logo

জমির দলিলের ছোট ভুলেও হতে পারে বড় বিপদ

জমির দলিলের ছোট ভুলেও হতে পারে বড় বিপদ
জমির নমুনা দলিল। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেকের মনেই প্রথমে আসে দাম, জায়গা আর রেজিস্ট্রির হিসাব। কিন্তু কাগজে স্বাক্ষর করার পরও যে গল্পের শেষ হয় না, বরং সেখান থেকেই শুরু হতে পারে মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন। একটি দলিলের ছোট্ট ভুল, পুরোনো কোনো রেকর্ডের অসঙ্গতি কিংবা একই জমি নিয়ে আগের কোনো লেনদেন ভবিষ্যতে বড় জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই জমির দলিলে কী লেখা আছে, কোন তথ্য কোথায় আছে এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই ও সংরক্ষণ করতে হয়, তা জানা জরুরি।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

দলিল বলতে কি বুঝায়?

দলিল অর্থ প্রমাণ, যুক্তি, বিবরণ। জমির ক্রেতা ও বিক্রেতা জমি অথবা জমির মূল্য হস্তান্তর কালে পারস্পরিক যে চুক্তিপত্র সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করেন ঐ চুক্তিপত্রকে দলিল বলা হয়।

দলিলের শিরোনামের প্রয়োজনীয়তা কি?

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দলিলের প্রথম পৃষ্ঠায় দলিলের শিরোনাম, প্রকৃতি সংক্রান্ত তথা উল্লেখ থাকতে হবে। দলিলটি কোন প্রকারের বা শ্রেণীর দলিল তা উল্লেখ না করা হলে দলিল কি প্রকার দলিল তা দলিল পাঠ না করে বুঝা যাবে না। দলিলটি হতে পারে সাফ কবলা দলিল, বায়নাপত্র দলিল, ইত্যাদি।

স্বত্বের প্রেক্ষাপট বর্ণনা ও ভিত্তি

দলিল দাতা কিভাবে তার বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির মালিক হলেন-তার প্রেক্ষাপট ও ভিত্তি দলিলে উল্লেখ করতে হবে। যে দলিলের মূলে বিক্রেতা মালিক হয়েছেন ঐ দলিল, ভূমির পরিমাণ ও বিষদ বর্ণনা, পূর্ব দলিলের তারিখসহ নম্বরসমূহ, পর্চা, খতিয়ান, ইত্যাদির নম্বরসমূহ বিস্তারিত ও সঠিক হতে হবে।

জমির তফসীলে কি লেখা থাকবে?

জমির খতিয়ান নং, দাগ নং, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণী, মৌজার নাম, জে. এল, নং, রেজিস্ট্রি অফিসের নাম, উপজেলা, জেলা, ইত্যাদির বর্ণনা অবশ্যই থাকবে। যদি কোন প্লট এর আংশিক বিক্রয় করা হয়, তবে বিক্রয় করা প্লটে জমির পরিমাণ, বিক্রেতার হিস্যা, এবং জমির পরিমাণ প্রতি দাগে দাগে আলাদা করে দেখাতে হবে।

দলিল লেখকের হস্তাক্ষর

দলিল লেখক হতে হবে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ। হাতের লেখা হতে হবে সুস্পষ্ট। বর্তমানে দলিলের জন্যে মুদ্রিত ফরম এর প্রবর্তন হয়েছে। তবে অতীতের হাতের লেখা দলিলের তথ্য বিভিন্ন কারণে প্রয়োজন হবে। তাই অতীতে প্রণীত তথ্য সম্বন্ধে অবহিতি অত্যধিক প্রয়োজন।

নক্ষ পরিচয় দলিলে লিখন

সুস্পষ্টভাবে লিখতে হবে। দলিলের প্রথম পক্ষ, দ্বিতীয় পক্ষ, দলিল গ্রহিতা, দলিল দাতা কে- তা

দলিল দাতার স্বাক্ষর কি দলিলের প্রতি পৃষ্ঠায় থাকতে হবে?

সনাতন দলিলের প্রতি পৃষ্ঠায় দলিল দাতার স্বাক্ষর থাকতে হবে।

দলিলের প্রথম পৃষ্ঠার ডান কোণে নাম এবং স্বাক্ষর ছিল নিচ থেকে ওপরের দিকে। শেষ পৃষ্ঠায় সই হবে নিচের দিকে।

বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে সাক্ষীর সম্মুখে কবুল না বললে যেমন বিয়ে শাদী সম্পাদন হয় না, তেমনি দলিল দাতার স্বাক্ষর বা টিপসই না হলে দলিল সম্পাদন হতো না। স্বাক্ষরের নিচে তারিখ এবং সময় উল্লেখ ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু তারিখ নয়, সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রয়-বিক্রয় মূল্য সংখ্যায় এবং অক্ষরে কোথাও লিখতে হয় কি?

