logo
Advertisement

বর্তমানে কিভাবে জমির মালিক হওয়া যায়?

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বর্তমানে কিভাবে জমির মালিক হওয়া যায়?
প্রতীকী ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেওয়া

বাংলার ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাস দীর্ঘ ও নানা পরিবর্তনে ভরা। ব্রিটিশ শাসনামলে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে একের পর এক ভূমি বন্দোবস্ত চালু করা হয়। পাঁচসালা ও দশসালা বন্দোবস্তের পর ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এর মাধ্যমে জমিদারদের হাতে ভূমি রাজস্ব আদায়ের বড় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। পরে সূর্যাস্ত আইনসহ নানা কঠোর ব্যবস্থায় কৃষক ও প্রজাদের ওপর চাপ আরও বাড়ে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটে ১৯৫১ সালের স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্টের মাধ্যমে। এরপর ভূমির মালিকানা ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পরিবর্তে ভূমির সঙ্গে সরাসরি মালিকের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। কীভাবে এই পরিবর্তন হলো, বর্তমানে জমির মালিকানা ও ভূমি উন্নয়ন করের কাঠামো কী, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

৭৬ সনের (বাংলা) মন্বন্তর ও পাঁচসালা বন্দোবস্ত

বাংলা মুলুকে ইংরেজ প্রভাবের শুরুতেই নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ১৩ বছরের মাথায় বাংলা ১১৭৬ সালে (১৭৬৯-৭০ ইংরেজি) অনুষ্ঠিত হয় "ছিয়াত্তরের মন্বন্তর” নামে খ্যাত এদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম দূর্ভিক্ষ। এ প্রেক্ষাপটে ১৭৭২ সনে বাংলায় আগত বাংলার প্রথম গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩ সন থেকে গভর্নর জেনারেল) পাঁচসালা বন্দোবস্ত অর্থাৎ ৫ বছর মেয়াদী জমিদারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

১৭৮৬ সনে লর্ড কর্নওয়ালিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন। তিনি ১৭৯০ সনে ওয়ারেন হেস্টিংস প্রদত্ত খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে পাঁচসালা বন্দোবস্তের পরিবর্তে দশসালা বন্দোবস্তের প্রবর্তন করেন এবং ১৭৯৩ সনে দশসালা বন্দোবস্তের পরিবর্তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি প্রথা প্রবর্তন করেন।

সূর্যাস্ত আইন কি?

লর্ড কর্নওয়ালিস ভূমি রাজস্ব আদায় নিশ্চিতকরণের জন্য সর্বশেষ বাংলা সনের ৩০শে চৈত্রের মধ্যে বার্ষিক খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ জমিদারি নিলামে বিক্রয়ের সূর্যাস্ত আইন প্রবর্তন করেন। সূর্যাস্ত আইন ছিল সরকারের ৭নং রেগুলেশন। তাই এই আইনকে ৭ম বা হপ্তম আইন বলা হত।

জমিদারি বিলুপ্তির পূর্বে ও পরে আদায়কৃত খাজনা

১৯৫১ সালে জমিদারি অধিগ্রহণের পূর্বে সুবাহ বাংলার খাজনা কি পরিমাণ ছিল?

জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশের পূর্বে সরকার। থেকে ভূমি রাজস্ব বাবদ পেত বার্ষিক ১,৭৩,৩৮,০০০/= টাকা। প্রজাদের নিকট থেকে বৈধভাবে জমিদারগণ আদায় করতেন ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অবৈধভাবে আদায়ের পরিমাণ ছিল অজ্ঞাত, হয়ত সীমাহীন।

জমিদারি উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কখন শুরু হয়?

টেস্ট একুইজিশন এবং টেনান্সি এ্যাক্ট-১৯৫১

১৯৩৮ সনে স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউড এর নেতৃত্বে ভূমি ব্যবস্থা সংক্রান্ত রেভিনিউ কমিশন গঠন করা হয়। তখন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্ট বিবেচনার জন্য ১৯৪৬ সনে 'মোয়াজ্জেম হোসেন প্রশাসনিক নিরীক্ষা কমিটি' গঠন করা হয়।

১৯৪৭ সনে ভারত বিভাগের পূর্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে প্রজাস্বত্ব আইন পাশের বিল পেশ করা হয়। জমিদারদের 'বাধার কারণে বিল পাশ করা সম্ভব হয়নি।

ভারত বিভক্তির পর ১৯৪৮ সনে ঐ বিল পুনরায় পেশ করা হয়।

১৭৭৩ সালে প্রবর্তিত জমিদারি প্রথার অবসান ঘটাতে বাংলার চাষী কৃষকদের আন্দোলন করতে হয় ১৭৭ বছর (১৭৭৩-১৯৫১ খ্রি.)। ১৯৫১ সনে জমিদারি অধিগ্রহণ প্রজাস্বত্ব আইন শীর্ষক আইনটি পাশ হয়। এই আইন ১৯৫১ সনের ২৮ নং আইন। এ আইনে জমির মালিকানা এসেছে বৃটিশ আমলের প্রজা বা রায়ত বলে যারা কথিত হতেন তাদের হাতে।

জমিদারি প্রথা বিলোপ প্রক্রিয়া কখন শেষ হয়?

