থাইরয়েডের ওষুধের সঙ্গে কোন খাবারে সমস্যা হতে পারে, জেনে নিন

থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়ার পর অনেকেই খাবারের তালিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কোন খাবার খাওয়া যাবে, কোনটি বাদ দিতে হবে, বাঁধাকপি বা ফুলকপি কি একেবারেই খাওয়া যাবে না, সয়া কি থাইরয়েড আরও খারাপ করে, এমন নানা প্রশ্ন থাকে।
আসলে থাইরয়েডের রোগীদের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই খাবার নিষিদ্ধ, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। কোন খাবার কতটা খাবেন, তা নির্ভর করে আপনার থাইরয়েডের সমস্যা, শরীরে আয়োডিনের মাত্রা এবং আপনি কোন ওষুধ নিচ্ছেন তার ওপর।
বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় লেভোথাইরক্সিন খেলে ওষুধ কখন এবং কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু খাবার ও সম্পূরক এই ওষুধ শরীরে শোষিত হওয়ার পরিমাণ কমাতে পারে।
অতিরিক্ত আয়োডিনযুক্ত খাবার ও সম্পূরক
থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে আয়োডিন প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে বেশি আয়োডিন খেলেই থাইরয়েড ভালো থাকবে, এমন নয়। অতিরিক্ত আয়োডিনও থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই থাইরয়েডের রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আয়োডিনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।
বিশেষভাবে কেল্প বা সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি আয়োডিনযুক্ত সম্পূরক নিজের ইচ্ছায় খাওয়া ঠিক নয়। এসব সম্পূরকে আয়োডিনের পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে।
তাই থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে আয়োডিনের ট্যাবলেট বা সামুদ্রিক শৈবালের সম্পূরক শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সয়া জাতীয় খাবার
সয়া নিয়ে থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে অনেক ভয় রয়েছে। সয়া দুধ, টফু বা সয়া দিয়ে তৈরি খাবার খেলেই থাইরয়েড খারাপ হয়, এমন ধারণা ঠিক নয়।
তবে সয়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ, বিশেষ করে লেভোথাইরক্সিনের শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সয়া জাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।
অর্থাৎ সয়া পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে ওষুধ ও খাবারের সময়ের ব্যবধান ঠিক রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাঁধাকপি, ফুলকপি ও ব্রোকলি কি বাদ দিতে হবে?
বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রোকলি ও এ ধরনের সবজিকে অনেক সময় থাইরয়েড রোগীদের জন্য নিষিদ্ধ বলা হয়। কিন্তু সাধারণ পরিমাণে এসব সবজি খাওয়া মানেই থাইরয়েডের ক্ষতি হবে, এমন প্রমাণ নেই।
এসব সবজিতে গয়ট্রোজেনিক উপাদান রয়েছে। তবে স্বাভাবিক খাবারের পরিমাণে এবং পর্যাপ্ত আয়োডিন গ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলো সাধারণত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
তাই থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে বলে সবজি খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং সুষম খাবারের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও চিনিযুক্ত খাবার
থাইরয়েডের রোগীদের জন্য বিস্কুট, কেক, মিষ্টি, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সরাসরি বিষাক্ত নয়। তবে এসব খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শর্করা ও ক্যালরি থাকতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজমে ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার সমস্যা আরও বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত এসব খাবারের ওপর নির্ভর না করে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ, ডিম ও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো।
বেশি পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ বা সম্পূরক নিজে থেকে বাড়াবেন না
থাইরয়েডের সমস্যা হয়েছে শুনে অনেকে আয়োডিনযুক্ত লবণ বেশি খেতে শুরু করেন। আবার কেউ কেউ আয়োডিনের ট্যাবলেট বা বিভিন্ন হারবাল সম্পূরক নেন।
এটি ঠিক নয়। আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করা যায়। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আয়োডিন গ্রহণ থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা করতে পারে।
বিশেষ করে কেল্প বা সামুদ্রিক শৈবালজাত সম্পূরক সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।
থাইরয়েডের ওষুধের সঙ্গে চা বা কফি খাবেন না
অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে লেভোথাইরক্সিন খাওয়ার পরপরই চা বা কফি পান করেন। এতে ওষুধের শোষণ কমে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা লেভোথাইরক্সিন সাধারণত সকালের প্রথম খাবার বা ক্যাফেইনযুক্ত চা-কফির অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে খাওয়ার পরামর্শ দেয়।
তাই চিকিৎসক যেভাবে ওষুধ খেতে বলেছেন, সেই নিয়ম মেনে চলুন। শুধু খাবার নয়, ওষুধের সময়ও থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালসিয়াম ও আয়রনের সম্পূরকও একই সময়ে নয়
ক্যালসিয়াম ও আয়রনের ট্যাবলেট লেভোথাইরক্সিনের শোষণে বাধা দিতে পারে। তাই থাইরয়েডের ওষুধের সঙ্গে এগুলো একই সময়ে খাওয়া উচিত নয়।
আপনি যদি আয়রন বা ক্যালসিয়ামের সম্পূরক খান, তাহলে কখন কোনটি খাবেন, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
তাহলে থাইরয়েডের রোগীরা কী খাবেন?
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেই খাবারের তালিকা খুব ছোট করে ফেলতে হবে, এমন নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবারই গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন-
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- মৌসুমি ফল
- ডাল ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার
- মাছ
- ডিম
- প্রয়োজন অনুযায়ী মাংস
- পূর্ণ শস্য
- বাদাম ও বীজ
- পরিমিত দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
কোনো নির্দিষ্ট খাবার আপনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে কি না, সেটি ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা ভালো।
থাইরয়েডের জন্য বিশেষ কোনো খাবার কি রোগ সারিয়ে দিতে পারে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমন দাবি দেখা যায় যে নির্দিষ্ট কোনো খাবার বা পানীয় খেলে থাইরয়েড রোগ ভালো হয়ে যায়। এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আমেরিকান থাইরয়েড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো বিশেষ খাবার, ভিটামিন বা সম্পূরক দিয়ে থাইরয়েড রোগ দূর করা যায়, এমন প্রমাণ নেই।
হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে অনেক রোগীর জন্য লেভোথাইরক্সিনই মূল চিকিৎসা। ওষুধের মাত্রা প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক ঠিক করেন।
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে অনেক খাবার একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাঁধাকপি, ফুলকপি বা সয়া জাতীয় খাবারকে সবার জন্য নিষিদ্ধ ভাবাও ঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত আয়োডিন বা আয়োডিনের সম্পূরক নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ না করা এবং থাইরয়েডের ওষুধ সঠিক সময়ে খাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে লেভোথাইরক্সিন খেলে চা-কফি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও কিছু খাবারের সঙ্গে সময়ের ব্যবধান রাখতে হয়। আপনার থাইরয়েডের ধরন ও ওষুধ অনুযায়ী কোন খাবার কতটা খাবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: নিউজ ১৮