সানস্ক্রিন ব্যবহার করেও ত্বক পুড়ছে, জেনে নিন সম্ভাব্য কারণ

সানস্ক্রিন এখন অনেকের দৈনন্দিন ত্বক পরিচর্যার অংশ। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহার করলেও বেশির ভাগ মানুষই এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন। কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম সানস্ক্রিন লাগান, কেউ আবার একবার ব্যবহার করেই সারা দিন নিশ্চিন্ত থাকেন। ফলে ত্বক সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না।
ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সানস্ক্রিন ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়, এটি কতটা, কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সানস্ক্রিন ব্যবহারের এমন কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক, যেগুলো অজান্তেই ত্বকের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, সকালে একবার সানস্ক্রিন লাগিয়ে নিলেই সারা দিনের জন্য ত্বক সুরক্ষিত। কিন্তু ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, সানস্ক্রিন সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং বাস্তবে এটি যেভাবে কাজ করে, তার মধ্যে বেশ বড় পার্থক্য রয়েছে। আর এই ভুল ধারণার কারণেই অনেক সময় ত্বক পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সানস্ক্রিন ব্যবহার করলেই হবে না, এটি সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক নিয়মে ব্যবহার করাও জরুরি।
কতটা সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন
ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো প্রয়োজনের তুলনায় কম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা।
বিশেষজ্ঞ ডা. রেহনা আহমেদ বলেন, মুখ ও গলার জন্য দুই আঙুল পরিমাণ সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। অর্থাৎ তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের পুরো দৈর্ঘ্যজুড়ে সানস্ক্রিন নিয়ে তা মুখ ও গলায় লাগাতে হবে।
পুরো শরীরের জন্য সাধারণত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিলিলিটার সানস্ক্রিন প্রয়োজন হয়, যা একটি ছোট শট গ্লাসের সমপরিমাণ। এ ছাড়া কানের পেছন, ঘাড়, পায়ের ওপরের অংশের মতো জায়গাগুলো অনেকেই ভুলে যান, অথচ এসব স্থানেও সানস্ক্রিন লাগানো জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে জিঙ্ক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডযুক্ত মিনারেল সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এসব সানস্ক্রিন ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞ ডা. রাধা নিলেশ পাটিলের মতে, উচ্চ এসপিএফ (SPF)-এর সানস্ক্রিন ব্যবহার করলেও যদি যথেষ্ট পরিমাণে না লাগানো হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাওয়া যায় না। তিনি বাইরে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন লাগানোর পরামর্শ দেন।
একই মত দিয়েছেন ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. মীথ আতাওয়ানে। তার মতে, অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, বাইরে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন লাগানো উচিত এবং প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর পুনরায় ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঘাম হলে, সাঁতার কাটলে বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে আবার সানস্ক্রিন লাগাতে হবে।
এসপিএফ ৩০ নাকি এসপিএফ ৫০ কোনটি ভালো
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসপিএফ ৩০ এবং এসপিএফ ৫০ দুটিই কার্যকর। তবে কোনটি ব্যবহার করছেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা।
ডা. রেহনা আহমেদের মতে, এসপিএফ ৩০ প্রায় ৯৭ শতাংশ ইউভিবি রশ্মি প্রতিরোধ করতে পারে, আর এসপিএফ ৫০ প্রায় ৯৮ শতাংশ। যাদের দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়, ত্বক সংবেদনশীল, পিগমেন্টেশনের সমস্যা রয়েছে বা ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য এসপিএফ ৫০ বেশি উপযোগী হতে পারে।
তবে ডা. রাধা পাটিল মনে করেন, এসপিএফের সংখ্যা নয়, নিয়মিত ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, সানস্ক্রিন নিয়মিত এবং সময়মতো পুনরায় ব্যবহার করলে ত্বক অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
ডা. আতাওয়ানে বলেন, শুধু বেশি এসপিএফ বেছে নেওয়ার চেয়ে সঠিক পরিমাণে ব্যবহার এবং নিয়মিত পুনরায় লাগানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সানস্ক্রিন ব্যবহারে যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি হয়
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সাধারণ ভুলের কথা উল্লেখ করেছেন, যা অনেকেই অজান্তেই করে থাকেন।
- প্রয়োজনের তুলনায় কম সানস্ক্রিন লাগানো
- একবার লাগিয়ে সারাদিন কার্যকর থাকবে মনে করা
- ঘাম হওয়ার পর বা বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর পুনরায় ব্যবহার না করা
- এসপিএফ যুক্ত মেকআপকেই সানস্ক্রিনের বিকল্প মনে করা
- গাঢ় ত্বকের মানুষের সানস্ক্রিনের প্রয়োজন নেই মনে করা
- শুধু সমুদ্রসৈকত বা ভ্রমণের সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার করা
ডা. আতাওয়ানে বলেন, প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজ যেমন হাঁটা, গাড়িতে যাতায়াত বা বাইরে ছোটখাটো কাজের সময়ও সূর্যের রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে ত্বক কালচে হওয়া, পিগমেন্টেশন এবং অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়ে।
শরীরের যেসব অংশে সানস্ক্রিন লাগাতে ভুলে যান অনেকেই
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অংশ প্রায়ই সানস্ক্রিনের বাইরে থেকে যায়। যেমন- কান, চোখের পাতা, ঠোঁট, ঘাড়ের পেছন, মাথার ত্বক ও চুলের গোড়ার অংশ, হাত, পা, থুতনির নিচের অংশ ও চোয়াল ও মুখের পাশের অংশ।
ডা. রেহনা আহমেদের মতে, এসব স্থানে দীর্ঘদিন সূর্যের রশ্মির প্রভাব পড়লে অকাল বার্ধক্য, হাইপারপিগমেন্টেশন, মেলাজমা, সূক্ষ্ম রেখা ও সানস্পটের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ডা. আতাওয়ানে বলেন, যাদের মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে তারা অনেক সময় মাথার ত্বকে সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন না। অথচ এই অংশও সরাসরি সূর্যের আলোয় থাকে এবং ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকে।
মেঘলা দিনে বা ঘরের ভেতরে থাকলেও কি সানস্ক্রিন প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর হলো, হ্যাঁ।
ডা. রেহনা আহমেদের মতে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির একটি বড় অংশ মেঘ ভেদ করে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। ফলে মেঘলা দিনেও ত্বকের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া ইউভিএ রশ্মি কাচের জানালা ভেদ করেও ত্বকে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ত্বকের বার্ধক্য, পিগমেন্টেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।
ডা. আতাওয়ানে বলেন, যারা জানালার পাশে কাজ করেন, নিয়মিত গাড়ি চালান বা উজ্জ্বল আলোযুক্ত স্থানে দীর্ঘ সময় থাকেন, তাদেরও সূর্যের রশ্মির প্রভাব জমতে থাকে। তাই আবহাওয়া যেমনই হোক, প্রতিদিনের ত্বক পরিচর্যার অংশ হিসেবে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত।
ডা. রাধা পাটিলের মতে, সানস্ক্রিনকে শুধু সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার দিনের পণ্য হিসেবে ভাবলে চলবে না। তিনি বলেন, সানস্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি ছায়ায় থাকার চেষ্টা করা, সানগ্লাস ব্যবহার, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা, টুপি ব্যবহার করা এবং দুপুরের তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় না থাকার মতো অভ্যাসও ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছোট ছোট দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনই ভবিষ্যতে ত্বককে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
সূত্র: গালফ নিউজ