রেজিস্ট্রিকৃত নয় এমন সম্পত্তি মর্গেজ কতটুকু কার্যকরী?

জমি কেনাবেচা, বন্ধক কিংবা সম্পত্তি হস্তান্তর—বাংলাদেশে এসব লেনদেনে শুধু অর্থের অঙ্কই নয়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দলিলের বৈধতা ও রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি। অসতর্কতা বা নিয়ম না জানার কারণে অনেক সময় জমির মালিকানা, বন্ধক কিংবা ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। বিশেষ করে রেজিস্ট্রেশনবিহীন দলিল, বায়নাপত্র ও বন্ধকী সম্পত্তি ভবিষ্যতে আইনি ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
তাই জমি-সম্পত্তি সংক্রান্ত লেনদেনে কোন দলিল কখন রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক, বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানা কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয় নিশ্চিত করার নিয়ম জানা জরুরি।
জমি কেনাবেচা ও বন্ধকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনের গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো নিয়ে থাকছে বিস্তারিত আলোচনা। ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে এসব বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।

রেজিস্ট্রিকৃত দলিল ব্যতিত জমি ক্রয়-বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ। ঋণের বিপরীতে নির্ভরযোগ্য জামানত হিসেবে রেজিস্ট্রেশনবিহীন বন্ধকী দলিল গ্রহণীয় নয়। (প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১-এর ৮৯ ধারা)
বন্ধকী দলিল কি অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে?
ক্রয়-বিক্রয় দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। ১৯০৮ সালে রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত না হলে বন্ধকী দলিল আইনত গ্রহণযোগ্য হবে না। (প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫১-এর ৮১ ধারা (খ))। রেজিস্ট্রেশনহীন দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে জমিতে রেজিস্ট্রেশন ফী হতে সরকারকে বঞ্চিত হতে হয়।
জমি বিক্রয়ের জন্য যথাযথভাবে বায়না পত্র করা হয়েছে, কিন্তু তা রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। এই দলিলের আইনগত ভিত্তি কি?
বায়না পত্র অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। রেজিস্ট্রিবিহীন বায়না পত্র আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
মর্টগেজ দলিল কি অবশ্যই রেজিস্ট্রি হতে হবে?
মর্টগেজ বা বন্ধক সাধারণত বিশ্বাস ও আস্থার ওপর নির্ভর করে। যে জমি বন্ধক দিয়ে ঋণ গ্রহণ করতে যথাযথ ব্যক্তি চায়, তিনি মর্টগেজ বা বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি ছাড়াই দিতে চাইবেন। তবে ঋণদাতার পক্ষে মর্টগেজ দলিল রেজিস্ট্রি করে নিতেই হবে। রেজিস্ট্রিকৃত মর্টগেজ দলিল বিনা রেজিস্ট্রিকৃত মর্টগেজ দলিল অপেক্ষা আইনের দিক দিয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য। বর্তমানে মর্টগেজ দলিল নিবন্ধন ছাড়া আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
রেজিস্ট্রিকৃত দলিল ব্যতীত জমি ক্রয়-বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ। যা ঋণের বিপরীতে নির্ভরযোগ্য জামানত হিসেবে গ্রহণীয় নয়। (প্রজাস্বত্ব আইন- ১৯৫১-এর ৮৯ ধারা)।
Mortgage দলিল রেজিস্ট্রিকৃত হবে কেন? Mortgage এর জন্যে সম্পত্তির দলিল পর্যাপ্ত নয় কেন?
ঋণ গ্রহীতা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সম্পত্তির মূল দলিল জামানত হিসেবে জমা রাখতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র দলিল জমা রাখলে বিনিয়োগ গ্রহীতা জামানত হিসেবে প্রদত্ত জমি অন্যত্র বিক্রয় করে দিতে পারেন। এমনকি জমি ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি "মূল দলিল হারিয়ে গেছে" মর্মে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বা থানায় ডায়েরি করতে পারেন। এ কারণে ব্যাংক বিধিমত (১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৮ ধারা) রেজিস্টার্ড মর্গেজ গ্রহণ করে থাকে।
রেজিস্ট্রিকৃত নয় এমন সম্পত্তি মর্গেজ কতটুকু কার্যকরী?
বন্ধক হতে হবে আইনত নিবন্ধিত বা রেজিস্ট্রিকৃত (১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ধারা ৫৮)। সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রি না হলে তা ডিডি (ডিমান্ড ড্রাফট) পাওয়ার জন্য অর্থহীন। অরেজিস্ট্রিকৃত মর্গেজ 'লিগ্যাল মর্গেজ' নয়। নিবন্ধনবিহীন দলিল আইনত বন্ধক নেওয়া যায় না।
লিমিটেড কোম্পানি ঋণ গ্রহীতা হলে বন্ধকী দলিল কে সম্পাদন করবেন? কি কি সম্পত্তি বন্ধক দিবেন? কোন প্রতিষ্ঠানের নিকট বন্ধক দিবেন? ইত্যাদি সম্পর্কে লিমিটেড কোম্পানির রেজুলেশন থাকতে হবে কি?

