logo

ঘুমের জন্য বালিশ বাছার সঠিক নিয়ম জানুন

ঘুমের জন্য বালিশ বাছার সঠিক নিয়ম জানুন
ছবি: সামা নিউজ

রাতে বিছানায় যাওয়ার পর ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘাড় শক্ত লাগছে কিংবা কাঁধ ও পিঠে ব্যথা করছে? এর পেছনে শুধু ঘুমের সময় বা মানসিক চাপ দায়ী নাও হতে পারে। আপনার বালিশটিও এর একটি কারণ হতে পারে।

বালিশ দেখতে যতটা সাধারণ, ঘুমের সময় শরীরের জন্য এর ভূমিকা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়কে সঠিকভাবে সমর্থন না দিলে দীর্ঘ সময় ধরে ঘাড় অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে ঘাড়ে ব্যথা, শক্তভাব, কাঁধে অস্বস্তি কিংবা সকালে মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, খুব বেশি বা খুব কম বালিশ ব্যবহার করলেও ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।

তাই বালিশ কেনার সময় শুধু নরম বা দেখতে সুন্দর কি না, সেটি দেখলেই হবে না। আপনি কীভাবে ঘুমান, আপনার ঘাড়ের গঠন এবং বালিশের উচ্চতা ও দৃঢ়তার দিকেও নজর দিতে হবে।

সঠিক বালিশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ঘুমের সময় মাথা ও ঘাড়কে এমন অবস্থায় রাখা দরকার, যাতে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় থাকে। বালিশ খুব উঁচু হলে মাথা সামনে বা একদিকে বেশি বেঁকে যেতে পারে। আবার খুব নিচু হলে ঘাড় প্রয়োজনীয় সমর্থন নাও পেতে পারে।

স্লিপ ফাউন্ডেশনের (Sleep Foundation) তথ্য অনুযায়ী, বালিশ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ঘুমের অবস্থান, বালিশের উচ্চতা, ভেতরের উপাদান ও আকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঠিক বালিশ মাথা ও ঘাড়কে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে পারে এবং অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

আপনি কীভাবে ঘুমান, সেটিই প্রথম বিষয়

সবার জন্য একই ধরনের বালিশ উপযুক্ত নয়। আপনি চিৎ হয়ে, কাত হয়ে নাকি উপুড় হয়ে ঘুমান, তার ওপর বালিশের ধরন অনেকটাই নির্ভর করে।

কাত হয়ে ঘুমালে

যাঁরা বেশির ভাগ সময় কাত হয়ে ঘুমান, তাঁদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক উঁচু ও ভালো সমর্থন দিতে পারে এমন বালিশ প্রয়োজন হতে পারে।

কারণ কাত হয়ে শোয়ার সময় কাঁধ ও মাথার মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। বালিশ সেই জায়গা পূরণ করে মাথা ও ঘাড়কে তুলনামূলক সোজা রাখতে সাহায্য করে।

খুব পাতলা বা নরম বালিশ ব্যবহার করলে মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। এতে ঘাড়ে চাপ তৈরি হতে পারে। স্লিপ ফাউন্ডেশন কাত হয়ে ঘুমানো ব্যক্তিদের জন্য তুলনামূলক বেশি উচ্চতা ও সমর্থনযুক্ত বালিশের কথা উল্লেখ করেছে।

কাত হয়ে ঘুমালে হাঁটুর মাঝেও একটি ছোট বালিশ রাখতে পারেন। এতে কোমর, নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের অবস্থান ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।

চিৎ হয়ে ঘুমালে

চিৎ হয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে খুব উঁচু বালিশ সাধারণত প্রয়োজন হয় না। মাঝারি উচ্চতার এমন বালিশ বেছে নেওয়া ভালো, যা মাথাকে অতিরিক্ত সামনে ঠেলে না দেয় এবং ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁককে সমর্থন করে।

বালিশের লক্ষ্য হওয়া উচিত মাথা ও ঘাড়কে শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় রাখা।

চিৎ হয়ে ঘুমালে প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটুর নিচেও একটি বালিশ রাখা যেতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের মতে, এতে কোমরের ওপর চাপ কমাতে এবং মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

উপুড় হয়ে ঘুমালে

উপুড় হয়ে ঘুমানোর সময় ঘাড় ও মেরুদণ্ডে চাপ পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ মাথা একদিকে ঘুরিয়ে রাখতে হয়।

এভাবে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে খুব মোটা বালিশ ব্যবহার না করাই ভালো। পাতলা ও নরম বালিশ তুলনামূলক আরামদায়ক হতে পারে। তবে সম্ভব হলে অন্য ভঙ্গিতে ঘুমানোর অভ্যাস করা ভালো, বিশেষ করে যদি ঘাড় বা পিঠে ব্যথা থাকে। মায়ো ক্লিনিকও উপুড় হয়ে ঘুমানোকে পিঠের জন্য তুলনামূলক বেশি চাপের অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বালিশ কতটা উঁচু হওয়া উচিত?

বালিশের উচ্চতার ক্ষেত্রে সবার জন্য একই মাপ ঠিক করা যায় না। আপনার কাঁধের গঠন, ঘুমের অবস্থান, গদি কতটা নরম বা শক্ত এবং বালিশ ব্যবহারের পর সেটি কতটা চাপে যায়, এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

সহজভাবে বলা যায়, বালিশে মাথা রাখার পর ঘাড় যেন অস্বাভাবিকভাবে সামনে, পেছনে বা একদিকে বাঁকা না থাকে।

আয়নার সামনে নিজের ঘুমের ভঙ্গি দেখা সম্ভব হলে খেয়াল করতে পারেন, মাথা ও ঘাড় শরীরের বাকি অংশের সঙ্গে মোটামুটি সোজা আছে কি না।

খুব নরম বালিশ কি ভালো?

নরম বালিশ অনেকের কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত নরম হলে মাথার ওজনের চাপে বালিশ অনেকটা বসে যেতে পারে। তখন প্রয়োজনীয় সমর্থন কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে খুব শক্ত বালিশও সবার জন্য আরামদায়ক নয়।

তাই শুধু শক্ত বা নরম নয়, বালিশটি মাথা ও ঘাড়কে কতটা স্থির এবং আরামদায়কভাবে সমর্থন করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মেমোরি ফোম, তুলা নাকি অন্য উপাদান?

বাজারে তুলা, ফাইবার, মেমোরি ফোম, ল্যাটেক্সসহ নানা ধরনের বালিশ পাওয়া যায়। প্রতিটির অনুভূতি ও সমর্থন দেওয়ার ধরন আলাদা।

মেমোরি ফোমের বালিশ মাথা ও ঘাড়ের আকৃতি অনুযায়ী কিছুটা মানিয়ে যেতে পারে। কনট্যুর বা বিশেষ আকৃতির বালিশও ঘাড়কে নির্দিষ্টভাবে সমর্থন দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়।

তবে কোনো একটি উপাদান সবার জন্য সেরা, এমন নয়। আপনার ঘুমের অবস্থান, আরাম এবং ঘাড়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বালিশ বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ো ক্লিনিকও ঘাড়কে সমর্থন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত বালিশ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।

সকালে ঘাড় ব্যথা হলে বালিশ পরীক্ষা করুন

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যদি ঘাড়ে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভব করেন, তাহলে নিজের বালিশটি পরীক্ষা করে দেখুন।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন-

  • বালিশটি কি অনেক পুরোনো?
  • আগের তুলনায় কি বেশি চুপসে গেছে?
  • মাথা রাখলে কি খুব নিচে নেমে যায়?
  • বালিশটি কি ঘাড়কে যথেষ্ট সমর্থন দেয়?
  • ঘুম থেকে ওঠার পর কি নিয়মিত ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা থাকে?
  • আপনি কি ঘুমের অবস্থান পরিবর্তন করার পরও একই বালিশ ব্যবহার করছেন?

