Advertisement

প্রতিদিন রোদে কতক্ষণ থাকলে উপকার, কখন বাড়ে ক্ষতির ঝুঁকি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন রোদে কতক্ষণ থাকলে উপকার, কখন বাড়ে ক্ষতির ঝুঁকি

রোদকে আমরা অনেক সময় শুধু গরম বা অস্বস্তির কারণ হিসেবে দেখি। বিশেষ করে গরমের দেশগুলোতে দিনের বেলায় বাইরে বের হলে তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে ছায়া খুঁজি। কিন্তু সূর্যের আলো একেবারে এড়িয়ে চলাও শরীরের জন্য ভালো নয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সামান্য পরিমাণ শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে, যা হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

তবে প্রশ্ন হলো, সুস্থ থাকতে আসলে কতক্ষণ রোদে থাকা দরকার? এর উত্তর সবার জন্য এক নয়। ত্বকের রং, বয়স, পোশাক, ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু, দিনের সময় এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির মাত্রার ওপর প্রয়োজনীয় রোদে থাকার সময় নির্ভর করে। বিবিসি’র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টিই তুলে ধরা হয়েছে।

রোদ কেন দরকার?

সূর্যের আলো থেকে পাওয়া ইউভিবি (UVB- Ultraviolet B) রশ্মি ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে এবং হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি রোদে থাকা যাবে, তত বেশি উপকার হবে। এটি বুঝা জরুরি যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউভি (UV- Ultraviolet) রশ্মি ত্বক ও চোখের ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

কতক্ষণ রোদে থাকলেই যথেষ্ট?

এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভিটামিন ডি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোকের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে অনেকটাই আলাদা।

একটি উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, UV index (০ থেকে ১১+ পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক স্কেল যা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির তীব্রতা পরিমাপ করে এবং ত্বক কত দ্রুত পুড়ে যেতে পারে, তার পূর্বাভাস দেয়।) ৭ থাকলে সুস্থ ত্বকের নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের ক্ষেত্রে মুখ, হাত ও বাহু খোলা রেখে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার অল্প সময়ের সূর্যালোক যথেষ্ট হতে পারে। তবে এটি কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয় এবং ত্বকের ধরন ও পরিবেশের পার্থক্যের কারণে প্রয়োজনীয় সময়ও বদলে যায়।

তাই ১০ মিনিট, ২০ মিনিট বা ৩০ মিনিটকে সবার জন্য প্রতিদিনের নির্দিষ্ট নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সকালবেলার রোদই কি সবচেয়ে ভালো?

সকালবেলার নরম রোদকে সাধারণত আরামদায়ক মনে হলেও ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষেত্রে শুধু সময়ের দিকে তাকালেই হবে না। সূর্য কতটা ওপরে আছে এবং ইউভিবি রশ্মির মাত্রা কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সূর্যের অবস্থান, ঋতু, অক্ষাংশ, মেঘ, উচ্চতা ও বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন বিষয় ইউভি রশ্মির মাত্রাকে প্রভাবিত করে। তাই এক দেশের নির্দিষ্ট সময়ের রোদকে অন্য দেশের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের মতো তুলনামূলকভাবে কম অক্ষাংশের দেশে বছরের বড় সময় সূর্যের ইউভি রশ্মি যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারে। তাই খুব দীর্ঘ সময় রোদে থাকার চেয়ে পরিস্থিতি বুঝে অল্প সময় বাইরে থাকা বেশি যুক্তিসংগত।

ত্বকের রংও গুরুত্বপূর্ণ

ত্বকের রং সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি তৈরির ওপর প্রভাব ফেলে। গাঢ় ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকায় একই পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরিতে তুলনামূলক বেশি ইউভিবি সংস্পর্শের প্রয়োজন হতে পারে।

আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকের ভিটামিন ডি তৈরির সক্ষমতাও কমতে পারে। যারা দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরে থাকেন, তাদেরও সূর্যালোক থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়ার সুযোগ কম থাকে।

শুধু মুখ ও হাত রোদে দিলেই কি হবে?

শরীরের যত বেশি ত্বক সূর্যের আলোতে আসে, ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ তত বাড়ে। তবে এর অর্থ শরীরের বড় অংশ দীর্ঘ সময় অনাবৃত রেখে রোদ পোহানো নয়।

পোশাক, ছাতা, ছায়া ও সানস্ক্রিন ইউভিবি রশ্মির সংস্পর্শ কমিয়ে দেয়। ফলে কারও জীবনযাপন বা পোশাকের কারণে সূর্যালোকের সংস্পর্শ খুব কম হলে খাবার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডির অন্য উৎস প্রয়োজন হতে পারে।

বেশি রোদে থাকলে কি বেশি ভিটামিন ডি হবে?

না। শরীরের ভিটামিন ডি তৈরির একটি সীমা আছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রোদে থাকার ফলে ভিটামিন ডি বাড়তেই থাকবে, এমন নয়। বরং অতিরিক্ত ইউভি রশ্মির কারণে ত্বক পুড়ে যাওয়া, ত্বকের অকাল বার্ধক্য এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ইউভি রশ্মি মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত। তাই ভিটামিন ডির জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য ইউভি সংস্পর্শ এবং অতিরিক্ত রোদে পোড়া, এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।


কখন রোদ থেকে সাবধান হবেন?

সূর্যের ইউভি সূচক ৩ বা তার বেশি হলে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ ক্ষেত্রে ছায়ায় থাকা, শরীর ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখ সুরক্ষার জন্য ইউভি-এ ও ইউভি-বি প্রতিরোধী সানগ্লাসও উপকারী।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকা ও রোদে পুড়ে যাওয়া এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য কি রোদই একমাত্র উপায়?

না। খাবার থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। চর্বিযুক্ত মাছসহ কিছু খাবারে ভিটামিন ডি থাকে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্টও ব্যবহার করা যায়।

যাদের সূর্যের সংস্পর্শ খুব কম, যারা দীর্ঘ সময় ঘরের মধ্যে থাকেন বা যাদের ভিটামিন ডির ঘাটতির ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু রোদে থাকার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

তাহলে কীভাবে রোদে থাকবেন?

রোদে থাকার ক্ষেত্রে লক্ষ্য হওয়া উচিত পর্যাপ্ত আলো পাওয়া, ত্বক পুড়িয়ে ফেলা নয়। বাইরে হাঁটা, বারান্দা বা খোলা জায়গায় কিছু সময় থাকা এবং দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে বাইরে বের হওয়া থেকে সূর্যালোক পাওয়া যেতে পারে।

তবে তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা, বিশেষ করে ত্বক লাল হয়ে যাওয়ার মতো পর্যায়ে যাওয়া, এড়িয়ে চলতে হবে। ইউভি সূচক বেশি হলে ছায়া, পোশাক ও অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করা উচিত।

সুস্থ থাকার জন্য রোদ দরকার, কিন্তু বেশি রোদ নয়। সূর্যালোক শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আবার অতিরিক্ত ইউভি রশ্মি ত্বক ও চোখের ক্ষতি করতে পারে।

তাই সবার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট ১০ বা ২০ মিনিট রোদে থাকার নিয়মের চেয়ে নিজের ত্বকের ধরন, বয়স, পোশাক, অবস্থান ও সূর্যের ইউভি সূচক বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ডির ঘাটতি নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিজের মতো করে দীর্ঘ সময় রোদে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: বিবিসি