উদ্বেগজনিত সমস্যায় বিশ্বে ৪৭ কোটি মানুষ আক্রান্ত, যে লক্ষণগুলো জানা জরুরি

পরীক্ষার সময়, চাকরির সাক্ষাৎকারে আগে বা জীবনের বড় কোনো পরিবর্তনের সময় দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই যদি বারবার ভয় লাগা, ছোটখাটো বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত চিন্তা হওয়া বা দুশ্চিন্তার কারণে ঘুম, কাজ ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৭ কোটি মানুষ উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ মানসিক ব্যাধি হিসেবে উদ্বেগজনিত সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। অথচ এ সমস্যায় আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন চিকিৎসা পান বলে ডব্লিউএইচওর দাবি।
সম্প্রতি এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনে উদ্বেগজনিত সমস্যার বিভিন্ন ধরন, সতর্কসংকেত এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে তে হবে, দুশ্চিন্তা হলেই কারও মানসিক রোগ হয়েছে, এমন নয়। উদ্বেগ কতটা তীব্র, কত দিন ধরে চলছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা কী?
উদ্বেগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগেরই একটি অংশ। বিপদ, অনিশ্চয়তা বা কোনো বিষয়ে চাপের পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়াটা অনেকের জন্যই স্বাভাবিক। সাধারণত পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এই অনুভূতিও ধীরে ধীরে কমে আসে।
কিন্তু উদ্বেগ যখন অতিরিক্ত পরিমাণে হয় ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং কাজকর্ম, পড়াশোনা, ঘুম বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে বাধা সৃষ্টি করে, তখন এটি উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যায় শুধু মনেই অস্বস্তি হয় না, শরীরেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, পেশিতে টান, পেটের অস্বস্তি অথবা ঘুমের সমস্যা।
উদ্বেগজনিত সমস্যা হলে সাধারণত যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়, চলুন জেনে নিই।
ছোট বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
কাজ, পরিবার, অর্থ, স্বাস্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে সবারই কিছু না কিছু চিন্তা থাকে। কিন্তু উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগলে একজন মানুষ একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করতে পারেন। সমস্যা সমাধান হয়ে যাওয়ার পরও দুশ্চিন্তা কমতে চায় না।
কী হতে পারে, কী ভুল হবে কিংবা সামনে খারাপ কিছু ঘটবে কি না, এমন ভাবনা বারবার মাথায় ঘুরতে পারে।
মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে কোনো কাজে মন বসানো কঠিন হতে পারে। পড়াশোনা, অফিসের কাজ কিংবা দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মন বারবার অন্যদিকে চলে যেতে পারে।
কোনো তথ্য মনে রাখা বা একটি কাজ শেষ করতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
অস্থিরতা ও বিরক্তি বেড়ে যাওয়া
উদ্বেগের কারণে অনেকের মনে সারাক্ষণ অস্থিরতা কাজ করে। বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও স্বস্তি পাওয়া যায় না। সামান্য বিষয়েও বিরক্তি তৈরি হতে পারে, অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় ধৈর্য কমে যেতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তার কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও ঘাম হওয়া
উদ্বেগের সময় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে পারে। কারও হাত কাঁপে, ঘাম হয়, পেশিতে টান পড়ে কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
কখনো হঠাৎ তীব্র ভয়, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা ও শ্বাস নিতে অসুবিধার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। এগুলো প্যানিক অ্যাটাকের অংশ হতে পারে। তবে একই লক্ষণ হৃদ্যন্ত্র বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই নতুন বা তীব্র উপসর্গকে শুধু উদ্বেগ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ঘুমের সমস্যা
দুশ্চিন্তা বেশি হলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। ঘুম ভেঙে যেতে পারে বারবার, কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠেও ক্লান্ত লাগতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি আবার মনোযোগ, মেজাজ ও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এভাবে উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যা একে অপরকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা
কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলা, সবার সামনে বক্তব্য দেওয়া কিংবা অন্যের সামনে কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভয় লাগতে পারে।
বিশেষ করে অন্যরা কী ভাববে, ভুল করলে লজ্জায় পড়তে হবে কি না বা কেউ বিচার করবে কি না, এমন আশঙ্কা থেকে কেউ সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে পারেন। এই ভয় যদি দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে।
সব সময় খারাপ কিছু ঘটবে বলে মনে হওয়া
কোনো স্পষ্ট বিপদ না থাকলেও মনে হতে পারে যে সামনে ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকার পরও নিরাপদ বোধ করতে সমস্যা হতে পারে।
