logo
Advertisement

জমির প্রকারভেদ: কোন জমিকে কী নামে চেনা যায়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির প্রকারভেদ: কোন জমিকে কী নামে চেনা যায়
ফসলি জমি। ছবি: ফ্লিকার

জমি বলতে আমরা সাধারণত মাটি বা কোনো নির্দিষ্ট জায়গাকে বুঝি। কিন্তু আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ‘জমি’ বা ‘ভূমি’ শব্দের অর্থ আরও বিস্তৃত। শুধু আবাদি বা অনাবাদি জায়গা নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জলমগ্ন ভূমি, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা, এমনকি ভূমির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনাও ভূমির সংজ্ঞার আওতায় পড়ে।

ফলে জমি কেনাবেচা, মালিকানা, ব্যবহার কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত কোনো আইনি বিষয়ে শুধু জমির পরিমাণ বা অবস্থান জানাই যথেষ্ট নয়, এর ধরন ও শ্রেণিও জানা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থায় জমির ধরন বোঝাতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আইনগত শব্দ ব্যবহার করা হয়। নাল জমি, চালা বা ভিটি জমি, আইল, হালট ও হাওড়ের মতো শব্দগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহুল পরিচিত। এসব শব্দের প্রতিটির রয়েছে আলাদা অর্থ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য।

কোথাও জমির উচ্চতা, কোথাও পানি জমার ধরন, কোথাও কৃষিকাজ বা মানুষের চলাচলের সঙ্গে সম্পর্ক, আবার কোথাও জমির সরকারি ব্যবস্থাপনা বা রাজস্ব আদায়ের ধরন বোঝাতে এসব পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।

জমি বা ভূমি বলতে কি বুঝায়?

জমি, ভূমি, মাটি, ইত্যাদি সমার্থক শব্দাবলি। সাধারণত যে সকল আবাদি ও অনাবাদি জমি, নদ-নদী, খাল-বিল, নালা, পুকুর, ডোবা যা জমির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত রয়েছে, তাকে জমি বা ভূমি বলা হয়। জমির ওপর যদি পানি বা জলাশয় থাকে, তাও জমির অন্তর্ভুক্ত। জমির ওপর ভূ-মণ্ডলের যতটুকু আমাদের প্রয়োজন এবং ব্যবহারোপযোগী, তাও কেনা জমির অন্তর্ভুক্ত। ফ্লাট ক্রয় করলে অবশ্য আকাশ পর্যন্ত অধিকার থাকে না।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১-এর ২(১৬) ধারায় ‘ভূমি’-এর ব্যাখা দেওয়া হয়েছে। যে কোন ধরনের জমি বনাবৃত এবং জলমগ্ন হলেও তা ভূমি।

ভূমির ওপর নির্মিত বাড়িঘর, দালান-কোঠা, বাগান, বন, জঙ্গল, বৃক্ষলতা, মাটির সঙ্গে সংযুক্ত বা স্থায়ীভাবে আটকানো সকল কিছুই ভূমির অন্তর্ভুক্ত। খনিজ সম্পদ বা গুপ্তধন ভূমির অন্তর্ভুক্ত নয়।

জমি সংশ্লিষ্ট শব্দাবলি কি কি?

নাল জমি: যে জমিতে কৃষি কাজ করা হয় এবং যা সাধারণত সমতল ভূমি-ঐ রূপ কৃষি জমিকে বলা হয় 'নাল জমি'।

(অতীতে) লায়েক পতিত জমি: যে জমি অতীতে চাষাবাদের লায়েক বা উপযুক্ত ছিল না, পরবর্তীতে চাষাবাদের উপযুক্ত বা লায়েক হয়েছে-এরূপ জমিকে "(অতীতে) লায়েক পতিত" জমি বলে।

চালা জমি/ভিটি জমি/বিচনা: ধান, পাট, গম, ইত্যাদি নাল বা আবাদী জমিতে চাষ করা হয়। আবাদী জমি অপেক্ষা একটু উঁচু জমিতে শাক সবজি চাষ করা হয়। এরূপ উঁচু জমিতে ঘর বাড়িও তৈরি করা হয়। আবাদী জমি অপেক্ষা উঁচু জমিকে চালা জমি অথবা ভিটি জমি অথবা বিচনা বলা হয়।

ঘরের উপরিভাগকে চাল বলা হয়। পুকুরের পাড়টি পুকুর থেকে উঁচু। পুকুরের পাড় থেকে উঁচু জমিকে বলা হয় চালা ভূমি। এই জমি কৃষি জমি থেকে উঁচু।

চান্দিনা ভূমি কি?

