জমি কেনার আগে যে ৩৮ বিষয় জানা প্রয়োজন

বাংলাদেশে জমি কেনাবেচা শুধু অর্থের লেনদেন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মালিকানা, দলিল, খতিয়ান, দখল, নামজারি, ভূমি কর ও নানা ধরনের আইনি বিষয়। জমি কেনার আগে বিক্রেতার মালিকানার ধারাবাহিকতা, বায়া দলিল, খতিয়ান, নকশা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও শ্রেণি যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে জমিটি খাস, সরকারি, পরিত্যক্ত, অর্পিত বা অধিগ্রহণের আওতায় আছে কি না, কোনো মামলা বা দায়বদ্ধতা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দলিলের তথ্য যাচাইয়ে সামান্য অসতর্কতাও ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অথচ জমি কেনাবেচার এই প্রক্রিয়া নানা ধাপ ও নথিপত্রের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। তাই নিরাপদে জমি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় নথি, মালিকানার ধারাবাহিকতা ও আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।
জমি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে কয় পক্ষের স্বাক্ষর থাকে?
ক্রয় চুক্তিতে বিক্রয়ের প্রস্তাবকারী (ইজাবকারী), ক্রয় প্রস্তাব গ্রহণকারী (কবুলকারী) এবং সাক্ষীর স্বাক্ষর অবশ্যই থাকতে হবে। এই ৩ পক্ষের স্বাক্ষর ছাড়া চুক্তি আইনসম্মত হয় না। চুক্তি লিখিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। মৌখিক চুক্তির ভিত্তি দুর্বল।

জমির মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয় নিশ্চিতির জন্য কি ধরনের বা কয়টি দলিল প্রয়োজন?
জমির মালিকানা নিশ্চিতির জন্য অবশ্যই সর্বশেষ সম্পাদিত দলিল প্রয়োজন। কিন্তু সর্বশেষ দলিল থেকে পূর্বেকার Cadestral Survey বা জরিপ পর্যন্ত সংঘটিত দলিল ও রেকর্ডকৃত খতিয়ান-সমূহ পরীক্ষার পরে মালিকানা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
Cadestral Survey-এর পর হতে বিক্রেতাদের কার পরে কে জমি বিক্রয় করলেন এবং কে কার থেকে ক্রয় করলেন সে ধারাবাহিকতা বা চেইন বা সনদ যদি সঠিক হয়, তবেই জমির মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
ভুয়া মালিকেরা রেজিস্ট্রি অফিসকে প্রভাবিত করে দলিল রেজিস্ট্রি করে নিতে পারে। মালিকদের নিকট এক বা একাধিক ভুয়া দলিল থাকতে পারে। কিন্তু Cadestral সার্ভে পর্যন্ত সব দলিল থাকার কথা নয়।
সি.এস. জরিপ পর্যন্ত সব দলিল জাল করা ও রেজিস্ট্রি করা কঠিন ব্যাপার। খাটি মালিকগণ বেখেয়াল ও এত দায়িত্বহীন হলে তাদের কাছে সম্পত্তির বায়া দলিল বা ধারাবাহিক দলিল থাকার কথা নয়।
দলিল সম্পাদনের কত দিনের মধ্যে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হয়?
দলিল সম্পাদনের ৪ (চার) মাসের মধ্যেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।