এ ধরনের অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন করে তুলতে পারে।
উদ্বেগজনিত সমস্যার বিভিন্ন ধরন
উদ্বেগজনিত সমস্যা এক রকম নয়। এর কয়েকটি পরিচিত ধরন হলো-
সাধারণীকৃত উদ্বেগজনিত সমস্যা: পরিবার, অর্থ, স্বাস্থ্য, কাজ কিংবা ভবিষ্যতের নানা বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা হয়।
প্যানিক ডিসঅর্ডার: বারবার হঠাৎ তীব্র ভয় বা আতঙ্কের পর্ব দেখা দেয়। এর সঙ্গে বুক ধড়ফড়, ঘাম, মাথা ঘোরা কিংবা শ্বাসকষ্টের অনুভূতি থাকতে পারে।
সামাজিক উদ্বেগজনিত সমস্যা: অন্যের সামনে বিব্রত হওয়া, সমালোচিত হওয়া বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এতটাই বেড়ে যায় যে সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার প্রবণতা তৈরি হয়।
নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত ভয়: উচ্চতা, পোকামাকড়, উড়োজাহাজে ভ্রমণ বা নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ভয় থাকতে পারে।
বিচ্ছেদজনিত উদ্বেগ: কাছের মানুষ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয় অতিরিক্ত হয়ে পড়ে। এটি শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও হতে পারে।
অ্যাগোরাফোবিয়া: এমন জায়গা বা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ভয় তৈরি হয়, যেখানে আতঙ্কিত হলে বেরিয়ে আসা বা সাহায্য পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে হয়।
মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তির একাধিক ধরনের উদ্বেগজনিত সমস্যাও একসঙ্গে থাকতে পারে। কোন ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
উদ্বেগ কেন হয়?
উদ্বেগজনিত সমস্যার পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ থাকে না। মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্ভাব্য কারণ ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে-
- দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ বা অনিশ্চয়তা।
- নির্যাতন, বড় ধরনের ক্ষতি কিংবা অন্য কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতা।
- পরিবারে উদ্বেগজনিত সমস্যার ইতিহাস।
- দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা।
- ঘুমের অনিয়ম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব।
- মদ্যপান বা কিছু মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, যা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
তবে এসব কারণের কোনোটি থাকলেই যে উদ্বেগজনিত রোগ হবে, তা নয়। ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি আলাদা হতে পারে।
উদ্বেগ কমাতে কী করবেন?
দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস উদ্বেগ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সমস্যা গুরুতর হলে এগুলো পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়।
ধীরে শ্বাস নিন: উদ্বিগ্ন লাগলে আরাম করে বসে ধীরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ছাড়ুন। জোর করে গভীর শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে শরীরের অস্থিরতা কিছুটা কমতে পারে।
নিয়মিত হাঁটুন: প্রতিদিন সামান্য সময় হাঁটা বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শারীরিক পরিশ্রম মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করতে পারে।
ঘুমের রুটিন ঠিক রাখুন: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ঘুমের আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন।
বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দিন: কয়েক মিনিট নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস, চারপাশের শব্দ কিংবা বর্তমান কাজের দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত অনুশীলনে কারও কারও উপকার হয়।
বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলুন: দুশ্চিন্তা একা সামলানোর চেষ্টা না করে পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিতে পারেন।
অ্যালকোহল ও মাদক এড়িয়ে চলুন: এসব উপাদান উদ্বেগ বাড়াতে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি?
দুশ্চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় কিংবা কাজ, পড়াশোনা, ঘুম ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
উদ্বেগজনিত সমস্যার কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা সিবিটি এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাপদ্ধতি, যা চিন্তার ধরন ও আচরণ বুঝতে এবং উদ্বেগ সামলানোর কৌশল শিখতে সাহায্য করে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধও দিতে পারেন। নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
যদি নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসে বা নিজেকে নিরাপদ রাখা কঠিন মনে হয়, তাহলে অবিলম্বে বিশ্বস্ত কারও সহায়তা নিন এবং নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সাহায্য নিন।
উদ্বেগ জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতি হলেও তা যখন অতিরিক্ত, দীর্ঘস্থায়ী এবং দৈনন্দিন জীবনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার মাধ্যমে অনেকেই উপকার পান।
নিজের বা কাছের কারও মধ্যে উদ্বেগের লক্ষণ দেখলে দোষারোপ না করে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থাকুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি
