সরকারিভাবে ভূমি জরিপকালে কী করবেন ভূমি মালিকেরা

ভূমি মালিকদের সুবিধার্থে সরকারি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনাসহ খতিয়ান ও নকশার ভুল সংশোধনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর। অধিদপ্তর জানায়, সমগ্র জরিপ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপেই জমি ও মালিকানা সুরক্ষায় ভূমি মালিকদের জন্য কিছু জরুরি করণীয় রয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে ‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন সাইফুল ইসলাম ফকির। বইটির প্রথম অধ্যায়ের ১১৮ থেকে ১২২ নম্বর পৃষ্ঠায় সরকারিভাবে জরিপকালে ভূমি মালিকদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
জরিপের বিভিন্ন ধাপ ও ভূমি মালিকের করণীয়
প্রচার ও প্রাথমিক প্রস্তুতি: এলাকাভিত্তিক জরিপ শুরুর আগে মাইকিং ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এ সময় ভূমি মালিকদের নিজ জমির সীমানা চিহ্নিত করে রাখার পাশাপাশি যাবতীয় প্রয়োজনীয় দলিলপত্র হালনাগাদ ও প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাভার্স ও নকশা প্রস্তুত: মৌজার নতুন নকশা তৈরিতে জিএনএসএস যন্ত্রের সাহায্যে স্থায়ী পয়েন্টের সাপেক্ষে ট্রাভার্স ও সাব-ট্রাভার্স পয়েন্ট বসানো হয়। এরপর আমিনরা সরেজমিনে পরিমাপ করে ‘পি-৭০’ শিটে জমির সীমানা আঁকেন। অঙ্কিত প্রতিটি খণ্ডে পৃথক দাগ নম্বর বসানো হয় এবং দলিল ও দখল যাচাই করে মালিকের নামসহ অন্যান্য তথ্য খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়।
বুজারত ও সত্যায়ন (তসদিক): সরেজমিনে পরিমাপ শেষে খতিয়ান বা ‘মাঠ পরচা’ মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যে কোনো ভুল থাকলে নির্ধারিত ডিসপুট ফরম পূরণ করে জমা দিলে সেটেলমেন্ট অফিসার তা নিষ্পত্তি করেন। পরবর্তী সময়ে কানুনগো বা রাজস্ব অফিসার দলিল যাচাই করে সত্যায়ন করেন, যা খতিয়ানের প্রাথমিক আইনি ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।
আপত্তি ও আপিল দায়ের: তসদিককৃত রেকর্ড সাধারণ মানুষের দেখার জন্য ৩০ দিন উন্মুক্ত রাখা হয়। এ রেকর্ডে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হলে ১০ টাকার কোর্ট ফি দিয়ে ‘আপত্তি কেস’ দায়ের করতে পারেন। আপত্তি অফিসার শুনানির মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করবেন। আপত্তি রায়ে সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তীতে সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবর আপিল দায়েরের সুযোগ রয়েছে।
চূড়ান্ত রেকর্ড ও ম্যাপ সংগ্রহ: আপিল শুনানি শেষে রেকর্ড চূড়ান্ত করে তা ৩০ কার্যদিবসের জন্য প্রদর্শনীতে রাখা হয়। এ পর্যায়ে নির্ধারিত ৩৫০ টাকা ফি দিয়ে মুদ্রিত সরকারি ম্যাপ সংগ্রহ করা যায়।

চূড়ান্ত প্রকাশনার পর করণিক ভুল সংশোধন
চূড়ান্ত প্রকাশিত রেকর্ডে নামের বানান, দাগের হিস্যা বা গাণিতিক ভুল থাকলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবর আবেদন করে তা সংশোধন করা যায়। একইভাবে নকশায় দাগ নম্বর বাদ পড়া কিংবা সীমানা অস্পষ্ট থাকার মতো করণিক ভুলগুলোও নিয়মানুযায়ী সংশোধনযোগ্য।
ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা ও আপিল
চূড়ান্ত রেকর্ড গেজেট আকারে প্রকাশের পর কোনো বিরোধ থাকলে তা নিষ্পত্তিতে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে।
ট্রাইব্যুনালে মামলা: গেজেট প্রকাশের ১ বছরের মধ্যে ‘ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে’ মামলা করা যায়। উপযুক্ত কারণ দর্শাতে পারলে সর্বোচ্চ ২ বছরের মধ্যে মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে।

আপিল ট্রাইব্যুনাল: ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে ‘ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে’ আপিল করা যাবে। যুক্তিসংগত বিলম্বের ক্ষেত্রে এ সময়সীমা সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত শিথিলযোগ্য।
জরুরি নির্দেশনা ও সতর্কতা
বিনামূল্যে পরচা: মাঠে বুজারত ও তসদিক স্তরে মাঠ পরচা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
অফিসিয়াল রশিদ (ডিসিআর): জরিপ সংক্রান্ত সব ধরনের ফি কেবল নির্ধারিত ‘ডিসিআর’ রশিদের মাধ্যমেই পরিশোধ করতে হবে। রশিদের বাইরে কোনো লেনদেন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
অভিযোগ প্রতিকার: জরিপ কাজে যেকোনো ধরনের জালিয়াতি বা দুর্নীতির অভিযোগ ধাপে ধাপে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার, চার্জ অফিসার, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার কিংবা মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর জানানো যাবে।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (dlrs.portal.gov.bd) ভিজিট করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
লেখকের পরিচয়
সাইফুল ইসলাম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি এলএলবি ও এলএলএম পাস করেন।