হাট বাজারের কিছু কিছু দোকান, গৃহ, অথবা ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান চান্দিনা ভূমি নামে খ্যাত। অস্থায়ী হাটবাজারের স্থায়ী দোকান-পাটকে চান্দিনা ভূমি বলা হয়।

ছড়া/ছড়ি জমি

পাহাড় বা টিলা থেকে যে জমি সমতল ভূমির বিভিন্ন দিকে ঢালু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ছড়া বা ছড়ি জমি বলা হয়।

আইল

জমির খণ্ডগুলো পরস্পর থেকে আলাদা করার জন্য কিছু উঁচু পথ রাখা হয়। জমির চারদিকে বা যে কোন দিকে সীমানা নির্দেশক উঁচু লাইনকে আইল বলা হয়। আইলের ফলে জমিতে পানি আটকে থাকে।

নয়ন জুলি

নয়ন জুলি এক প্রকার নালা। নালা দিয়ে পানি নিচের দিকে নামে। রাস্তা নির্মাণের সময় দু'দ্বার থেকে মাটি কেটে রাস্তা উঁচু করা হয়। ফলে রাস্তার পাশে নালার সৃষ্টি হয়। এরূপ নালাকে "নয়ন জুলি” বলে। রাস্তা অথবা বাঁধের নিকটে বা সংলগ্ন যে নিচু পানির নালা দেখে হয়ত নয়ন জুড়িয়ে যায়, তাকে বলা হয় নয়ন জুলি।

গোপাট

প্রায় গ্রামে বা মৌজায় কিছু কিছু পতিত জমি থাকে যেখানে গরু ঘাস খায়। এ রূপ পতিত ভূমিকে গোপাট বলে। বিরাণ ভূমি বা খিলেও গরু চড়ে বেড়ায়। গোপাট জমিতে অধিকার সকলের। কেউ কেউ গোপাট ভূমি বন্ধক দিয়ে ঋণদান সংস্থা হতে ঋণ গ্রহণ করার চেষ্টা করে থাকেন এবং সফলও হন। এটা বেআইনী।

হালট

যে জমির ওপর দিয়ে কৃষক হালের বলদ নিয়ে মাঠে যায়, ঐ জমিকে বলা হয় হালট। হালট জমির অপর নাম গোপাট। বর্ষা কালে অনেক ক্ষেত্রেই হালট বা গোপাট ডুবে যায়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৭৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৭৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাঠের নাল জমির মাঝখানের আইলটি চওড়া হলে তা গরু নিয়ে চলাচলের জন্য সুবিধাজনক। এই চওড়া আইল পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে তা রাস্তার মত উঁচু নয়।

ডোবা

যে জলাশয়ের পানি অব্যবহৃত থাকে অথবা যে গর্তের পানি প্রায় সারা বছরই অব্যবহৃত থাকে, তাকে বলা হয় ডোবা। ডোবা বলতে সাধারণত ব্যবহারের অনুপোযোগী কোন পানি যা সারা বছরই আবদ্ধ থাকে অথবা মানুষের ব্যবহারের জন্য নয় বরং মাছ চাষের জন্য ব্যবহার করা হয় এমন জায়গাকে (ডোবা) বলা হয়। পুকুরের পানি ব্যবহারের উপযুক্ত না হলে ঐ পুকুরকে ডোবা বলা হয়।

