মুখে ঘা, মাড়ি থেকে রক্ত, ঘাটতি হতে পারে যে পুষ্টিতে

শরীর সুস্থ রাখতে শুধু ক্যালরি বা পেট ভরা খাবার যথেষ্ট নয়। ভিটামিন ও খনিজের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টও শরীরের স্বাভাবিক কাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর প্রয়োজন হয় অল্প পরিমাণে, কিন্তু ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা, দুর্বলতা, দৃষ্টির সমস্যা, হাড়ের দুর্বলতা থেকে শুরু করে স্নায়ু ও থাইরয়েডের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আয়রন, ভিটামিন এ ও আয়োডিনের ঘাটতি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
অনেক সময় পুষ্টির ঘাটতির শুরুতে উপসর্গ খুব সাধারণ হয়। ক্লান্তি, দুর্বলতা, মুখে ঘা, চুল পড়া বা ত্বকের পরিবর্তনকে অনেকে অন্য কোনো কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেন। তবে কিছু লক্ষণ নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সম্প্রতি একটি অনলাইন গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির সম্ভাব্য প্রাথমিক লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। চলুন কোন পুষ্টির ঘাটতিতে কী লক্ষণ দেখা দেয় জেনে নিই।
ভিটামিন এ কমলে রাতকানা হতে পারে
ভিটামিন এ চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, বৃদ্ধি ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুতর ঘাটতিতে বিশেষ করে কম আলোতে দেখতে সমস্যা বা রাতকানা হতে পারে।
ভিটামিন এ পাওয়া যায় লিভার, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারে। এ ছাড়া গাজর, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক ও অন্যান্য গাঢ় সবুজ বা হলুদ-কমলা রঙের সবজিতে বিটা-ক্যারোটিন থাকে, যা শরীর ভিটামিন এ-তে রূপান্তর করতে পারে।
তবে রাতের বেলা দেখতে সমস্যা হলেই ভিটামিন এ-এর ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। চোখের অন্য সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে।
ভিটামিন কে কমলে সহজে কালশিটে পড়তে পারে
ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে রক্তপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে এবং সামান্য আঘাতেও সহজে কালশিটে পড়তে পারে।
শাকসবজি, বিশেষ করে সবুজ শাক ভিটামিন কে-এর ভালো উৎস। বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেলেও এটি পাওয়া যায়।
তবে শরীরে সহজে কালশিটে পড়ার আরও অনেক কারণ রয়েছে। কিছু ওষুধ, রক্তের সমস্যা বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণেও এমন হতে পারে। তাই বারবার বা অকারণে কালশিটে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভিটামিন সি কমলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে
ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে এবং ক্ষত সারানো, ত্বক ও বিভিন্ন টিস্যুর স্বাভাবিক গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়। দীর্ঘদিন গুরুতর ঘাটতি হলে স্কার্ভি হতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে মাড়ি থেকে রক্তপাত, দুর্বলতা ও ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে।
পেয়ারা, আমলকি, কমলা, লেবু ও অন্যান্য টকজাতীয় ফল ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। কিছু সবজিতেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
তবে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি হলো মাড়ির রোগ ও অপর্যাপ্ত মুখের পরিচর্যা। তাই শুধু ভিটামিন সি খেলে সমস্যাটি সমাধান হবে, এমন নয়।
ভিটামিন বি৬ কমলে ঠোঁটের কোণে ঘা হতে পারে
ভিটামিন বি৬ শরীরে অ্যামাইনো অ্যাসিডের বিপাক, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং হিমোগ্লোবিন তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে। ঘাটতি হলে ঠোঁটের কোণে ফাটল বা প্রদাহ, জিহ্বায় পরিবর্তন, ত্বকের সমস্যা ও রক্তস্বল্পতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
মাংস, মাছ, আলু, কলা, ছোলা ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার এবং বিভিন্ন শস্যে ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়।
ঠোঁটের কোণে বারবার ফাটল দেখা দিলে শুধু বি৬ নয়, আয়রন, ফোলেট বা বি-ভিটামিনের অন্য ঘাটতিও বিবেচনায় আসতে পারে।
ক্যালসিয়াম কমলে মুখের চারপাশে ঝিনঝিনি হতে পারে
ক্যালসিয়াম শুধু হাড় ও দাঁত শক্ত রাখে না, পেশি সংকোচন, স্নায়ুর কার্যক্রম এবং রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে মুখের চারপাশে বা হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, পেশিতে টান বা খিঁচুনি হতে পারে।
দুধ ও দুধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের পরিচিত উৎস। এ ছাড়া কিছু ছোট মাছ, শাকসবজি এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড খাবার থেকেও এটি পাওয়া যায়।
তবে মুখের চারপাশে ঝিনঝিনি হলেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়েছে, এমন ধরে নেওয়া যাবে না। স্নায়ু বা অন্য শারীরিক সমস্যাতেও এমন হতে পারে।
ফোলেট কমলে মুখে ঘা ও ক্লান্তি হতে পারে
