logo
Advertisement

জমি কেনার আগে জেনে নিন প্রয়োজনীয় আইন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমি কেনার আগে জেনে নিন প্রয়োজনীয় আইন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

জমি-জমা কেনাবেচা, নামজারি কিংবা রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই নানা জটিলতায় পড়তে হয়। আইনকানুন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় কিংবা সামান্য অসাবধানতার কারণে অনেক সময় কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পত্তি - দুটোই খোয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যা জানা থাকলে যেকোনো ধরনের প্রতারণা বা আইনি ঝামেলা এড়িয়ে নিরাপদে সম্পত্তি কেনাবেচা করা সম্ভব।

Advertisement

জমির হিসাব, বাড়ী নির্মাণ ও এর তত্ত্বাবধানের আইন ও আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন মো: শহিদুল ইসলাম (শাহীন)। তার রচিত ‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইটির অষ্টম অধ্যায়ের ১১৪, ১১৫ ও ১১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কতিপয় আইন’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাঠকদের সচেতনতার জন্য জমি রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি আইনি দিক নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

বেনামী কেনাবেচা বন্ধ: ১৯৮৪ সালের ১৪ই এপ্রিল থেকে সকল প্রকার জমি বা স্থাবর সম্পত্তির বেনামী কেনাবেচা আইনিভাবে একদম নিষিদ্ধ।

স্থিরীকৃত রায়ত: কেউ যদি টানা ১২ বছর কোনো গ্রামের জমি ভোগদখলে রাখেন, তবে তিনি ঐ গ্রামের স্থিরীকৃত রায়ত হিসেবে স্বীকৃতি পান।

জমির ব্যবহার: কোনো রায়তের যদি জমি "দখল রাখার" অধিকার থাকে, তবে তিনি তার ইচ্ছেমতো যেকোনো কাজে সেই জমি ব্যবহার করতে পারবেন।

খাস জমিতে অগ্রাধিকার: গ্রামে বসতবাড়ির উপযোগী খাস জমি পাওয়া গেলে ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকরা তা বন্দোবস্ত পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

নাবালকের চুক্তি বাতিল: বয়স ১৮ না হলে কেউ আইনত দলিল সম্পাদন বা রেজিস্ট্রেশন করতে পারে না।

মূল দলিল হারালে করণীয়: মূল দলিল হাতে পাওয়ার আগেই রশিদ বা টোকেন হারিয়ে গেলে ভয় না পেয়ে আগে থানায় জিডি (GD) করুন। এরপর হলুদ কার্টিজ কাগজে রেজিস্টার বরাবর আবেদন করতে হবে।

বসতবাড়ির সুরক্ষা: গ্রামে মালিকের বসতবাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত জমি কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষ ক্রোক, বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করতে পারবে না। এমনকি মালিককে উচ্ছেদও করা যাবে না।

দলিলের ভুল শোধরানো: রেজিস্ট্রেশনের পর দলিলে কোনো ভুল চোখে পড়লে রেজিস্ট্রেশন আইনের ৭৪(১) ধারা অনুযায়ী সংশোধনী দলিলে ভুল ঠিক করা যায়। তবে এতে দাতা-গ্রহীতা দুজনেরই উপস্থিতি লাগবে।

দলিল রেজিস্ট্রির সময়সীমা: যেকোনো দলিল সম্পাদনের তারিখ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিতে হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অকৃষি জমির সীমা: কৃষি জমির সীমা থাকলেও অকৃষি জমি নিজের দখলে রাখার কোনো নির্দিষ্ট সীমা আইনে বেঁধে দেওয়া হয়নি।

৬০ বিঘার বেশি কৃষি জমি নয়: একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা কৃষি জমি রাখতে পারেন। অতিরিক্ত জমি সরকারের অধীনে চলে যাবে এবং তার কোনো ক্ষতিপূরণ মিলবে না। তবে উত্তরাধিকার বা দানসূত্রে পেলে সরকারি নিয়মে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে।

দলিল সম্পাদনের পর দাতার মৃত্যু: টাকা দিয়ে দলিল সম্পাদনের পর দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার আগেই যদি দাতা মারা যান, তবে সাব-রেজিস্ট্রার দাতার ওয়ারিশদের নোটিশ পাঠাবেন। শুনানি শেষে সাব-রেজিস্ট্রার তা রেজিস্ট্রি করে দেবেন।

নাবালকের জমি কেনাবেচা: নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে আগে আদালতে 'গার্ডিয়ানশিপ' (অভিভাবকত্ব) মামলা করে অনুমতি নিতে হয়। আদালতের অনুমতি ছাড়া এই জমি কেনাবেচা রেজিস্ট্রি হবে না।

অগ্রিম খাজনা: তহশিল অফিসে চাইলে ৩ বছরের জমি খাজনা একসঙ্গে অগ্রিম দেওয়া যায়।

বকেয়া খাজনা মামলা: ১ বছরের খাজনা বকেয়া পড়লে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার্টিফিকেট মামলা করতে পারে।

বায়নানামা বাতিল হলে: বায়নানামা করার পর বিক্রেতা দলিল রেজিস্ট্রি করে দিতে টালবাহানা করলে বায়নানামার তারিখ থেকে ১ বছরের মধ্যে আদালতে মামলা করা যাবে।