দলিলে জমির ক্রয়-বিক্রয় মূল্য সংখ্যায় এবং অক্ষরে লিখতে হতো। বায়না দলিলের ক্ষেত্রে পরিশোধিত অর্থ এবং অবশিষ্ট টাকা অঙ্কে এবং অক্ষরে লিখতে হতো।

দলিলের নম্বরসমূহ লেখার স্থান

জমি ক্রয়-বিক্রয় এর নাম্বার কয়টি এবং কোথায় লেখা থাকতো?

বর্তমান সভ্যতায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ চিঠি পত্র লেখা হচ্ছে ও আদান প্রদান হচ্ছে। মেমো এবং তারিখ এবং বিষয়বস্তু দিয়ে চিঠিটি অতি সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কোন জায়গায় তারিখ ও মেমো নং লেখা হয় তা অনেকটা নির্ধারিত।

কিন্তু জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নম্বারগুলো লেখার স্থান নির্ধারিত থাকলেও এমনভাবে লেখা হয় কোন কোন ক্ষেত্রে তা খুঁজে বের করতেও গবেষণা করতে হয়।

দলিলের প্রথম পৃষ্ঠায় সবচেয়ে উপরে সাধারণত দলিলের নং লিখতে হতো। এ নাম্বার হাতের লেখা এবং দলিলের প্রথম পৃষ্ঠায় আরও বহু নাম্বার ছিল।

দলিলের সার্বিক বা জেনারেল নং কি? সর্ব বাম পার্শ্বের নাম্বার কোনটি ছিল?

সাব রেজিস্ট্রি অফিসে শুধু ক্রয়-বিক্রয় দলিল নয়-বহু ধরনের দলিল রেজিস্ট্রি হতো এবং হয়। প্রতিদিন যত দলিল রেজিস্ট্রি হয়, সব দলিলে একটি সার্বিক বা জেনারেল সিরিয়াল নাম্বার পড়ে। এই নাম্বারটি দলিলের প্রথম পৃষ্ঠার সর্ব বাম পাশে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৮। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৮। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সর্ব ডান পার্শ্বের নাম্বার কি? দলিলের শ্রেণীভিত্তিক ক্রমিক নং কোথায় লিখতে হতো?

সকল দলিলের সার্বিক সিরিয়াল নং ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের দলিলের পৃথক ক্রমিক নং থাকে। এই নাম্বার ছিল দলিলের প্রথম পৃষ্ঠার সর্ব ডান পাশে। এই নাম্বারটি হলো জমির ক্রয়-বিক্রয়ের দলিলের সিরিয়াল নাম্বার। এই নাম্বার এর সাথে দলিল রেজিস্ট্রির সালও উল্লেখ করতে হবে।

দলিলের সীল

ক্রয়-বিক্রয় দলিলের সীল কোথায় থাকে? সীলের মধ্যে অন্য কি লেখা থাকে?

বিক্রয় দলিলে সীল থাকে প্রথম এবং শেষ পৃষ্ঠায়। সিলের মাঝে হাতের লেখায় দলিলের নং ও খ্রিস্টাব্দ লেখা থাকতো।

প্লট ওয়ারী জমির পরিমাণ পৃথকভাবে কোথায় লেখার প্রয়োজন হয়?

দলিলে একাধিক প্লট যদি এক সঙ্গে বিক্রয় করা হয়, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় দলিলে প্রতি প্লট এর জমির পরিমাণ পৃথকভাবে দেখিয়ে যোগ করতে হবে। সকল প্লট এর জমির পরিমাণ যোগ করে এক সঙ্গে দেখানো যাবে না। প্লট ওয়ারি জমির পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে।

জমির চৌহদ্দি বা চতুর সীমা কি দলিলে উল্লেখ করতে হয়?

জমি ক্রয়-বিক্রয় দলিলে জমির উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম পার্শ্বের জমির দাগ নং, অবকাঠামো, এবং মালিকের নাম, অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।

দলিল রেজিস্ট্রির রশিদ

সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে দলিল রেজিস্ট্রি রশিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে মূল দলিল উঠাতে কষ্ট হবে।

প্রবেট

দলিলের প্রবেট কি? প্রবেট কেন অত্যাবশ্যক?

কোন দলিলের বিষয়ে আদালত হতে স্বীকৃতি নিতে হয়। আদালতের স্বাকৃতিকে বলা হয় প্রবেট। যেমন দানের কোন উইল করা হলে দলিলে দাতার স্বাক্ষর হলেই চলবে না। আদালতের স্বীকৃতি নেয়া হলেই উইল কার্যকরী করা যাবে।

দলিল সংক্রান্ত কাগজ পত্রের তালিকা সংরক্ষণ

ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভে খতিয়ান থেকে সকল দলিলের ধারাবাহিক দলিল, ধারাবাহিক বায়া দলিল, অন্যান্য দলিল, ফারায়েজ, খতিয়ান, পর্চা, নকশা ইত্যাদি রেকর্ড সারাজীবন সংরক্ষণ করতে হবে।

