একই কথা কি বারবার বলছেন, স্মৃতিশক্তির এই পরিবর্তন অবহেলা করবেন না

কাউকে একই প্রশ্ন বারবার করতে দেখা, কিছুক্ষণ আগের কথোপকথন ভুলে যাওয়া বা একই গল্প একাধিকবার বলা, এমন ঘটনা অনেক পরিবারেই দেখা যায়। কখনো ব্যস্ততা, মানসিক চাপ বা ঘুমের অভাবের কারণে এমন হতে পারে। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছুটা ভুলে যাওয়াও স্বাভাবিক।
তবে সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন কেউ আগের তুলনায় ঘন ঘন একই কথা বলতে থাকেন, সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে রাখতে পারেন না অথবা পরিচিত কাজ করতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মৃতিশক্তির এমন পরিবর্তন নিয়মিত ঘটছে কি না এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব পড়ছে কি না, তা খেয়াল করা জরুরি।
চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, বারবার একই প্রশ্ন করা স্মৃতিশক্তির সমস্যার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে এমন হলেই ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার রোগ হয়েছে। কারণ বুঝতে প্রয়োজন চিকিৎসকের মূল্যায়ন।
কেন বারবার একই কথা বলার প্রবণতা দেখা দেয়?
একই কথা বারবার বলার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কখনো ব্যক্তি আগের কথোপকথনটি ভুলে যান, আবার কখনো মনোযোগের অভাব, দুশ্চিন্তা বা ক্লান্তির কারণে তথ্য ঠিকভাবে মনে রাখতে পারেন না।
সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে আছে-
বয়সজনিত স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া: বয়স বাড়ার সঙ্গে নতুন তথ্য মনে রাখতে বা পরিচিত কোনো নাম মনে করতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। কখনো চাবি কোথায় রেখেছেন বা কারও নাম কী, তা মনে করতে দেরি হতে পারে। পরে আবার মনে পড়লে এবং দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পারলে তা সব সময় গুরুতর সমস্যার লক্ষণ নয়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্নতা মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত চিন্তা থাকলে কথোপকথনের তথ্য ঠিকভাবে মনে না-ও থাকতে পারে।
ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ ধরে রাখা এবং নতুন তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও শারীরিক সমস্যা: কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি এবং কিছু অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণেও স্মৃতির সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মূল কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন বারবার একই কথা বলা উদ্বেগের কারণ?
একই কথা পুনরাবৃত্তি করার পাশাপাশি আরও কিছু পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে আগে এমন অভ্যাস না থাকলেও নতুন করে শুরু হলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেসব লক্ষণ খেয়াল করবেন-
- কিছুক্ষণ আগের কথোপকথন বারবার ভুলে যাওয়া।
- একই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরও বারবার সেই প্রশ্ন করা।
- পরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ চিনতে সমস্যা হওয়া।
- দৈনন্দিন পরিচিত কাজ, যেমন রান্নার ধাপ বা নিয়মিত কাজের ক্রম ভুলে যাওয়া।
- পরিচিত জিনিসের নাম মনে করতে বা সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হওয়া।
- টাকা-পয়সার হিসাব রাখা, বিল দেওয়া বা পরিচিত কাজ পরিকল্পনা করতে সমস্যা হওয়া।
- আচরণ, মেজাজ বা ব্যক্তিত্বে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
এসব লক্ষণ একসঙ্গে থাকতেই হবে এমন নয়। আবার এগুলোর কোনো একটি দেখা গেলেই ডিমেনশিয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। তবে স্মৃতির পরিবর্তন যদি ক্রমশ বাড়ে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
বারবার একই কথা বলা কি আলঝেইমারের লক্ষণ?
বারবার একই প্রশ্ন করা বা একই ঘটনা পুনরায় বলা আলঝেইমার রোগসহ কিছু ধরনের ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। আলঝেইমার এমন একটি রোগ, যা মস্তিষ্কের কোষ ও তাদের কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
কেউ যদি কিছুক্ষণ আগের কথোপকথন মনে রাখতে না পারেন, একই প্রশ্ন বারবার করেন কিংবা পরিচিত কাজেও ক্রমশ অসুবিধায় পড়েন, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন।
তবে শুধু পুনরাবৃত্তি দেখে আলঝেইমার শনাক্ত করা যায় না। স্মৃতিশক্তির সমস্যা অন্য অনেক কারণেও হতে পারে। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।
স্মৃতিশক্তির সমস্যা হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিজের বা পরিবারের কারও স্মৃতিশক্তিতে আগের তুলনায় স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। বিশেষ করে ভুলে যাওয়ার সমস্যা যদি বারবার ঘটে, ক্রমশ বাড়ে অথবা কাজকর্ম, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবন ব্যাহত করে, তাহলে দেরি করা ঠিক নয়।
চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ, কত দিন ধরে সমস্যা হচ্ছে, কী কী ওষুধ সেবন করছেন এবং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না, তা জানতে চাইতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী স্মৃতি ও চিন্তাশক্তির মূল্যায়ন, রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় পরিবারের কোনো সদস্যকে সঙ্গে নেওয়া উপকারী হতে পারে। কারণ রোগীর আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা কাছের মানুষ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তির সমস্যার পেছনে চিকিৎসাযোগ্য কারণ পাওয়া যায়।
জরুরি সতর্কতা: হঠাৎ করে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা, তীব্র বিভ্রান্তি বা কথা বলতে সমস্যা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন। বিশেষ করে মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকতে পারে।
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে কী করবেন?
স্মৃতিশক্তির পরিবর্তনের সব কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে মস্তিষ্ক ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যত্নে কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখুন এবং দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: বয়স ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
সুষম খাবার খান: শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায়।
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখুন: বই পড়া, নতুন কিছু শেখা, ধাঁধা সমাধান কিংবা পছন্দের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে সময় দিতে পারেন।
মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যার যথাযথ চিকিৎসা নিন।
ওষুধের বিষয়ে সতর্ক থাকুন: কোনো ওষুধ খাওয়ার পর স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসককে জানান। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করবেন না।
এসব অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। তবে এগুলো ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয় না।
মাঝেমধ্যে কোনো কথা ভুলে যাওয়া বা একই প্রশ্ন করে ফেলা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কেউ যদি আগের তুলনায় নিয়মিত একই কথা বলতে থাকেন, সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলে যান কিংবা পরিচিত কাজেও অসুবিধায় পড়েন, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
সব ভুলে যাওয়ার পেছনে ডিমেনশিয়া থাকে না। ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা কিছু শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। তাই অনুমান করে ভয় না পেয়ে লক্ষণগুলোর ধরন ও পরিবর্তন খেয়াল করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াতে ‘Repeating yourself lately? Why a neurologist says to watch the pattern’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।

-8d0460.jpg)