ভূমি উন্নয়ন কর: ১৯৭৬ সাল থেকে জমির খাজনার প্রাতিষ্ঠানিক নাম বদলে 'ভূমি উন্নয়ন কর' করা হয়েছে।

কর নিয়ে আপত্তি: ভূমি উন্নয়ন কর বেশি ধরা হয়েছে মনে হলে, তালিকার ১৫ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে আপিল করা সম্ভব।

বিভাগীয় কমিশনারের আপিল: জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারেন, যা ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বেসরকারি জমিতে দখলস্বত্ব: বেসরকারি বা ব্যক্তির জমিতে টানা ১২ বছর নিরঙ্কুশ দখলে থাকলে দখল সূত্রে মালিকানা দাবি করা যায়।

আম-মোক্তারনামা: রেজিস্ট্রি করা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আম-মোক্তারনামা ছাড়া কেউ অন্য কারো সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবে না।

ইজারা রেজিস্ট্রেশন: ১ বছরের বেশি মেয়াদের যেকোনো ইজারা বা বাৎসরিক খাজনার শর্তে চুক্তির দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।

একাধিক দলিল হলে কোনটি টিকবে: অসাধু বিক্রেতা যদি একই জমি একাধিকজনের কাছে বিক্রি করে দেয়, তবে ১৮৮২ সালের আইন অনুযায়ী যে দলিলটি আগে সম্পাদিত হয়েছে, সেটিই কার্যকর হবে (রেজিস্ট্রেশনের তারিখ নয়, সম্পাদনের তারিখ ধর্তব্য)।

এসি ল্যান্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল: সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের আদেশের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করতে হয়।

সরকারি জমিতে দখলস্বত্ব: সরকারি জমিতে কেউ যদি টানা ৬০ বছর ধরে নিরঙ্কুশ দখলে থাকেন, তবে তিনি দখল সূত্রে মালিকানা পেয়ে যান।

সর্বজনীন অধিকার (Right in Rem): বিক্রয় কবলা দলিল এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেন তা ক্রেতার সর্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করে - যার মাধ্যমে তিনি পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে নিজের মালিকানা সাব্যস্ত করতে পারেন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমি কেনাবেচা ও এর আইনি প্রক্রিয়া কেবল আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্পর্শকাতর চুক্তি। উপরিউক্ত আইনি বিধানগুলো জানা থাকলে অসাধু চক্রের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়া যেমন সহজ হয়, তেমনি পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি মামলা-মোকদ্দমার ঝক্কিও এড়ানো যায়। তাই যেকোনো জমি ক্রয় বা হস্তান্তরের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ভূমি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক উপায়ে সকল কাগজ ও রেজিস্ট্রি যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ।

লেখক পরিচিতি

মোঃ শহিদুল ইসলাম (শাহীন) জামালপুর জেলার সদর থানাধীন দাপুনিয়া গ্রামে নানার বাড়ি আতাহের আলী সাধু মাস্টারের বাড়ীতে ১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। দাদা বাজিতুল্লাহ্ সরকার টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্ত্তাঁ ছিলেন। পিতা- মরহুম মোকাদ্দেছ আলী বাংলাদেশ রেলওয়েতে মেডিকেল বিভাগে ফার্মাসিষ্ট হিসেবে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে চাকুরী করে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে অবসর গ্রহণ করেন। মাতা- মোছাঃ ফিরোজা বেওয়া।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তিনি দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার রিয়াজনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিনাজপুর জেলার সেবাতগঞ্জ থানার সেবাতগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি, দিনাজপুর সঙ্গীত ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি, জামালপুর আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে জামালপুর আইন কলেজে অধ্যয়ন করেন। কম্পিউটার সাইন্স ও মেডিক্যাল সাইন্সে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ময়নামতি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে আমিন-সার্ভেয়ার ডিপ্লোমা করেন। ধানসিঁড়ি মডেল টাউনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট ও ফ্ল্যাটের ব্যবসার সাথে জড়িত। জামালপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয় পরিষদ, অপরাধ সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি এবং রোগী কল্যাণ সমিতির আজীবন সদস্য সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি বাজিতুল্লাহ্-সাধু মাষ্টার স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক। জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তার লেখা অনেক কবিতা, গল্প, নাটক দেশের বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পায়। তার লেখা উপন্যাস বড় প্রেম, ফারায়েজ শিক্ষার সহজ উপায়, জমির হিসাব আইন-বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান, ভূমি আইন মামলা ও রায়, কম্পিউটার শিক্ষার সহজ উপায়, সূত্রের পকেট ডায়রি, ভূমি নামজারি, দলিল লিখন পদ্ধতি ও রেজিস্ট্রেশন আইন, এফিডেবিট চুক্তিপত্র লিখন পদ্ধতি, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া আইন ও বিধি, কড়া ক্রান্তি বা ব্রিটিশ পদ্ধতি শিক্ষার সহজ উপায় এবং চেক ডিসঅনার আইন ও বিধি বই আকারে প্রকাশ করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে বই লেখার বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ছায়ানীত পদক ২০১৪ প্রদান করা হয়।

জমি কেনার আগে জেনে নিন প্রয়োজনীয় আইন - Asia Post