খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে কম খাওয়া কতটা জরুরি

রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে অনেকেই প্রথমে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন। কেউ কেউ আবার দ্রুত ওজন কমানোর আশায় না খেয়ে থাকেন। ধারণাটি সহজ, কম খাব মানেই হয়তো শরীরে কম কোলেস্টেরল ঢুকবে। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে শুধু কতটা খাওয়া হচ্ছে তা নয়, কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এলডিএল (LDL) বা খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট কমানো এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোলেস্টেরল কমানোর জন্য না খেয়ে থাকা নয়, বরং খাবারের ধরন ও মানে পরিবর্তন আনা বেশি কার্যকর।
কোলেস্টেরল আসলে কী?
কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এক ধরনের মোমজাতীয় পদার্থ। কোষ তৈরি, কিছু হরমোন তৈরি এবং শরীরের বিভিন্ন কাজে এটি প্রয়োজন হয়। শরীরের বড় একটি অংশের কোলেস্টেরল নিজেই তৈরি করে, বিশেষ করে লিভার। খাবার থেকেও কিছু কোলেস্টেরল পাওয়া যায়।
রক্তে কোলেস্টেরল পরিবহনের ক্ষেত্রে এলডিএল ও এইচডিএল (HDL) নিয়ে বেশি আলোচনা হয়।
এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল: রক্তে এলডিএল বেশি থাকলে ধমনির দেয়ালে প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল: এইচডিএল শরীরের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল লিভারে ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করে। তবে শুধু HDL বাড়ানোই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য নয়। বর্তমানে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এলডিএল নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কম খেলেই কি এলডিএল কমবে?
সব সময় নয়।
খাবারের মোট পরিমাণ কমালে শরীরের ওজন কমতে পারে, বিশেষ করে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ক্ষেত্রে। স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো রক্তের কিছু লিপিডের মাত্রা উন্নত করতেও সাহায্য করতে পারে। কিন্তু শুধু খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলেই এলডিএল কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ধরা যাক, কেউ ভাত বা রুটির পরিমাণ কমালেন, কিন্তু একই সঙ্গে ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া, প্রসেসড খাবার বা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার খেতে থাকলেন। সেক্ষেত্রে শুধু খাবারের পরিমাণ কমানো এলডিএল নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক নির্দেশনায়ও মোট খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি খাবারের গুণগত মানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, মাছ ও স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এলডিএল কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন ফ্যাট?
স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কমানো এলডিএল কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ক্রিম, পূর্ণচর্বিযুক্ত কিছু দুগ্ধজাত খাবার, নারকেল ও পাম তেলসহ বিভিন্ন খাবারে। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের এলডিএল বাড়াতে পারে।
তাই খাবার একেবারে কমিয়ে দেওয়ার বদলে কিছু খাবারের স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া বেশি কার্যকর। যেমন চর্বিযুক্ত মাংসের বদলে মাছ বা চর্বি কম থাকা মাংস, আর স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বদলে অসম্পৃক্ত ফ্যাটের উৎস বেছে নেওয়া যায়।
ট্রান্স ফ্যাট থেকেও দূরে থাকুন
ট্রান্স ফ্যাট হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কিছু প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার এবং নির্দিষ্ট ধরনের বেকারি বা ভাজা খাবারে এটি থাকতে পারে।
তাই বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, কিছু ফাস্টফুড এবং বারবার ব্যবহার করা তেলে ভাজা খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো। খাবারের প্যাকেটের লেবেলে partially hydrogenated oil বা আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল লেখা আছে কি না, সেটিও দেখা যেতে পারে।
দ্রবণীয় আঁশ এলডিএল কমাতে সাহায্য করতে পারে
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খাবারের আঁশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে soluble fiber বা দ্রবণীয় আঁশ এলডিএল কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ওটস, বার্লি, ডাল, মটরশুঁটি, বিভিন্ন শিমজাতীয় খাবার, আপেল, পেয়ারা ও সাইট্রাসজাতীয় ফলে দ্রবণীয় আঁশ পাওয়া যায়। নিয়মিত এসব খাবার খাদ্যতালিকায় রাখলে সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হয়।
বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রেও এর ভালো সুযোগ রয়েছে। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, বিভিন্ন শাকসবজি, পেয়ারা এবং অন্যান্য ফল নিয়মিত খাবারে রাখা যেতে পারে।
এইচডিএল বাড়াতে কী করবেন?
এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল নিয়ে অনেকেরই আলাদা করে চিন্তা থাকে। তবে শুধু কোনো একটি খাবার খেয়ে এইচডিএল বাড়ানোর চেষ্টা করার চেয়ে সামগ্রিক জীবনযাপন ঠিক করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এইচডিএলের মাত্রা ও সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্য মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম নিয়মিত করা উপকারী।
ধূমপান এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের দিকেও নজর দিতে হবে।
তবে এইচডিএল বাড়ানোর জন্য মদ্যপান শুরু করা উচিত নয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও যারা অ্যালকোহল পান করেন না, তাদের শুধু হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য এটি শুরু না করার পরামর্শ দেয়।
মাছ, বাদাম ও বীজ রাখুন খাবারে
মাছ, বাদাম, বীজ এবং উদ্ভিজ্জ তেলে থাকা অসম্পৃক্ত ফ্যাট হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। এগুলো স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা বিশেষভাবে উপকারী।
বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসে ইলিশ, রুই, কাতলা, কই বা অন্যান্য মাছ রাখা সহজ। তবে মাছ কীভাবে রান্না করা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেলে ভাজা মাছের বদলে ঝোল, ভাপা বা কম তেলে রান্না করা মাছ বেছে নেওয়া ভালো।
বাদাম ও বীজও পরিমিত পরিমাণে খাবারে রাখা যায়। তবে এগুলো বেশি খেলে ক্যালরি গ্রহণও বেড়ে যেতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
ভাত কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
না। এলডিএল বেশি হলেই ভাত বা কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং মোট খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভব হলে পরিশোধিত শস্যের পাশাপাশি লাল চাল, আটার রুটি, ওটস বা অন্যান্য পূর্ণ শস্য খাবারে রাখা যেতে পারে। পূর্ণ শস্যে আঁশ বেশি থাকে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল, মাছ বা চর্বি কম থাকা প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে।
ওজন কমানো কি এলডিএল কমাতে সাহায্য করে?
অতিরিক্ত ওজন থাকলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য না খেয়ে থাকা বা অত্যন্ত কম ক্যালরির ডায়েট অনুসরণ করা ভালো পদ্ধতি নয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি টেকসই।
অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত কম খাওয়া নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক ধরনের খাবার খাওয়া।
কোলেস্টেরল কমাতে দৈনন্দিন খাবারে কী রাখবেন?
সহজভাবে খাবারের তালিকাটি এমন হতে পারে-
- মসুর, মুগ, ছোলা ও অন্যান্য ডাল
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- পেয়ারা, আপেলসহ আঁশসমৃদ্ধ পুরো ফল
- ওটস ও অন্যান্য পূর্ণ শস্য
- মাছ
- পরিমিত বাদাম ও বীজ
- অসম্পৃক্ত ফ্যাটসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ তেল
- চর্বি কম থাকা প্রোটিনের উৎস
একই সঙ্গে কমাতে হবে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার।
শুধু খাবার দিয়ে কি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত হতে পারে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয়।
পারিবারিকভাবে উচ্চ কোলেস্টেরল থাকার প্রবণতা, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদ্রোগের ইতিহাস বা খুব বেশি এলডিএল থাকলে চিকিৎসক ওষুধের পরামর্শ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে শুধু খাবার পরিবর্তন করে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করে এলডিএল, এইচডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা জানা যায়। ফলাফল দেখে চিকিৎসক ব্যক্তির সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে পারেন।
খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো না খেয়ে থাকা নয়। বরং খাবারের মান পরিবর্তন করা, অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমানো, আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোলেস্টেরল বেড়েছে শুনে হঠাৎ খাবারের পরিমাণ অর্ধেক করে দেওয়া বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা উচিত নয়। সুষম খাবার খেয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করাই ভালো পদ্ধতি। আর রক্তে এলডিএল বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে ওষুধের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা



