হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছে, থাকতে পারে যে ভিটামিনের ঘাটতি

হাঁটুতে ব্যথা হলে অনেকেই বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত হাঁটাচলা কিংবা বাতের সমস্যাকে দায়ী করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিও হাড় ও পেশিতে ব্যথা তৈরি করতে পারে। এই ভিটামিন শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ এবং হাড়ের স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে হাড় দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পেশিতে ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
তবে হাঁটুতে ব্যথা হলেই শরীরে ভিটামিন ডি কমে গেছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস, আঘাত, অতিরিক্ত চাপ, টেন্ডন বা লিগামেন্টের সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক কারণেও হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে। তাই ব্যথার প্রকৃত কারণ জানা জরুরি।
ভিটামিন ডি কেন শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, যা শরীরকে খাবার থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি একসঙ্গে হাড়ের শক্তি এবং স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও ভিটামিন ডি প্রয়োজন।
শরীরে দীর্ঘদিন এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে অস্টিওম্যালেশিয়া নামের একটি সমস্যা হতে পারে। এতে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায় এবং হাড়ে ব্যথা দেখা দিতে পারে। পেশির দুর্বলতা ও ব্যথাও হতে পারে। তবে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ তৈরি করে না।
ভিটামিন ডি-এর অভাবে হাঁটুতে ব্যথা হয় কেন?
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি কয়েকভাবে হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। এর ঘাটতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর ঘাটতির কারণে হাড়ে ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের ব্যথা শুধু হাঁটুতে সীমাবদ্ধ না থেকে শরীরের অন্যান্য হাড়েও অনুভূত হতে পারে।
পেশির শক্তি কমে যেতে পারে
হাঁটুর চারপাশের পেশি হাঁটুর সন্ধিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে পেশির দুর্বলতা ও ব্যথা দেখা দিতে পারে। এর ফলে হাঁটাচলা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় অসুবিধা হতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ শুধু ভিটামিন ডি-এর অভাবেই হয় না। অন্য পুষ্টির ঘাটতি, পেশির সমস্যা কিংবা বিভিন্ন রোগেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
হাঁটুর ব্যথার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে
কিছু গবেষণায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সঙ্গে হাঁটুর ব্যথা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী ৭৬৯ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে মাঝারি মাত্রার ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকা ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে হাঁটুর ব্যথা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক দেখা যায়।
তবে গবেষণায় কোনো সম্পর্ক পাওয়া মানেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিই হাঁটুর ব্যথার একমাত্র কারণ, এমন নয়। হাঁটুর ব্যথা ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণার ফল সব সময় একরকম নয়।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণ কী কী?
ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কমে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে ঘাটতি বেশি হলে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে-
- হাড়ে ব্যথা বা অস্বস্তি।
- পেশিতে ব্যথা কিংবা দুর্বলতা।
- স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া।
- হাঁটাচলা বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামায় অসুবিধা।
- হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।
এসব লক্ষণ থাকলেই যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি আছে, তা না। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কারা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির ঝুঁকিতে থাকেন?
কিছু মানুষের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি। যেমন-
- যারা খুব কম সময় বাইরে কাটান বা সূর্যের আলো কম পান।
- বয়স্ক ব্যক্তি, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা কমতে পারে।
- যাদের অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা রয়েছে।
- স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তি।
- যাদের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি-এর উৎস খুব কম।
তবে এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেই ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
শীতকালে যে ভিটামিনের ঘাটতি দুর্বল করতে পারে হাড়, ভারসাম্য ঠিক রাখতে যা খাবেন
পায়ে বারবার টান-ঝিঝি ধরা ও অবশভাব, হতে পারে এই ভিটামিনের ঘাটতি
ভিটামিন ‘ডি’ কমেছে বুঝবেন কীভাবে, পরীক্ষা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট কতটা নিরাপদ
ভিটামিন-ই কমে গেলে শরীরে যে ৭ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে
পা ঝিনঝিন থেকে ভুলে যাওয়া, শরীরে যে ভিটামিন কমার ৫ লক্ষণ
কীভাবে বুঝবেন শরীরে ভিটামিন ডি কম আছে কি না?
শুধু হাঁটুর ব্যথা বা ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রক্তের ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডি (25-hydroxyvitamin D) পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সবার জন্য নিয়মিত এই পরীক্ষা করা প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একমত সিদ্ধান্ত নেই। তাই হাঁটুর ব্যথা হলেই নিজে থেকে পরীক্ষা করানো বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করবেন কীভাবে?
শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য খাদ্যাভ্যাস, সূর্যের আলো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্টের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার খান
কিছু খাবারে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। যেমন-
- তৈলাক্ত মাছ, যেমন সামুদ্রিক স্যামন, টুনা ও ম্যাকারেল।
- ডিমের কুসুম।
- ভিটামিন ডি যোগ করা দুধ ও অন্যান্য খাবার।
- নির্দিষ্ট ধরনের মাশরুম।
সব খাবারে সমান পরিমাণ ভিটামিন ডি থাকে না। তাই সম্ভব হলে খাবারের পুষ্টিগুণের তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
সূর্যের আলো গ্রহণ করুন
সূর্যের আলো ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে। তবে কতক্ষণ রোদে থাকতে হবে, তা সবার জন্য এক নয়। ত্বকের ধরন, সময়, আবহাওয়া এবং অন্যান্য বিষয় এর ওপর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত রোদে থেকে ত্বকের ক্ষতি এড়ানোও জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিন
পরীক্ষায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রায় ভিটামিন ডি খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে এবং কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
হাঁটুতে ব্যথা হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
হাঁটুর ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়তে থাকলে কিংবা হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাঁটু ফুলে গেলে, লাল হয়ে গরম অনুভূত হলে, জ্বরের সঙ্গে ব্যথা দেখা দিলে অথবা হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে আঘাতের পর হাঁটুতে তীব্র ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে কিংবা হাঁটু নড়াতে অসুবিধা হলে অবহেলা করবেন না। এসব লক্ষণ অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হাড় ও পেশির ব্যথার একটি সম্ভাব্য কারণ। তবে হাঁটুর ব্যথা হলেই ভিটামিন ডি কম রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বয়স, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, আঘাত এবং পেশি বা লিগামেন্টের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন হাঁটুতে ব্যথা থাকলে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা, সুষম খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করাই সুস্থ থাকার ভালো উপায়।
তথ্যসূত্র
Kailash Healthcare: Can Vitamin D Deficiency Cause Knee Pain?
NIH: Vitamin D, Consumer Fact Sheet
MedlinePlus: Vitamin D Deficiency
Annals of the Rheumatic Diseases: Vitamin D deficiency and knee pain study