logo

শিশুদের ক্যানসারের ৭ লক্ষণ, যা সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়

শিশুদের ক্যানসারের ৭ লক্ষণ, যা সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়
ছবি: ডেইলি রেকর্ড

সন্তানের একটু সর্দি-কাশি বা জ্বর এলেই বাবা-মা অস্থির হয়ে পড়েন। একটু অসুস্থতাতেই ডাক্তারদের কাছে ছোটাছুটি শুরু করে দেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, শিশুদের শরীরে বাসা বাঁধা মরণব্যাধি ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো আপনারা কতটা সহজে এড়িয়ে যাচ্ছেন? এগুলোকে অনেকেই সাধারণ কোনো অসুস্থতা ভেবে ভুল করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণগুলো বেশিরভাগ সময়ই খুব সাধারণ হয়। প্রথম দিকে বাবা-মায়েদের পক্ষে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একটু সচেতন হলে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই ভয়াবহ রোগের সঙ্গে লড়াই করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

কেন শিশুদের ক্যানসার সহজে ধরা পড়ে না?

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যানসারের সঙ্গে শিশুদের ক্যানসারের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। বড়দের ক্ষেত্রে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস কিংবা পরিবেশগত ক্ষতির কারণে ক্যানসার হতে দেখা যায়। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি পুরোপুরি আলাদা। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের শরীরে ক্যানসার হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখন পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

শিশুদের শরীর খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পরিবর্তনশীল থাকে। ফলে ক্যানসারের কোষগুলোও বয়স্কদের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়ায়। কিন্তু সমস্যা হলো, শিশুরা তাদের শারীরিক কষ্টগুলো ঠিকমতো মুখে বলতে পারে না। তাই বাবা মায়েরা এগুলোকে সাধারণ সমস্যা মনে করেন।

আগে বুঝতে হবে, সব লক্ষণ মানেই কি ক্যানসার?

একেবারেই না। শিশুদের সর্দি-কাশি, জ্বর, বা কোথাও চোট পাওয়া খুব সাধারণ বিষয়। শিশুরা খেলাধুলা করার সময় প্রায়ই আছাড় খায়, শরীরে দাগ বা ফোলাভাব দেখা যায়। তবে সাধারণ অসুস্থতার সঙ্গে ক্যানসারের লক্ষণের মূল পার্থক্য ৩টি জায়গায়-

• কমছে না, বরং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে।

• চিকিৎসা বা ওষুধ দেওয়ার পরও বারবার ফিরে আসছে।

• একাধিক অদ্ভুত লক্ষণ একসাথে দেখা দিচ্ছে (যেমন: জ্বরের সঙ্গে হঠাৎ শরীরের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া)।

শিশুদের শরীরে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ

রোগের ধরন ভেদে লক্ষণ আলাদা হতে পারে। চলুন শিশুদের শরীরে ক্যানসারের ৭টি প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নিই-

অহেতুক ক্লান্তি ও ফ্যাকাশে ভাব (লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে)

আপনার সন্তান আগের মতো চঞ্চল আছে কিনা বা খেলাধুলা করছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন। সারাক্ষণ শুয়ে-বসে থাকতে চাওয়ায় আশঙ্কাজনক।

• ত্বকের রং ফ্যাকাশে হওয়া: রক্তে লোহিত রক্তকণিকা কমে গেলে ত্বক, ঠোঁট বা চোখের ভেতরের অংশ সাদাটে বর্ণের দেখায়।

• অস্বাভাবিক র‌্যাশ বা কালশিটে: আঘাত না পাওয়া সত্ত্বেও শরীরে বিভিন্ন জায়গায় কালশিটে দাগ পড়া, বা চামড়ায় লালচে ছোট বিন্দু দেখা দেয়।

• রক্তপাত: দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে হঠাৎ করেই রক্ত পড়া এবং সহজে রক্ত বন্ধ না হওয়া।

কোনো আঘাত ছাড়াই হাড়, পেশি বা গিঁটে একটানা ব্যথা

বাচ্চাদের শারীরিক বৃদ্ধির সময় মাঝে মাঝে পায়ে ব্যথা হতে পারে, যাকে ‘গ্রোইং পেইন’ বলা হয়। কিন্তু ক্যানসারের হাড়ের ব্যথা একটু ভিন্ন হয়। এই ব্যথা কোনো ধরনের আঘাত ছাড়াই শুরু হয় এবং দিন দিন বাড়তে থাকে। ব্যথা রাতে এতটাই বাড়ে যে বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়। শিশু হাঁটার সময় হঠাৎ খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে বা হাঁটা কমিয়ে দেয়।

শরীরের যেকোনো স্থানে অস্বাভাবিক ফোলাভাব

গোসল করানোর সময় বা জামা পরানোর সময় বাচ্চার শরীরে কোনো ফোলা অংশ আছে কিনা খেয়াল রাখুন। বাচ্চার শরীর শুকালেও পেট হঠাৎ বাইরের দিকে ফুলে উঠলে বা শক্ত মনে হলে তা উইলমস টিউমার বা নিউরোব্লাস্টোমার মতো রোগের সংকেত হতে পারে।

গলা, ঘাড় বা বগলে শক্ত গুটির মতো দেখা যায় বা লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায়া। সাধারণ ঠান্ডা লাগলেও এগুলো ফোলে, তবে ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই গুটিগুলো শক্ত, সহজে নড়াচড়া করে না এবং ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে ছোট হয় না।

চোখের মনির অদ্ভুত পরিবর্তন (রেটিনোব্লাস্টোমা)

ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলার সময় যদি খেয়াল করেন বাচ্চার চোখের মণি বা পিউপিলে স্বাভাবিক লালচে প্রতিচ্ছবির বদলে বিড়ালের চোখের মতো সাদা বা চকচকে আলো দেখা যাচ্ছে, তবে সতর্ক হোন। হঠাৎ করে চোখে টেরা ভাব আসা বা দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন হওয়াও ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।

সকালের দিকে মাথা ব্যথা ও বমি (ব্রেন টিউমার)

বাচ্চাদের মাথাব্যথা খুব একটা স্বাভাবিক বিষয় নয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই মাথাব্যথা তীব্র হওয়া এবং বমি হওয়া ব্রেন টিউমারের লক্ষণ। হাঁটতে গিয়ে বারবার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা আচার-ব্যবহারে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন আসা।

ওজন কমে যায় এবং একটানা জ্বর থাকে

কোনো সংক্রমণ ছাড়াই যদি জ্বর টানা ২-৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে এটাকে স্বাভাবিক জ্বর ভাববেন না। কিংবা বাচ্চা ঠিকমতো খাওয়ার পরও হু হু করে ওজন কমে যাওয়া এবং রাতে অতিরিক্ত ঘামে জামাকাপড় ভিজে যাওয়া- এসবই ক্যানসারের প্রথমিক লক্ষণ বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।

কানে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ও দুর্গন্ধযুক্ত তরল পড়া

সাধারণত বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগলে বা কান চুলকালে কানে ইনফেকশন বা পানি জমা হতে পারে। তবে এই লক্ষণটির ধরন একটু ভিন্ন। বাচ্চার কান থেকে দীর্ঘদিন ধরে পানি, পুঁজ বা আঠালো তরল পড়তে থাকে। অনেক সময় এতে তীব্র দুর্গন্ধ থাকে এবং হালকা রক্তও মিশে থাকতে পারে। যদি ২-৩ সপ্তাহ চিকিৎসার পরও কান দিয়ে তরল পড়া না কমে, তবে দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখানো উচিৎ।

দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন কখন?

যদি আপনার বাচ্চার মধ্যে এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকে, তবে দেরি না করে দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:

• যেকোনো ফোলা ভাব যা দুই বা তিন সপ্তাহেও কমছে না।

• কোনো চোট ছাড়াই শিশু পায়ে ব্যথা পাচ্ছে বা হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছে।

• ঘুম থেকে উঠে তীব্র মাথাব্যথা ও বমি।

• চোখে মণির ভেতর সাদা বা চকচকে দেখা গেলে।

• চেহারায় ফ্যাকাশে ভাব ও চামড়ায় কালশিটে দাগ।

• যদি বাচ্চার হঠাৎ খিঁচুনি হয়, শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে।

আতঙ্কিত না হয়ে, সচেতন হোন

বাবা-মা হিসেবে নিজের সন্তানের প্রতি সর্বোচ্চ সতর্ক থাকুন। আপনার মনে যদি সামান্যতম সন্দেহও জাগে যে বাচ্চার শারীরিক পরিবর্তনটা হয়তো স্বাভাবিক নয়, তবে ভয় না পেয়ে ডাক্তারের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। বাচ্চাদের ক্যানসার কোনো প্রতিরোধযোগ্য ভুলের কারণে হয় না। সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা এবং উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

সূত্র: বিবিসি, অ্যাকিবাডেম ইন্টারন্যাশনাল