logo
Advertisement

জমির শ্রেণি চেনার উপায় ও পরিবর্তনের নিয়ম

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির শ্রেণি চেনার উপায় ও পরিবর্তনের নিয়ম
বিভিন্ন শ্রেণির জমি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

জমির দলিল বা খতিয়ান পর্যালোচনা করতে গিয়ে ‘চালা ভূমি’, ‘নাল জমি’, ‘ভিটি’ বা ‘সিকস্তি’-র মতো বিভিন্ন অপরিচিত পরিভাষার মুখোমুখি হতে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক সময় এসব শব্দের প্রকৃত অর্থ না বোঝার কারণে কেনা-বেচা বা আইনি প্রক্রিয়ায় নানা বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমির শ্রেণি নির্ধারণের ওপরই নির্ভর করে তার মূল্য, ভূমিকর (খাজনা) এবং ব্যবহারের ধরন। তাই আইনি জটিলতা এড়াতে জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের আগে জমির শ্রেণি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি।

‘জমির রেকর্ড বা খতিয়ানের ভুল সংশোধনের উপায়’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমির রেকর্ড বা খতিয়ানের ভুল সংশোধনের উপায়’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এসব বিষয় নিয়ে ‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ শীর্ষক বইতে উল্লেখ করেছেন সাইফুল ইসলাম ফকির। বইটির প্রথম অধ্যায়ের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক জমির শ্রেণি চেনার উপায় ও পরিবর্তনের নিয়ম নিয়ে আলোচনা করেছেন।

কোন পরিভাষায় কী ধরনের জমি বোঝায়

দলিল ও খতিয়ানের বিবরণ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির জমির পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো—

চালা ভূমি: সাধারণত স্বাভাবিক সমতল জমির চেয়ে কিছুটা উঁচু আবাদযোগ্য জমিকে ‘চালা’ বলা হয়। পুকুরের উঁচু পাড়, যেখানে শাকসবজি বা গাছপালা চাষ করা হয়, সেগুলোকেও অনেক সময় ‘চালা ভূমি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি নিচু ফসলি জমির মতো নয়।

নাল জমি: সমতল ও নিচু কৃষি জমি, যেখানে সাধারণত বছরে ২ থেকে ৩টি ফসল ফলে, সেগুলোকে ‘নাল জমি’ বলা হয়।

ভিটি (ভিটি জমি): বসতবাড়ির জন্য নির্ধারিত জমিকে বর্তমানে ‘ভিটি’ বলা হয়। জমি হস্তান্তর বা খতিয়ান তৈরি করার সময় বসতবাড়ির জমিকে ‘ভিটি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পালাম ভূমি: বসতবাড়ি সংলগ্ন উঁচু ভিটি জমি, যা প্রধানত সবজি চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাকে ‘পালাম ভূমি’ বলে।

বাইদ জমি: একটু নিচু প্রকৃতির আবাদযোগ্য ফসলি জমিকে ‘বাইদ’ বলা হয়। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলে এই শব্দের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।

চান্দিনা ভিটি: হাট-বাজারের স্থায়ী বা অস্থায়ী অকৃষি জমির যে অংশ প্রজাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাকে ‘চান্দিনা ভিটি’ বলে।

চিরাগী জমি: মসজিদ বা কবরস্থানে আলোকসজ্জা বা আনুষঙ্গিক খরচের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত নিষ্কর (করমুক্ত) জমিকে ‘চিরাগী জমি’ বলা হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৬৫ ও ৬৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৬৫ ও ৬৬। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সিকস্তি জমি: নদীভাঙনের ফলে যে জমিগুলো নদীতে বিলীন হয়ে যায় এবং সরকারি খাস জমি হিসেবে গণ্য হয়, সেগুলোকে ‘সিকস্তি’ শ্রেণির জমি বলে।

পয়স্তি জমি: সিকস্তির ঠিক বিপরীত রূপ হলো পয়স্তি। নদীভাঙনের পর যখন নতুন চর জেগে ওঠে, সেই চর এলাকার জমিগুলোকে ‘পয়স্তি’ শ্রেণির জমি বলা হয়।

জমির শ্রেণি কেন গুরুত্বপূর্ণ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক শ্রেণি জেনে দলিল সম্পাদন না করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। জমির শ্রেণির ওপর নির্ভর করেই সরকারের রাজস্ব বা খাজনা নির্ধারিত হয়। তাছাড়াও কৃষিজমি অকৃষি বা বসতবাড়ির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে গেলে শ্রেণি পরিবর্তনের নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক।

জমির শ্রেণি পরিবর্তনের নিয়মাবলি

জমি হস্তান্তরের পর বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়:

১. আবেদন দাখিল: শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত ১০ টাকার কোর্ট ফি সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার - ভূমি) কার্যালয়ে আবেদন দাখিল করতে হয়।

২. তদন্ত ও প্রতিবেদন: আবেদন পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠান।

৩. শুনানি: ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদন আসার পর আবেদনকারী ও সংশ্লিষ্টদের শুনানির জন্য নোটিশ জারি করা হয়।

৪. চূড়ান্ত অনুমোদন: শুনানিতে দলিল ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে যদি কোনো আইনি আপত্তি না পাওয়া যায়, তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন প্রদান করেন।

সময়সীমা: সাধারণত এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।