দলিলে কি কি বিষয় অথবা তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন?
জমির দলিলে থাকবে-১. জমি বিক্রেতার নাম, ২. বিক্রেতার মালিকানার সূত্র বা বিবরণ যেমন ক্রয় সূত্র, দান সূত্র, উত্তরাধিকার সূত্র ইত্যাদি ৩. দলিল দাতা, দলিল গ্রহীতার নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা, ৪. জমির তফসীল বা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ।
এই তফসীলের মধ্যে আছে ১. এক মৌজার নাম, ২. মৌজার জে. এল, নাম্বার (Jurisdictional List Number), ৩. বিক্রিত জমির খতিয়ান ও ৪. দাগ নাম্বার, ৫. বিক্রিত (হস্তান্তরিত) জমির পরিমাণ, ৬. ভূমির চৌহদ্দি ইত্যাদি, ৭. খতিয়ান নাম্বার, ৮. জমির শ্রেণী।
দলিল লেখার সময় দলিলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কি কি বিষয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সতর্ক হতে হবে। জমি বিক্রেতাকে অবশ্যই বিক্রয়-ক্রয় মূল্য সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। ক্রেতাকে সতর্ক হতে হবে জমির তথ্য সঠিকতা সম্বন্ধে।
জমি ক্রয়-বিক্রয় কালে ক্রেতার জ্ঞাতব্য বিষয়াদি
১. খতিয়ান, ২. নকশা, ৩. জমির দাগ, ৪. দাগে জমির পরিমাণ, ৫. মৌজা, ৬. জমির সকল তফসীল, বা সিডিউল, ৭. সি.এস. খতিয়ান, ৮. এস. এ. খতিয়ান, ৯. আর. এস. খতিয়ান, ১০. জরিপ কালের পর্চা, ১১. ক্রয়-বিক্রয়ের ধারাবাহিকতা, ১২. কার পরে কে এবং কিভাবে মালিক হলেন তার চেইন এবং সূত্র, ১৩. উত্তরাধিকারের বণ্টননামা, ১৪. ফারায়েজ, ১৫. মাঠ পর্চার মন্তব্য, ১৬. জরিপ কালে মামলা মোকদ্দমার তথ্য এবং রায়, ১৭. তাসদিক বা সত্যায়ন পর্যায়ের বিরোধ, ১৮. জরিপ অফিস বা জরিপ ক্যাম্প (জরিপ কালে সিদ্ধান্ত), ১৯. ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল, ২০. বায়া দলিল, ২১. ধারাবাহিক খাজনা রশিদ, ২২. বকেয়া খাজনা, ২৩. সার্টিফিকেট মামলা সংক্রান্ত তথ্য, ২৪. জমির প্রকার, ২৫. খাস জমি, ২৬.নাল জমি, ২৭. সরকারি জমি, ২৮. পরিত্যক্ত জমি, ২৯. অর্পিত সম্পত্তি, ৩০. অধিগ্রহণের নোটিশকৃত সম্পত্তি, ৩১. মামলা মকদ্দমাভুক্ত সম্পত্তি, ৩২. জমির দখল সংক্রান্ত তথ্য, ৩৩. রেজিস্ট্রি অফিসে বেচাকেনার তথ্য, ৩৪. ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থার নিকট বন্ধক দেয়া বা দায়বদ্ধতার রেকর্ড, ৩৫. সরকারি বিধিনিষেধ ও দায়বদ্ধতার বিবরণ, ৩৬. যে যে এলাকায় সরকারি বিধিমতে কোন শিল্প, কুটির শিল্প, দুগ্ধ শিল্প, দুগ্ধ খামার, মাংস খামার, পাকা ইমারত, শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করা যায়না ঐ রেকর্ড, ব্যক্তিগত মালিকানার বিধি-নিষেধ আরোপ সংক্রান্ত সরকারি পরিপত্র, ৩৭. জাতীয় দৈনিকে মালিকানার লিগ্যাল নোটিশ, ৩৮. নামজারি, ইত্যাদি বিষয়ে জমি সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে বিশেষ করে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরকে অবহিত হতে হবে।

জমি-জমা ক্রয়ের উদ্দেশ্যে উপরে বর্ণিত ৩৮টি বিষয় ভালোভাবে জানা তো এক জীবনে সম্ভব নাও হতে পারে। অতো কিছু জানার পর জমির মালিক হতে বৃদ্ধ বয়সে জমির ক্রয় করার সখ থাকবে কি?
আমরা বিশেষ করে বাঙ্গালি মুসলিমগণ আল্লাহতায়ালার এমন এক খাস সৃষ্ট জাতি যারা সোজা পথে চলতে অভ্যস্থ নই। সোজা জিনিস বক্র করতে এবং জটিল করতে দুনিয়াতে বোধ হয় আমাদেরকে দুনিয়াতে কেউ হারাতে পারবে না। আমরা জমির মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি ও বিধি অনাবশ্যকভাবে জটিল করেছি। এ বিষয়ে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
অতো জটিল প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সহজ পদ্ধতি হলো উকিল-মোক্তার, জমি ক্রয়-বিক্রয়ে দক্ষ টাউট বাটপারের নিকট নিজেকে সমর্পণ করে জমি ক্রয় এবং কপাল বন্ধক দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা।
জমি ক্রয়-বিক্রয়, সমস্যা ও জটিলতা
আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষিত, অতি ভদ্র নাগরিকগণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা, সরকারি, আধাসরকারি চাকরিতে কর্মরত। এ দেশের উচ্চ শ্রেণীর মনমানসিকতা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বিভিন্ন কারণে দুর্নীতি ও কলুষতার অনুকূল। জমি ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রতারণা দোষে দুষ্ট।

