logo
Advertisement

মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্ত পড়া, শরীরে কোন ভিটামিনের ঘাটতির ইঙ্গিত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্ত পড়া, শরীরে কোন ভিটামিনের ঘাটতির ইঙ্গিত
আমাদের শরীর নিজে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না। ছবি : হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা

শরীর ভালো রাখতে ভিটামিন সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখা, ক্ষত সারানো এবং শরীরে কোলাজেন তৈরিতে এই ভিটামিনের ভূমিকা রয়েছে। খাবার থেকে আয়রন শোষণেও ভিটামিন সি সাহায্য করে।

Advertisement

আমাদের শরীর নিজে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না। তাই প্রতিদিনের খাবার থেকেই এই ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করতে হয়। সাধারণত ফল ও শাকসবজি নিয়মিত খেলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পাওয়া সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন খাবারে এর ঘাটতি থাকলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ভিটামিন সি কমে গেলে কী হয়?

ভিটামিন সি খুব কম পাওয়া গেলে স্কার্ভি নামের একটি রোগ হতে পারে। বর্তমানে এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও দীর্ঘদিন খুব কম পরিমাণে ভিটামিন সি গ্রহণ করলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রথম দিকে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও মাড়িতে প্রদাহের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ঘাটতি বাড়লে মাড়ি ফুলে যাওয়া বা রক্ত পড়া, ক্ষত সারতে দেরি হওয়া, সহজে কালশিটে পড়া এবং জয়েন্টে ব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্ত পড়া: ভিটামিন সি ঘাটতির পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো মাড়ির সমস্যা। দাঁত ব্রাশ করার সময় বারবার মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে পড়া দেখা দিতে পারে।

তবে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়লেই যে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি হয়েছে, তা নয়। মাড়ির রোগ, দাঁতে প্লাক জমা বা অন্যান্য কারণেও এমন হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সামান্য আঘাতেই কালশিটে: ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোলাজেন শরীরের বিভিন্ন টিস্যু ও রক্তনালির গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

ভিটামিন সি-এর গুরুতর ঘাটতি হলে ছোট রক্তনালিগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে সামান্য আঘাতেও ত্বকের নিচে ছোট লাল, বেগুনি বা কালচে দাগ দেখা দিতে পারে।

ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া: কেটে যাওয়া বা আঘাতের পর শরীরের ক্ষত সারাতে কোলাজেন প্রয়োজন। ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।

তাই দীর্ঘদিন ভিটামিন সি-এর গুরুতর ঘাটতি থাকলে ক্ষত স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরে সারতে পারে। বারবার এমন হলে শুধু ভিটামিনের ঘাটতি ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা: ভিটামিন সি-এর ঘাটতির শুরুর দিকের লক্ষণের মধ্যে ক্লান্তি ও দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে এই দুই উপসর্গ খুব সাধারণ এবং ঘুমের অভাব, রক্তস্বল্পতা, মানসিক চাপ বা বিভিন্ন অসুস্থতার কারণেও হতে পারে।

তাই শুধু ক্লান্ত লাগছে বলেই শরীরে ভিটামিন সি কমে গেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে: গুরুতর ভিটামিন সি ঘাটতিতে জয়েন্টে ব্যথা ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। শরীরে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে জয়েন্টে ব্যথার অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। তাই এই একটি লক্ষণ দিয়ে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

রক্তস্বল্পতাও দেখা দিতে পারে: শরীর উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণ করতে ভিটামিন সি সাহায্য করে। তাই ভিটামিন সি-এর ঘাটতি হলে আয়রন শোষণের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

গুরুতর ঘাটতির ক্ষেত্রে রক্তপাতের সঙ্গে আয়রন শোষণ কমে যাওয়াও রক্তস্বল্পতার একটি কারণ হতে পারে। ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি বা অবসাদের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কারা ভিটামিন সি-এর ঘাটতির ঝুঁকিতে?

সুষম খাবার না খেলে ভিটামিন সি-এর ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যাঁদের খাবারের তালিকায় ফল ও সবজির পরিমাণ খুব কম, তাঁদের সতর্ক হওয়া দরকার।

ধূমপায়ীদের শরীরে ভিটামিন সি-এর প্রয়োজনও তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া খাবার শোষণে সমস্যা হয় এমন কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, নির্দিষ্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাঁদের খাদ্যতালিকা খুব সীমিত, তাঁদেরও ঘাটতির ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

প্রতিদিন কতটা ভিটামিন সি প্রয়োজন?

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর প্রায় ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় প্রয়োজন কিছুটা বেশি হয়।

ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে সাধারণ চাহিদার সঙ্গে আরও ৩৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো রোগ বা বিশেষ শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কোন খাবারে ভিটামিন সি বেশি?

ভিটামিন সি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত ফল ও শাকসবজি খাওয়া। প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি রাখলে সাধারণত প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পাওয়া সম্ভব।

ছবি : টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি : টাইমস অব ইন্ডিয়া

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ কিছু খাবার হলো আমলকী, পেয়ারা, কমলালেবু, লেবু, জাম্বুরা, কিউই, স্ট্রবেরি, কাঁচা মরিচ, ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি ও আলুঅ

এ ছাড়া আরও অনেক ফল ও সবজিতে ভিটামিন সি থাকে।

রান্নায় ভিটামিন সি কমে যেতে পারে

ভিটামিন সি তাপের প্রতি সংবেদনশীল। তাই খাবার দীর্ঘ সময় ধরে বেশি তাপে রান্না করলে এর পরিমাণ কমে যেতে পারে।

ফল সাধারণত কাঁচা খাওয়া যায়। সবজি রান্নার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সময় ধরে সেদ্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করলে ভিটামিন সি-এর ক্ষতি তুলনামূলক কম হতে পারে। বাষ্পে রান্না বা মাইক্রোওয়েভে রান্না করার ক্ষেত্রে কিছু পুষ্টি ক্ষয় কম হতে পারে বলেও তথ্য রয়েছে।

ভিটামিন সি-এর ট্যাবলেট কি সবার প্রয়োজন?

শুধু সুস্থ থাকার জন্য সবার ভিটামিন সি-এর ট্যাবলেট খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বেশির ভাগ মানুষ বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার থেকেই প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পেতে পারেন।

খাবারে ঘাটতি থাকলে বা কোনো নির্দিষ্ট কারণে শরীরে ভিটামিন সি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাও ঠিক নয়। বেশি পরিমাণে সাপ্লিমেন্ট নিলে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব ও পেটের অস্বস্তির মতো সমস্যা হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাড়ি থেকে বারবার রক্ত পড়া, অস্বাভাবিকভাবে কালশিটে পড়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, দীর্ঘদিন দুর্বলতা থাকা বা জয়েন্টে ব্যথার মতো একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এসব লক্ষণ থাকলেই ভিটামিন সি-এর ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা ও রক্ত পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।

ভিটামিন সি-এর ঘাটতি বর্তমানে খুব সাধারণ সমস্যা না হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। বিশেষ করে যাঁদের খাবারে ফল ও সবজির পরিমাণ খুব কম, তাঁদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, সহজে কালশিটে পড়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা ভালো। তবে এসব লক্ষণ দেখে নিজে নিজে ভিটামিনের ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

প্রতিদিনের খাবারে পেয়ারা, আমলকী, লেবু, কমলালেবু, কাঁচা মরিচ, টমেটো ও বিভিন্ন সবজি রাখুন। বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবারই শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা