয়ে দেন।

সমস্যা তৈরি হয় এখানেই। শরীরে পানির ঘাটতি হলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়। তখন প্রস্রাবে থাকা কিছু খনিজ ও লবণ ঘনীভূত হয়ে ক্রিস্টাল তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব ক্রিস্টাল জমে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে।

তাই কিডনিতে পাথরের ক্ষেত্রে মূল বিষয় এসির ঠান্ডা বাতাস নয়, বরং পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার মতো অভ্যাস।

কিডনিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?

কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। প্রস্রাবে বিভিন্ন খনিজ ও লবণ থাকে। সাধারণ অবস্থায় পর্যাপ্ত পানি থাকলে এসব উপাদান প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

কিন্তু পানি কম খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়। তখন ক্যালসিয়াম, অক্সালেটসহ পাথর তৈরিতে ভূমিকা রাখা কিছু উপাদান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রিস্টাল তৈরি করতে পারে। সেই ক্রিস্টাল বড় হতে হতে পাথরে পরিণত হতে পারে।

শুধু পানি কম খাওয়াই কি কিডনিতে পাথরের কারণ?

না। পানিশূন্যতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও এটিই একমাত্র কারণ নয়। পারিবারিক ইতিহাস, আগে কিডনিতে পাথর হওয়ার অভিজ্ঞতা, শরীরের অতিরিক্ত ওজন, বেশি লবণ খাওয়া, কিছু খাবারে বেশি অক্সালেট থাকা এবং কিছু রোগ বা ওষুধের কারণেও কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষ করে খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া দরকার। বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করলে কিডনিকে বেশি পরিমাণ ক্যালসিয়াম ছেঁকে বের করতে হয়, যা কিছু ধরনের কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এসিতে থাকলেও পানি খাওয়ার কথা ভুলবেন না

এসি ঘরে তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরের পানির প্রয়োজন কমে যায় না। তাই তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করা ভালো।

কাজের টেবিলে পানির বোতল রাখলে পানি খাওয়ার কথা মনে রাখা সহজ হয়। দিনের মোট তরলের প্রয়োজন সবার এক নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে।

কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি। পর্যাপ্ত পানি প্রস্রাবকে পাতলা রাখে এবং পাথর তৈরিতে ভূমিকা রাখা খনিজগুলো শরীর থেকে বের হতে সাহায্য করে।

দিনে কতটা পানি খাবেন?

সবার জন্য একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় না। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করা উচিত। তবে কিডনিতে পাথরের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক ব্যক্তিভেদে আরও বেশি তরল গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন।

মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সারা দিনে পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। গরম আবহাওয়া বা বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বেরিয়ে গেলে তরলের প্রয়োজনও বাড়তে পারে।

তাই শুধু নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা ধরে পানি খাওয়ার বদলে নিজের শরীরের প্রয়োজন, আবহাওয়া ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা ভালো।

প্রস্রাবের রং থেকেও ধারণা পাওয়া যায়

শরীরে পর্যাপ্ত পানি আছে কি না, তা বোঝার একটি সাধারণ উপায় হলো প্রস্রাবের রং লক্ষ্য করা। সাধারণত হালকা রঙের প্রস্রাব পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের ইঙ্গিত হতে পারে। গাঢ় প্রস্রাব পানিশূন্যতার ইঙ্গিত হতে পারে, যদিও প্রস্রাবের রং অন্য কারণেও বদলাতে পারে।

তাই দীর্ঘ সময় এসিতে কাজ করার সময় পানি খাওয়া হচ্ছে কি না, সেটির দিকে নজর রাখা জরুরি।

কিডনিতে পাথর এড়াতে আর কী করবেন?

শুধু পানি পান করলেই সব ধরনের কিডনি পাথর ঠেকানো যায় না। জীবনযাপনের আরও কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

লবণ কমান: অতিরিক্ত লবণ কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং বেশি সোডিয়ামযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো ভালো।

খাবারের দিকে নজর দিন: আগে কিডনিতে পাথর হয়ে থাকলে পাথরটি কোন ধরনের ছিল, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ। পাথরের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক খাবারে সোডিয়াম, অক্সালেট, প্রাণিজ প্রোটিন বা ক্যালসিয়ামের পরিমাণে পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন।

দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না: এসিতে কাজ করার সময় মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করুন। এতে শুধু পানি খাওয়ার কথা মনে পড়বে না, দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও কিছুটা কমবে।

পানি সঙ্গে রাখুন: অফিস, গাড়ি বা ঘরে সবসময় পানির বোতল কাছে রাখলে নিয়মিত পানি পান করা সহজ হয়।

কিডনিতে পাথরের লক্ষণ কী?

কিডনিতে পাথর হলে সবার একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। পাথরের আকার ও অবস্থানের ওপরও লক্ষণ নির্ভর করতে পারে। অনেক ছোট পাথর কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে। আবার পাথর প্রস্রাবের পথে আটকে গেলে তীব্র ব্যথা হতে পারে।

কোমর বা পাশের দিকে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবের সময় ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, বমি বা বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রচণ্ড ব্যথা, প্রস্রাবের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, বমির কারণে পানিশূন্যতা বা অন্যান্য গুরুতর উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

তাহলে এসি কি কিডনির জন্য ক্ষতিকর?

এসি চালিয়ে ঠান্ডা পরিবেশে থাকা নিজে থেকে কিডনিতে পাথর তৈরি করে, এমন প্রমাণ নেই। বরং সমস্যা তৈরি হতে পারে যদি এসিতে থাকার কারণে পানি খাওয়ার অভ্যাস কমে যায় এবং শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়।

তাই গরমের দিনে এসি ব্যবহার নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এসির আরামে বসে পানি খাওয়ার কথা ভুলে গেলে চলবে না। কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, পরিমিত লবণ খাওয়া এবং নিজের ঝুঁকির বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক , টিভি ৯