ফোলেট বা ভিটামিন বি৯ ডিএনএ তৈরি এবং কোষ বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয়। এর ঘাটতি হলে এক ধরনের রক্তস্বল্পতা হতে পারে, যার ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মুখে ঘা বা জিহ্বায় প্রদাহও হতে পারে।
শাকসবজি, ডাল, মটরশুঁটি, বাদাম, কমলা জাতীয় ফল এবং ফোলেটযুক্ত শস্যজাত খাবার ভালো উৎস।
গর্ভাবস্থায় ফোলেটের প্রয়োজন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পর্যাপ্ত ফোলেট না থাকলে শিশুর নিউরাল টিউবের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আয়োডিন কমলে গলা ফুলে যেতে পারে
থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। শরীরে দীর্ঘদিন আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গলায় ফোলা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে গয়টার বা গলগণ্ড বলা হয়।
আয়োডিনযুক্ত লবণ আয়োডিন পাওয়ার সহজ উৎস। সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার এবং ডিমেও আয়োডিন থাকে।
বিশেষ করে পরিবারের রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে লবণ বেশি খাওয়া যাবে না। আয়োডিনের প্রয়োজন পূরণের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আয়রনের ঘাটতিতেও শরীর নানা সংকেত দিতে পারে
মূল প্রতিবেদনে সাতটি পুষ্টির তালিকায় আয়রন ছিল না, কিন্তু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করলে আয়রনের কথা আলাদাভাবে বলা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতি বিশ্বজুড়ে অন্যতম সাধারণ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি।
আয়রনের ঘাটতি হলে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা হতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ফ্যাকাশে ভাব এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া বা নখ চামচের মতো বাঁকা হয়ে যাওয়াও গুরুতর আয়রন ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
মাংস, মাছ, ডিম, ডাল, ছোলা ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার থেকে আয়রন পাওয়া যায়। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষিত করতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার সঙ্গে রাখা উপকারী।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিও উপেক্ষা করা ঠিক নয়
ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন। ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব, ভারসাম্যের সমস্যা এবং চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
মাংস, মাছ, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ভিটামিন বি১২-এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস। উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে প্রাকৃতিকভাবে বি১২ থাকে না বললেই চলে, তাই সম্পূর্ণ ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীদের ফোর্টিফায়েড খাবার বা প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্টের বিষয়টি চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
পুষ্টির ঘাটতি বুঝতে শুধু উপসর্গ যথেষ্ট নয়
একই ধরনের উপসর্গ একাধিক পুষ্টির ঘাটতিতে দেখা যেতে পারে। আবার ক্লান্তি, চুল পড়া, মুখে ঘা বা দুর্বলতার মতো সমস্যা পুষ্টির ঘাটতি ছাড়াও অনেক রোগ বা জীবনযাপনের কারণে হতে পারে।
তাই শুধু কোনো একটি লক্ষণ দেখে নির্দিষ্ট ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি ধরে নিয়ে সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করে ঘাটতির কারণ ও মাত্রা নির্ণয় করতে পারেন।
খাবার থেকেই পুষ্টি পাওয়ার চেষ্টা করুন
বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যই প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিত ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাণিজ উৎসের পুষ্টিকর খাবার রাখার পরামর্শ দেয়।
- দৈনন্দিন খাবারে তাই শুধু ভাত বা রুটির ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের খাবার রাখা জরুরি। যেমন-
- মাছ, ডিম ও পরিমিত মাংস
- ডাল, ছোলা ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- মৌসুমি ফল
- বাদাম ও বীজ
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
- আয়োডিনযুক্ত লবণ
একই খাবার প্রতিদিন বেশি পরিমাণে খাওয়ার বদলে খাবারে বৈচিত্র্য রাখলে বিভিন্ন পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ বাড়ে।
মুখে ঘা, মাড়ি থেকে রক্তপাত, সহজে কালশিটে পড়া, ঠোঁটের কোণে ফাটল বা গলায় ফোলা দেখা দিলে বিষয়গুলোকে সবসময় সামান্য সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো নির্দিষ্ট ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ কোনো একটি পুষ্টির ঘাটতির নিশ্চিত প্রমাণ নয়। তাই নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন বা মিনারেল সাপ্লিমেন্ট না খেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া উপসর্গের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবার, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শই পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলার নিরাপদ পথ।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



