logo
Advertisement

ফ্যাটি লিভারের চর্বি কমতে পারে যে একটি খাবারে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ফ্যাটি লিভারের চর্বি কমতে পারে যে একটি খাবারে
অনেকের ক্ষেত্রে শুরুতে ফ্যাটি লিভারের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। ছবি: ক্যবোট হেল্থ

ভাতের সঙ্গে সালাদ, তরকারিতে, স্যুপে কিংবা সস হিসেবে টমেটো আমাদের খাবারের পরিচিত একটি উপাদান। স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি টমেটো যে পুষ্টিকর, সেটিও অনেকের জানা। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, নিয়মিত টমেটো খাওয়ার সঙ্গে লিভারে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি কমার একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে।

Advertisement

গবেষণাটি ফ্যাটি লিভারের একটি ধরন, মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা এমএএসএলডিতে আক্রান্ত মানুষের ওপর করা হয়েছে। ছয় সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন কাঁচা টমেটো ও টমেটোর সস খাওয়া ব্যক্তিদের লিভারে চর্বি নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় বেশি কমেছে।

তবে এটিকে টমেটো খেলেই ফ্যাটি লিভার সেরে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। গবেষণাটি ছিল ছোট এবং মাত্র ছয় সপ্তাহের। আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

কীভাবে করা হয়েছিল গবেষণাটি?

ইতালির গবেষকেরা এই গবেষণায় এমএএসএলডিতে আক্রান্ত ৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

একটি দল প্রতিদিন ২০০ গ্রাম কাঁচা টমেটো এবং ৫০ গ্রাম টমেটোর সস খেয়েছে। অন্য দলকে টমেটোবিহীন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে বলা হয়। গবেষণাটি চলে ছয় সপ্তাহ।

গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের লিভারে চর্বির পরিমাণ পরিমাপ করতে ফাইব্রোস্ক্যানের নিয়ন্ত্রিত অ্যাটেনুয়েশন প্যারামিটার বা সিএপি ব্যবহার করেন।

ছয় সপ্তাহ পর দেখা যায়, দুই দলেই লিভারে চর্বির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে টমেটো খাওয়া দলের কমার হার ছিল বেশি। টমেটো খাওয়া দলের সিএপি মানের মধ্যম পরিবর্তন ছিল মাইনাস ৩৫ ডেসিবেল প্রতি মিটার, যেখানে নিয়ন্ত্রণ দলের ক্ষেত্রে তা ছিল মাইনাস ১৮ ডেসিবেল প্রতি মিটার।

শুধু ওজন কমার কারণেই কি লিভারের চর্বি কমেছে?

গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো, টমেটো খাওয়া দলের লিভারে চর্বি কমলেও শরীরের ওজন বা বিএমআইতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।

গবেষকেরা শরীরের ওজন, বিএমআই, কোমরের মাপ, মোট শরীরের চর্বি এবং পেটের ভেতরের চর্বির মতো বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এসব ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।

এর অর্থ হতে পারে, টমেটো খাওয়ার সঙ্গে লিভারে চর্বি কমার একটি আলাদা সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন উপাদান এর পেছনে কাজ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

টমেটোর কোন উপাদান উপকারী হতে পারে?

টমেটোতে লাইকোপিন নামের একটি ক্যারোটিনয়েড থাকে। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। টমেটোতে এ ছাড়া বিটা ক্যারোটিন, পলিফেনলসহ আরও কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, এসব উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে এবং লিভারে চর্বি তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই গবেষণা থেকে কোন নির্দিষ্ট উপাদান লিভারের চর্বি কমানোর জন্য দায়ী, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

লাইকোপিন নিয়ে ২০২৬ সালের আরেকটি পর্যালোচনাতেও ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

কাঁচা টমেটো না টমেটোর সস?

গবেষণায় দুটিই ব্যবহার করা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের প্রতিদিন ২০০ গ্রাম কাঁচা টমেটোর সঙ্গে ৫০ গ্রাম টমেটোর সস খেতে দেওয়া হয়েছিল। তাই শুধু কাঁচা টমেটো খেলে বা শুধু সস খেলেই একই ফল পাওয়া যাবে, এমন সিদ্ধান্ত গবেষণা থেকে নেওয়া যায় না।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাজারের অনেক টমেটো সসে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা তেল থাকতে পারে। তাই গবেষণায় ব্যবহৃত টমেটো সসের সঙ্গে সাধারণ বোতলজাত সসকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের জন্য টমেটো খেতে চাইলে তাজা টমেটো বা কম লবণ ও কম চিনি দিয়ে তৈরি টমেটোর খাবার বেছে নেওয়া ভালো।

ফ্যাটি লিভার আসলে কী?

