ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া হলে কী করবেন

জমির মালিকানা ও নিরঙ্কুশ ভোগদখল নিশ্চিত রাখতে প্রতি বছর নিয়মিত ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ পরিশোধ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু অসচেতনতা বা সঠিক ধারণার অভাবে অনেকেরই এই কর বকেয়া পড়ে থাকে। সঠিক সময়ে কর পরিশোধ না করলে রেন্ট সার্টিফিকেট মামলাসহ এমনকি জমির মালিকানা হারানোর মতো চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। তখন ভূমির মালিকদের করণীয় কী?

এসব বিষয় নিয়ে ‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ শীর্ষক বইতে উল্লেখ করেছেন লেখক সাইফুল ইসলাম ফকির। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৫৩ ও ১৫৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া হলে ভূমি মালিকদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
কোনো জমির ভোগদখলের সুবিধা গ্রহণের জন্য সরকারকে প্রতি শতাংশ জমির বিপরীতে বছরভিত্তিক যে নির্ধারিত অর্থ প্রদান করা হয়, সেটিই ভূমি উন্নয়ন কর। ১৯৯৬ সালে ‘ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ’ -এর মাধ্যমে পুরোনো ‘খাজনা’ শব্দটির পরিবর্তে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। বাংলা সনের ওপর ভিত্তি করে বছরে একবার এই কর আদায় করা হয়।
কর প্রদানের পর জমিদাতা যে ‘দাখিলা’ (রসিদ) পান, তা জমির মালিকানা প্রমাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। নামজারি (মিউটেশন), জমি কেনা-বেচা বা রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত যে কোনো কাজের জন্য এই দাখিলা অপরিহার্য।
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, তিন বছরের বেশি কর বকেয়া থাকলে তা আর আদায় করা যায় না। তবে ভূমি আইনি বিধিমালা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ ভুল। ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া হলে করণীয় বিষয়গুলো হলো—
১. আইনি মামলা (রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা): কর তিন বছরের বকেয়া হলেই তা আদায়ের জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস ‘রেন্ট সার্টিফিকেট’ মামলা দায়ের করতে পারে।
২. জমি নিলাম ও খাস খতিয়ানভুক্তকরণ: মামলার মাধ্যমে উক্ত জমি নিলামে বিক্রি করে বকেয়া কর আদায় করা হয়। কোনো ক্রেতা পাওয়া না গেলে সরকার মাত্র ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে জমিটি কিনে ‘খাসজমি’ হিসেবে পরিগণিত করে এবং পরবর্তীতে তা ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিতে পারে।

৩. সুদ গণনা: বকেয়া পড়ে গেলে যে বছর থেকে কর বাকি রয়েছে, সেই বছরের হার অনুযায়ী প্রতি বছরের বকেয়ার ওপর ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ জ্যামিতিক হারে অতিরিক্ত জরিমানা বা সুদ যুক্ত হয়।
বর্তমানে প্রচলিত কৃষি জমির করের হার
বর্তমানে ২০১৫ সালের ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত হার অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়। কৃষি জমির ক্ষেত্রে নিয়মসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো।
২৫ বিঘা পর্যন্ত: কৃষি জমির পরিমাণ ২৫ বিঘা পর্যন্ত হলে ভূমি উন্নয়ন কর সম্পূর্ণ মওকুফ (ছাড়)।
২৫ বিঘার অধিক থেকে ১০ একর পর্যন্ত: প্রতি শতাংশ জমির জন্য বছরে ২ টাকা হারে কর দিতে হবে।
চা, রাবার, ফল বা ফুলের বাগান: কৃষি জমি যদি চা, রাবার বা বাণিজ্যিক ফল/ফুলের বাগান হয় (এবং ১ একরের বেশি হয়), তবে প্রতি শতাংশের জন্য বছরে ১ টাকা ১০ পয়সা হারে কর প্রযোজ্য হবে।
আইনি জটিলতা, অতিরিক্ত সুদ এবং জমির মালিকানা হারানোর ঝুঁকি এড়াতে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ভূমি মালিকদের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে হালনাগাদ দাখিলা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা উচিত।
লেখকের পরিচয়
সাইফুল ইসলাম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি এলএলবি ও এলএলএম পাস করেন।