খাজনা সংক্রান্ত তথ্য

খাজনার দলিল, খাজনার রেকর্ড, দাখিলা অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে। জমি যদি খাজনা মুক্ত বা মওকুফ হয়, তাহলে বাৎসরিক মওকুফ দাখিলা সংগ্রহ করতে হবে।

দখলের তারিখ সংরক্ষণ

বিক্রয় সম্পাদন এবং দলিল রেজেস্ট্রির পর কোন তারিখে সম্পত্তি দখল নেয়া হয়েছে, ঐ তারিখ এবং তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

এক জমি একাধিক বার বিক্রয়ের মালিক

এক জমির মালিক কর্তৃক একাধিক বার একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রয় করা হলে এই জমির প্রকৃত মালিক কে? এই জমি কি মালিকদেরকে তাদের দেয় অর্থের হারে ভাগ করে দেয়া হবে?

এক জমি বিক্রেতা একাধিক বার রেজিস্ট্রি মূল্যে বিক্রয় করলে আইনত এবং আদালতের বিচারে প্রকৃত মালিক হবে তিনি যিনি সর্ব প্রথম ক্রয় করেছেন। পরে যারা ক্রয় করেছেন তারা দেওয়ানী আদালতে মামলা করে তাদের টাকা বিক্রেতা হতে ফেরত পেতে পারেন এবং প্রতারণার দায়ে মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে বিক্রেতাকে শাস্তি দেওয়াতে পারেন।

একই জমি একাধিকবার বিক্রয় কিভাবে সম্ভব এবং কেন তা গোপন থাকে? জেনে শুনেও কি কেউ বিক্রয় করা জমি ক্রয় করতে যাবেন?

ক্রেতা যদি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সন্ত্রাসী প্রকৃতির হন, তিনি সর্বশেষ ক্রেতা হলেও অর্থ ও পেশী শক্তির বলে ক্রয়কৃত জমি দখল করে ইমারত নির্মাণ করে ভোগ করতে পারেন। অন্যেরা আদালতে বিচারপ্রার্থী হলেও আদালতকে প্রভাবিত করে বিচার বিলম্বিত করতে পারেন। অথবা ভুল রায় আদায় করতে পারেন।

তখন আপিল আদালতে যেতে হবে। সর্বশেষ আপিল আদালত ঘুরে আসতে এক জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে।

অনেক বিক্রয় হয়ে যাওয়া জমি ভুলক্রমে ক্রয় করে থাকে। ২টি তারা ক্রয়কৃত জমির কাছাকাছি না থাকেন, তাহলে কঠিন অব্যবহৃত থাকলে পর্বে যে বিক্রয় হয়ে গেছে, তা টের পান না। জমি ক্রয় করার পর উদাসীন ক্রেতাগণ মিউটেশন বা নামজাদ ফলে বিক্রয়ের বিষয়টি গোপন থেকে যায়। করতে যান না। বিদেশে থাকার কারণে খাজনাও দেন না। তার ফলে বিক্রয়ের বিষয়টি গোপন থেকে যায়।

কোন জমি একাধিক বার বিক্রয় হয়েছে কি না সে খবর কোথা থেকে পাওয়া যাবে?

কোন জমি একাধিক বার বিক্রয় হয়েছে কিনা সে খবর বিধিসম্মত ফি দিয়ে সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া যেতে পারে। দলিল লেখা, রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে সংস্কার হলে এবং কম্পিউটারাইজেশন মালিকানার ধারাবাহিকতা জানা যাবে। হয়ে গেলে প্লট নং, খতিয়ান নং পাওয়া গেলে ঘরে বসেও মালিকানার ধারাবাহিকতা জানা যাবে।

জমি কম-বেশি হওয়া

রেকর্ডে জমি যা থাকে, বাস্তবে তা কম-বেশি হয় কিভাবে?

রেকর্ডে এবং বাস্তবে জমি কম-বেশি হওয়ার বহু কারণ থাকতে পারে। প্রতিবেশিগণ জমি দখল করে তাতে চাষাবাদ অথবা ইমারাত নির্মাণ করে অথবা অন্যভাবে ভোগ করতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতারা জমি রেকর্ডে যা আছে, তার বেশি পরিমাণ জমি বিক্রয় দলিলের মধ্যে লিখে দেন। ক্রেতারা জেনেও একই দামে বেশি জমি পেলে তা লিখে নিতে আপত্তি করেন না।

দলিলের শেষাংশে কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা কি?

দলিলে কাটাকাটি ঘষামাঝা অস্পষ্টতা থাকবে না। সর্তকতা সত্যেও ভুল হয়ে গেলে দলিলের কোন পৃষ্ঠায় কত নম্বর লাইন, কত নম্বর শব্দে, কাটাকাটি বা ভুল হয়েছে তা দলিলের শেষাংশে কৈফিয়ত শিরোনামে লিখে বর্ণনার নিচে দলিল লেখক ও দলিল দাতা সই করবেন।


লেখকের পরিচিতি

এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।