logo
Advertisement

হার্টের ক্যালসিয়াম স্ক্যান কাদের এবং কখন করা প্রয়োজন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হার্টের ক্যালসিয়াম স্ক্যান কাদের এবং কখন করা প্রয়োজন
ছবি: এনডিটিভি

হার্টের অসুখ সবসময় লক্ষণ দিয়ে শুরু হয় না। অনেকের শরীরে হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনিতে ধীরে ধীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমলেও বাইরে থেকে কোনো সমস্যা বোঝা যায় না। সময়ের সঙ্গে এই প্লাক শক্ত হয়ে সেখানে ক্যালসিয়াম জমতে পারে। এই ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা কিছু ক্ষেত্রে করাতে বলেন হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান বা করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম স্ক্যান।

তবে সবার জন্য এই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে যাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বা অন্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা শুরু করা উচিত কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন, তাদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা বেশি কাজে লাগতে পারে।

হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান কী

হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান এক ধরনের বিশেষ সিটি (CT) স্ক্যান। এতে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনিগুলোতে ক্যালসিয়াম জমেছে কি না, তা দেখা হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায় করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম বা CAC স্কোর।

করোনারি ধমনিতে ক্যালসিয়াম সাধারণত অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্লাকের উপস্থিতির একটি চিহ্ন। অর্থাৎ ধমনির দেয়ালে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে যে প্লাক তৈরি হয়, তার কিছু অংশ সময়ের সঙ্গে শক্ত ও ক্যালসিয়ামযুক্ত হতে পারে।

সাধারণভাবে CAC স্কোর যত বেশি হয়, ধমনিতে ক্যালসিয়ামযুক্ত প্লাকের পরিমাণ তত বেশি এবং ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও তত বেশি হতে পারে। তবে শুধু এই একটি স্কোর দেখেই কারও হৃদ্‌রোগের সম্পূর্ণ ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। বয়স, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ধূমপানের অভ্যাস এবং পরিবারের হৃদ্‌রোগের ইতিহাসও বিবেচনা করতে হয়।

সবার কি এই পরীক্ষা করা দরকার

না। হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যানকে সুস্থ সব মানুষের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয় না।

বিশেষ করে খুব কম বয়সী এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত এই পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। আবার কারও করোনারি আর্টারি ডিজিজ আগে থেকেই জানা থাকলে, অতীতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে অথবা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট কিংবা বাইপাস সার্জারি হয়ে থাকলে CAC স্ক্যান থেকে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে, কারও বয়স ৪০, ৫০ বা ৬০-এর মধ্যে, কোলেস্টেরল কিছুটা বেশি, রক্তচাপ সীমার কাছাকাছি বেশি অথবা পরিবারের অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস রয়েছে, কিন্তু তার সামগ্রিক ঝুঁকি কতটা তা স্পষ্ট নয়, এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসক CAC স্ক্যান বিবেচনা করতে পারেন।

কাদের ক্ষেত্রে CAC স্ক্যান বেশি কাজে লাগতে পারে

২০২৬ সালের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের হালনাগাদ ডিসলিপিডেমিয়া নির্দেশনায় নির্বাচিত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে CAC স্ক্যান ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষ এবং ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে হৃদ্‌রোগের ১০ বছরের ঝুঁকি সীমান্তবর্তী বা মাঝারি পর্যায়ে থাকলে এবং স্ক্যানের ফল কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ শুরু করা উচিত কি না, সেই সিদ্ধান্তে সাহায্য করতে পারে, তখন এই পরীক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে।

অর্থাৎ শুধু বয়স হলেই CAC স্ক্যান করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, পরীক্ষার ফল চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে কি না। এ কারণে চিকিৎসক সাধারণত আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করেন-

  • রক্তে LDL ও অন্যান্য কোলেস্টেরলের মাত্রা
  • রক্তচাপ
  • রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস
  • ধূমপানের অভ্যাস
  • শরীরের ওজন
  • পরিবারের অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস
  • বয়স ও অন্যান্য হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি

এই তথ্যগুলো মিলিয়ে ঝুঁকি হিসাব করার পরও যদি সিদ্ধান্ত পরিষ্কার না হয়, তখন CAC স্ক্যান অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে।

CAC স্কোর শূন্য হলে কি হার্ট পুরোপুরি সুস্থ

CAC স্কোর শূন্য হলে সাধারণত সেটি আশ্বস্ত হওয়ার মতো ফল। এর অর্থ পরীক্ষায় করোনারি ধমনিতে শনাক্তযোগ্য ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়নি।

তবে শূন্য স্কোর মানেই হৃদ্‌রোগের কোনো ঝুঁকি নেই, এমনটা বলা ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের প্লাকে ক্যালসিয়াম থাকে না। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের বা নন-ক্যালসিফায়েড প্লাক এই পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে।

এ ছাড়া শূন্য স্কোর সারাজীবনের জন্য হৃদ্‌রোগ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তাও দেয় না। বয়স, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই রিপোর্টে শূন্য দেখে নিজের অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়।

CAC স্কোর বেশি হলে কী বোঝায়

উচ্চ CAC স্কোর সাধারণত করোনারি ধমনিতে বেশি পরিমাণ ক্যালসিয়ামযুক্ত প্লাক থাকার ইঙ্গিত দেয়। এর সঙ্গে ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যার বেশি ঝুঁকিও সম্পর্কিত।

তবে উচ্চ স্কোরের অর্থ এই নয় যে শিগগিরই হার্ট অ্যাটাক হবে। বরং এটি চিকিৎসকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তখন কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং জীবনযাপনের অন্যান্য ঝুঁকি আরও গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ CAC স্ক্যানের উদ্দেশ্য শুধু একটি সংখ্যা জানা নয়। সেই সংখ্যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান কীভাবে করা হয়

CAC স্ক্যান সাধারণত দ্রুত ও তুলনামূলক সহজ একটি পরীক্ষা। এতে CT প্রযুক্তি ব্যবহার করে হৃদ্‌যন্ত্রের করোনারি ধমনিগুলোর ছবি নেওয়া হয়।

সাধারণ CAC স্ক্যানে সাধারণত কনট্রাস্ট ডাই বা ইনজেকশন প্রয়োজন হয় না। বুকের সঙ্গে কিছু ইলেকট্রোড লাগিয়ে হৃদ্‌স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে, যাতে পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। স্ক্যানের সময় অল্প সময়ের জন্য শ্বাস ধরে রাখতে বলা হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো CT স্ক্যান সাধারণত প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। এতে অল্প মাত্রার রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়। তাই প্রয়োজন না থাকলে শুধু কৌতূহল থেকে এই পরীক্ষা করানো উচিত নয়।

বুকে ব্যথা হলে কি CAC স্ক্যান করাবেন

না। বুকে ব্যথা, বুকের চাপ বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে CAC স্ক্যান করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কারণ CAC স্ক্যান মূলত উপসর্গহীন মানুষের হৃদ্‌রোগের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়। এটি হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে কি না, তা জরুরি মুহূর্তে নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়।

এ ধরনের উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

শুধু CAC স্কোর দিয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বোঝা যায় না

হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে, কিন্তু এটিকে কখনোই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

একজন মানুষের সামগ্রিক ঝুঁকি বুঝতে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ওজন, ধূমপান এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসকেরা এসব তথ্যের সঙ্গে CAC স্কোর মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান নির্দেশনাতেও CAC স্ক্যানকে নির্বাচিত মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়নের একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে, বিশেষ করে যখন প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিষ্কার নয়।

তাহলে কখন চিকিৎসকের সঙ্গে CAC স্ক্যান নিয়ে কথা বলবেন

আপনার বয়স, কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস বা পারিবারিক ইতিহাসের কারণে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি থাকতে পারে, কিন্তু কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বা আরও আক্রমণাত্মক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত কি না তা নিয়ে যদি চিকিৎসকের সঙ্গে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়, তখন CAC স্ক্যান নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

তবে নিজের ইচ্ছায় পরীক্ষা করানোর বদলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাই ভালো। কারণ একই CAC স্কোর ভিন্ন বয়স ও ভিন্ন ঝুঁকির মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হার্টের স্বাস্থ্য বুঝতে শুধু একটি স্ক্যানের ওপর নির্ভর করা যাবে না। নিয়মিত রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।

হার্ট ক্যালসিয়াম স্ক্যান আধুনিক হৃদ্‌রোগ ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি কার্যকর পরীক্ষা হতে পারে, কিন্তু এটি সবার জন্য নয়। যাদের ঝুঁকি কম, তাদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। আবার যাদের হৃদ্‌রোগ আগে থেকেই নিশ্চিত, তাদের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষার অতিরিক্ত উপকার সীমিত হতে পারে।

পরীক্ষাটির সবচেয়ে বড় ব্যবহার হতে পারে মাঝামাঝি ঝুঁকির সেই মানুষদের ক্ষেত্রে, যাদের ভবিষ্যৎ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং CAC স্কোর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

তাই হার্টের ক্যালসিয়াম স্ক্যান করাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত বয়স বা ভয় থেকে নয়, বরং ব্যক্তিগত হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি এবং চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: এনডিটিভি