বন্ধকী দলিল বিনিয়োগদানকারী সংস্থার সম্মুখে বন্ধক দাতা/দাত্রী স্বাক্ষর করবেন। কি কি সম্পত্তি ব্যাংকের নিকট বন্ধক রাখবেন, এ সম্পর্কে অবশ্যই পরিচালনা পর্ষদের (Board of Directors) রেজুলেশন বা সিদ্ধান্ত থাকতে হবে।৪
বন্ধকী দলিলের খসড়া কে প্রণয়ন করবেন?
আইনজীবী।
রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের নকল কোথায় পাওয়া যায়?
নির্ধারিত ফী দিয়ে আবেদন করলে ১০ দিনের মধ্যে সহীহ মোহরীকৃত (Certified copy) নকল পাওয়া যায়।
কত টাকা মূল্যের জমি বিক্রয় করার সময় বা হস্তান্তরের সময় দলিল রেজিস্ট্রেরি করা আবশ্যক?
ভূমি হস্তান্তর আইন ও রেজিস্ট্রেশন আইনের বিধান অনুসারে ১০০/- টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়, দান, ওয়াকফ ইত্যাদির মাধ্যমে হস্তান্তরের জন্য রেজিস্ট্রেশন করা আইনত প্রয়োজন।
বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রেশন কখন বাধ্যতামূলক?
এক বছরের অধিক সময়ের জন্য যে লীজ সম্পাদন করা হয়, তা লীজ রেজিস্ট্রেশন আইন অনুসারে রেজিস্ট্রি করতে হবে।
জমির মূল ক্রয়-বিক্রয় দলিলের কি একাধিক কপি হতে পারে?
মূল দলিল থাকে একটি। যত সংখ্যক ইচ্ছা কপি করে নেয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে মূল দলিলের জাল মূল কপিও রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাক্রমে হয়ে থাকে। এর ফলে কোনটি প্রথম বা মূল দলিল এবং কোনটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় দলিল বুঝা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
বন্ধক দাতার পরিচয় কে গ্রহণ করতে হবে?
বন্ধক দাতা যে ভুয়া নন, এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। তার পাসপোর্ট নং, অন্যান্য পরিচিতি নং, ফটো, সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়ন পরিষদের সনদপত্র, ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে।
বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানা ও মালিক সম্বন্ধে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়?
দলিল বৈধভাবে রেজিস্ট্রি হলে দলিল সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। দলিলের সঙ্গে দলিলের মালিক বা বন্ধক দাতার ছবি দিতে হবে। এই ছবির পিছনে মালিকের নাম ও স্বাক্ষর গ্রহণ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড মেম্বার এর সিল ও স্বাক্ষর দ্বারা সত্যায়িত করতে হবে।
দলিল দাতা ও বন্ধক দাতার পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইত্যাদি থাকলে এগুলোর সত্যায়িত ফটোকপি দলিলের সঙ্গে রাখতে হবে।
দলিলের মালিককে স্থানীয় বিশ্বাসযোগ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সনাক্ত করা যায়।
লেখকের পরিচিতি
এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।