লিভারে স্বাভাবিকভাবেই কিছু চর্বি থাকে। কিন্তু লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করলে তাকে ফ্যাটি লিভার বা হেপাটিক স্টিয়াটোসিস বলা হয়।

এমএএসএলডি সাধারণত শরীরের বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রার মতো বিষয় এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কিন্তু দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে লিভারে প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও গুরুতর লিভার রোগে পরিণত হতে পারে।

টমেটো খেলেই কি ফ্যাটি লিভার ভালো হবে?

না। মনে রাখবেন, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন গবেষণাটি টমেটো খাওয়ার সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু টমেটোকে ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা হিসেবে প্রমাণ করেনি।

গবেষণায় ছয় সপ্তাহ পর লিভারে চর্বি কমার পার্থক্য দেখা গেলেও লিভারের শক্ত হয়ে যাওয়া, এফআইবি-৪ সূচক, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, লিভার এনজাইম এবং অন্যান্য বেশ কিছু বিপাকীয় সূচকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ লিভারে চর্বি কমেছে মানেই লিভারের সব ধরনের সমস্যা ঠিক হয়ে গেছে, এমন নয়।

তাহলে ফ্যাটি লিভারে টমেটো কীভাবে খাবেন?

টমেটোকে প্রতিদিনের সুষম খাবারের অংশ করা যেতে পারে। সালাদে কাঁচা টমেটো, সবজি বা মাছের তরকারিতে টমেটো, টমেটোর স্যুপ কিংবা ঘরে তৈরি কম লবণ ও কম চিনি দেওয়া টমেটোর সস খাওয়া যেতে পারে।

তবে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত তেল ও ভাজাপোড়া খাবার কমানো, পরিমিত খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ওজন কমানোও উপকারী হতে পারে।

টমেটো সবার জন্য সমান উপকারী?

টমেটো সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে।

যাঁদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বেশি টমেটো বা টমেটোভিত্তিক খাবার অস্বস্তি বাড়াতে পারে। আবার কিডনির গুরুতর সমস্যায় যাঁদের পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাঁদেরও খাবারে টমেটোর পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

তাই কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার অংশ হিসেবে প্রতিদিন বেশি পরিমাণে টমেটো খাওয়া শুরু করার আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা ভালো।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা কী?

গবেষণাটি আশাব্যঞ্জক হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রথমত, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৯ জন। দ্বিতীয়ত, গবেষণাটি মাত্র ছয় সপ্তাহ চলেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টমেটো খাওয়ার প্রভাব একই থাকবে কি না, তা জানা যায়নি।

এ ছাড়া গবেষণায় এমন প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যাঁদের বিএমআই ৩০ বা তার কম ছিল। ফলে গুরুতর স্থূলতার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা এই গবেষণা থেকে বলা যায় না।

তাই ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।

শুধু টমেটো নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি খাবারকে আলাদা করে দেখার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টমেটো, শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম, মাছ এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শর্করা, ভাজাপোড়া এবং অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার কমানো প্রয়োজন।

টমেটোকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে রাখা তাই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু শুধু প্রতিদিন টমেটো খেয়ে অন্য অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস চালিয়ে গেলে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এমএএসএলডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ছয় সপ্তাহ প্রতিদিন ২০০ গ্রাম কাঁচা টমেটো ও ৫০ গ্রাম টমেটোর সস খাওয়ার পর লিভারে চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় বেশি কমেছে।

ফলাফলটি আশাব্যঞ্জক হলেও গবেষণাটি ছোট এবং স্বল্পমেয়াদি। তাই টমেটোকে ফ্যাটি লিভারের ওষুধ বলা যাবে না।

তবে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে নিয়মিত টমেটো খাওয়া স্বাস্থ্যকর একটি অভ্যাস হতে পারে। আর ফ্যাটি লিভার থাকলে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ, সবকিছুর দিকেই নজর দেওয়া জরুরি।

সূত্র: সামা নিউজ