ঘাড়ের ব্যথার কারণ শুধু বালিশ নয়। ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার, পেশিতে টানসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।

বালিশ পরিষ্কার রাখাও জরুরি

বালিশের ভেতরে ধুলো, ঘাম ও ত্বকের তেল জমতে পারে। তাই শুধু বালিশের কাভার পরিষ্কার করলেই সবসময় যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বালিশের লেবেলে দেওয়া পরিষ্কারের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। নিয়মিত বালিশের কাভার ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন এবং বালিশের ভেতরে দুর্গন্ধ, দাগ বা অতিরিক্ত আর্দ্রতা তৈরি হচ্ছে কি না খেয়াল করুন।

যে বালিশ ধোয়া যায় না, সেটি কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে, তা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী করা ভালো।

পুরোনো বালিশ বদলানোর সময় হয়েছে বুঝবেন কীভাবে?

বালিশের নির্দিষ্ট বয়স সবার জন্য একই নয়। তবে কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় সেটি বদলানোর সময় হয়েছে কি না। যেমন-

  • বালিশ আগের আকৃতি ধরে রাখতে পারছে না
  • মাঝখানে বেশি বসে গেছে
  • ভাঁজ করে রাখার পর আগের অবস্থায় ফিরছে না
  • গন্ধ বা দাগ সহজে দূর হচ্ছে না
  • বালিশ ব্যবহারের পর ঘাড়ে নিয়মিত ব্যথা হচ্ছে
  • আগের তুলনায় ঘুমে অস্বস্তি বাড়ছে

বালিশ যদি প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে না পারে, তাহলে শুধু পুরোনো হওয়ার তারিখের দিকে না তাকিয়ে সেটি বদলানোর কথা ভাবা যেতে পারে।


ঘাড়ের ব্যথা থাকলে কেমন বালিশ ব্যবহার করবেন?

ঘাড়ে নিয়মিত ব্যথা থাকলে শুধু নতুন বালিশ কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন নয়।

প্রথমে দেখুন ঘুমের সময় মাথা ও ঘাড় শরীরের সঙ্গে সোজা অবস্থায় থাকছে কি না। মায়ো ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, ঘুমের সময় মাথা ও ঘাড়কে শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে, হাতে অবশভাব বা দুর্বলতা দেখা দিলে কিংবা ব্যথা কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণের পেছনে বালিশ ছাড়াও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা থাকতে পারে।


ঘুমের জন্য বালিশ কেনার আগে ৭টি বিষয় দেখুন

বালিশ কেনার সময় দ্রুত এই তালিকাটি মিলিয়ে নিতে পারেন:

ঘুমের অবস্থান: কাত, চিৎ নাকি উপুড় হয়ে ঘুমান?

উচ্চতা: মাথা ও ঘাড়কে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে পারছে কি না।

দৃঢ়তা: অতিরিক্ত শক্ত বা অতিরিক্ত নরম কি না।

উপাদান: তুলা, ফাইবার, মেমোরি ফোম বা অন্য উপাদান আপনার জন্য আরামদায়ক কি না।

ঘাড়ের সমর্থন: ঘুমের সময় ঘাড়ে চাপ তৈরি হচ্ছে কি না।

পরিষ্কার করা যায় কি না: কাভার ও বালিশ পরিষ্কার রাখার সুবিধা আছে কি না।

নিজের আরাম: সবশেষে বালিশে মাথা রাখার পর আপনি স্বাভাবিক ও আরামদায়ক বোধ করছেন কি না।

ভালো ঘুমের জন্য শুধু কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কীভাবে ঘুমাচ্ছেন এবং ঘুমের সময় শরীর কতটা আরামে আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সঠিক বালিশ মাথা ও ঘাড়কে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে পারে এবং ঘুমের সময় শরীরকে আরামদায়ক অবস্থায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবার জন্য একই বালিশ উপযুক্ত নয়। কাত হয়ে ঘুমালে তুলনামূলক বেশি সমর্থনযুক্ত বালিশ প্রয়োজন হতে পারে, চিৎ হয়ে ঘুমালে মাঝারি উচ্চতার বালিশ উপযোগী হতে পারে এবং উপুড় হয়ে ঘুমালে পাতলা বালিশ বেছে নেওয়া ভালো।

তাই বালিশ কেনার সময় শুধু নরম বা দামি কি না, সেটি না দেখে নিজের ঘুমের অভ্যাস ও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বালিশ বেছে নিন। আর দীর্ঘদিন ঘাড় বা পিঠের ব্যথা থাকলে শুধু বালিশ বদলানোর ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: সামা নিউজ