হাওড়

হাওড় প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট বিস্তৃত জলমগ্ন এলাকা। হাওড় সাধারণত বিল থেকে বড়। প্রাকৃতিক কারণে কখনো কখনো জমি নিচু হয়ে হ্রদ বা বিরাট জলাভূমির আকার ধারণ করে। কখনো কখনো জলাভূমি ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ের আকার ধারণ করে। কখনো কখনো নদী গতি পরিবর্তন করে নতুন পথে চলা শুরু করে।

নদীর পূর্বের গতিধারা বা স্রোত শ্লথ হয়ে যায়। ফলে পলি জমে নদীর তলাভাগ উঁচু হয়ে যায়। এর ফলে বিরাট জলাভূমির সৃষ্টি হয়। তা হ্রদের মত গভীর নয়। চাষের উপযোগী জলাভূমিও নয়। প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট এরূপ বিরাট বিস্তীর্ণ জলমগ্ন স্থানকে বলা হয় হাওড়।

বাঁওড়

নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জলাভূমিকে বলা হয় বাঁওড়। নদীর বাকের কারণে এই ভূমিকে বলা হয় বাঁওড়। বাঁওড় এর বয়স হাওড় থেকে কম। নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে নদীর অংশ বিশেষে স্রোত এবং গভীরতা কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধই হয়ে যায়। এরূপ জলমগ্ন এলাকাকে বাঁওড় বলা হয়।

বিল

‘বিল’ বলতে সাধারণত বুঝায়-ঐ সব জমি যেখানে সারা বছর পানি জমে থাকে এবং তা সমতল ভূমি থেকে সাধারণত নিচু হয়।

পুকুর বা ডোবার ন্যায় বিল ছোট নয়। খালের ন্যায় সরুও নয়। বরং বিস্তত ও জলমগ্ন। এরূপ এলাকাকে বিল বলা হয়। বিলের মধ্যে প্রায় সারা বছরই নানি জমে থাকে। বিলে মাছের চাষ হয়।

বিল সমতল ভূমি থেকে নিচ এবং ডোবা বা পুকুর থেকে উচু-কিন্তু পানি সাধারণত জমে থাকে সারা বছর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বল্প গভীর বিলে আবার চাষাবাদও করা হয়। যে সমস্ত শস্য বেশি পানিতে জন্মে, ঐসব ফসল বিলে চাষ করা হয়।

সায়রাত কি? সায়রাত মহল কি?

সায়রাত অর্থ হলো এমন ভূমি এবং অন্যান্য সম্পত্তি যা হতে খাজনা ব্যতীত সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হয়। হাটবাজার, ফেরিঘাট, জলমহল, ইত্যাদি হলো সায়রাত বা সায়রাত মহলের অন্তর্গত। সায়রাত মহলের জমি সরকারি খাস খতিয়ানের জমি। এই সম্পত্তি সরকার লীজ দেয়। কিন্তু সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করে না।

ওয়াকফ, সায়রাত, এ্যানুইটি কি?

এস্টেট একুইজিশন এন্ড টেনানসি এ্যাক্ট ১৯৫১-এর আওতাধীনে সরকার হাট-বাজারগুলো ব্যবস্থাপনার জন্য অধিগ্রহণ করেন। হাট বাজার অধিগ্রহণকালে হাট-বাজার এর মধ্যে যদি কোন ওয়াকফাহ্ সম্পত্তি থাকে-ঐ সম্পত্তির ওপর এককালীন কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। ঐ সম্পত্তির আয় হতে যদি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জনহিতকর কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো-তবে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখার স্বার্থে সরকার বার্ষিক অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরূপ বার্ষিক অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্তকে বলা হয় এ্যানুইটি।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন নামগুলো কি কি?

(১) উত্তরাঞ্চল : বরেন্দ্রভূমি, (২) পশ্চিমাঞ্চল : রাঢ়ভূমি, (৩) উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল : পুন্ড্রভূমি, (৪) মধ্যাঞ্চল: বঙ্গভূমি, (৫) পূর্বাঞ্চল: সমতল ভূমি এবং (৬) দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল: হরিকেল।


লেখক পরিচিতি

এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।