১৯৫১ সালের স্টেট একুইজিশন এবং টেনানসী এ্যাক্টের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলোপ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় এবং ১৯৫৭ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করা হয়।

জমিদারের সঙ্গে প্রজা বা রায়তের কি সম্পর্ক ছিল?

১৯৫১ সালের স্টেট একুইজিশন এবং টেনানসী এ্যাক্ট পাশ হওয়ার পূর্বে জমির মালিক ছিলেন তথাকথিত অত্যাচারী জমিদারগণ। জমিদারের এই জমির দখলদার প্রজাদেরকে রায়ত হিসেবে গণ্য করা হতো।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৪। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বৃটিশ আমলে জমিদারগণ রায়ত বা প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। জমিদারি অধিকরণ এবং প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১ পাশ হওয়ার পর সরকার তৎকালীন প্রজা এবং বর্তমান মালিকদের থেকে সরাসরি খাজনা আদায় করছে।

১৯৫১ সালের স্টেট একুইজিশন এবং টেনানসী এ্যাক্ট পাশ হওয়ার পূর্বে জমির মালিক ছিলেন তথাকথিত অত্যাচারী জমিদারগণ। জমিদারের এই জমির দখলদার প্রজাদেরকে বায়ত

হিসেবে গণ্য করা হতো।

স্টেট একুইজিশন এবং টেনানসী এ্যাক্টে ১৯৫১-এর ৮২ ধারা-এর ৮ উপধারা অনুসারে রায়তের পরিবর্তে মালিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

রায়ত বা প্রজা কে ছিলেন?

প্রজার সনাতন অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যিনি জমি ব্যবহারের জন্য রাজাকে খাজনা দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে রাজাও নেই, প্রজাও নেই। প্রজার পরিবর্তে আছে জমির মালিক। তাকে সরকারি খাজনা বা কোষাগারে খাজনার পরিবর্তে দিতে হয় "ভূমি উন্নয়ন" কর।

যে ব্যক্তি সরাসরি সরকারকে কর প্রদান করে জমি ভোগ দখল করে, তাকে প্রজা বা মালিক বলা যায়। এক সনা লীজ বা ইজারা নিয়ে প্রজা হওয়া যায় না।

বর্তমানে ভূমি ভোগকারী প্রজাগণ ভূমির মালিক হিসেবে গণ্য (জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১ ধারা ৮১(১))।

“রায়ত”, “কোর্ফা রায়ত”, “প্রজা”, “মালিক”, “খাজনা” “ভূমি রাজস্ব", "ভূমি উন্নয়ন কর", এই শব্দগুলোর মধ্যে বর্তমানে কোন্ শব্দগুলো ব্যবহার আইনসঙ্গত?

রায়ত, কোর্ফা রায়ত, প্রজা ইত্যাদির পরিবর্তে "মালিক" ব্যবহার করা বিধিসঙ্গত। "খাজনা", ভূমি রাজস্ব শব্দের পরিবর্তে "ভূমি উন্নয়ন কর" শব্দ ব্যবহার আইনসঙ্গত। (প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১-এর ৮২ ধারা)।

মধ্যস্বত্বভোগী কারা?

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৮৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরকার এবং কৃষকদের মধ্যে জমিদার ও তালুকদার শ্রেণীর ব্যক্তিগণ মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে খ্যাত। তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সাথে জড়িত নন। কিন্তু কৃষক প্রজাগণ কর্তৃক প্রদত্ত রাজস্বের এক অংশ প্রজাদের থেকে রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে ভোগ করে থাকেন।

হাওলা কি?

হাওলা হলো জমিদার, তালুকদারের অধীনস্থ মধ্যস্বত্ব। বৃটিশ রাজত্ব কালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন এলাকায় ২০০-৫০০ বিঘা জমি প্রজাদেরকে ২৫ বছরের জন্য ইজারা বা বন্দোবস্ত দেয়ার প্রথা ছিল। সরকার এবং প্রজাদের মধ্যে এই মধ্যস্বত্বকে বলা হতো হাওলা। হাওলার স্বত্বাধিকারীকে বলা হতো হাওলাদার।

বর্তমানে কিভাবে জমির মালিক হওয়া যায়?

কেউ জমির মালিক হতে পারে; (১) ক্রয় সূত্রে, (২) উত্তরাধিকার সূত্রে, (৩) সরকারের নিকট হতে পত্তনী সূত্রে, (৪) লীজ কবুলি চুক্তির মাধ্যমে এবং অন্যান্য বৈধ পদ্ধতিতে। জমির মালিক হলেও মালিক কর্তৃক খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয় সরকারকে।


লেখকের পরিচিতি

এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।